পাচার হচ্ছে বৈদেশিক মুদ্রা

অবৈধ পণ্যে জমজমাট চট্টগ্রামের ঈদবাজার

প্রকাশ : ২২ মে ২০১৯, ০০:০০

তাজুল ইসলাম পলাশ, চট্টগ্রাম ব্যুরো

শুল্ক ফাঁকি দিয়ে চোরাই পথে আসা অবৈধ পণ্যে জমজমাট চট্টগ্রামের ঈদবাজার। নগরীর নামিদামি শপিং মলগুলো এখন প্রতিবেশী দেশের পণ্যের দখলে। এসব পণ্যের আগ্রাসনে চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দেশীয় শিল্প। সরকার হারাচ্ছে শত শত কোটি টাকার রাজস্ব।

বিদেশি কাপড়ের ওপর ক্রেতাদের চাহিদা বেশি থাকার কারণে ব্যবসায়ীরাও সুযোগ বুঝে আমদানি করছে কোটি টাকার পণ্য। এসব পোশাকের চাহিদা ও লাভ অনেক বেশি হওয়ায় ব্যবসায়ীরা এসব পণ্য মজুদ ও বিক্রিতে বেশি আগ্রহী। লাখ টাকা দামের শাড়ি, লেহেঙ্গা, থ্রি-পিস, শার্ট, প্যান্ট, পাঞ্জাবি, জুতা, সেন্ডেল প্রকাশ্যে বিক্রি হলেও প্রশাসনের পক্ষ থেকে নেওয়া হচ্ছে না কোনো ব্যবস্থা। গত বছর কয়েকবার অভিযান পরিচালনা করা হয়েছিল। সে সময় অনেক নামিদামি প্রতিষ্ঠানকে জরিমানাও করা হয়। কিন্তু এ বছর এখন পর্যন্ত কোনো অভিযান হয়নি। ফলে চোরাই পথে ব্যবসায়ীরা দেদারছে আমদানি করছে বিদেশি পণ্য।

অভিযোগ রয়েছে, অনেক সময় চোরাকারবারিরাই উদ্যোগী হয়ে একটা-দুইটা চালান ধরিয়ে দেয়। আর তার ফাঁকফোকর গলিয়ে চলে আসছে বড় চালানগুলো। দেশের বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে ইঞ্জিনচালিত নৌকায়, বাসে, ট্রাকে বিভিন্ন পরিবহনে করে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাচার হচ্ছে এসব কাপড়। নগরীর বিভিন্ন শপিং মল ও মার্কেটের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা হলে তারা জানান, ‘ভারতীয় কাপড়ের প্রতি ক্রেতাদের চাহিদা বেশি। আর এ ব্যবসায় লাভও বেশি।’ দেখা গেছে, সব দোকানের ৮০ ভাগ কাপড়ই বিদেশি। কোনো ক্রেতা দোকানে গেলেই তারা প্রথমে বিদেশি কাপড়ের বান্ডেল বের করে দেয়। আর ক্রেতারাও প্রথমে দোকানিদের ‘ইন্ডিয়ান’ কাপড় আছে কি-না জানতে চায়। এ চিত্র বিরাজ করছে এখন চট্টগ্রাম শহরের শপিং মলগুলোতে।

খোদ ব্যবসায়ীরাও অকপটে স্বীকার করেন অবৈধ পথে আসা কাপড়ের কথা। তারা জানান, অনলাইনের মাধ্যমে কাপড় পছন্দ করা হয়। তারপর অর্ডার। এসব টাকা পরিশোধ করা হচ্ছে হুন্ডিতে। এভাবে দেশ থেকে পাচার হয়ে যাচ্ছে বৈদেশিক মুদ্রা। তারা বলছেন, চোরাই পণ্য বিক্রিতে লাভ বেশি। শুল্ক ছাড়া এসব পণ্যের বাজার মূল্য অনেক কম থাকে। এ কারণে প্রতিবেশী দেশের পণ্যের কাছে মূল্য ও মানে অনেক দেশীয় পণ্য মার খাচ্ছে। এছাড়া বৈধ পথে আমদানিকারকরাও এতে নিরুৎসাহিত হচ্ছেন। বেশি লাভজনক হওয়ায় বৈধ আমদানির চেয়ে অবৈধ আমদানির দিকেই ঝুঁকছেন তারা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক টেরিবাজারের একটি স্বনামধন্য শপিং মলের স্বত্বাধিকারী জানান, ‘ভারতে গিয়ে কাপড় পছন্দ করে অগ্রিম (টাকা) দিয়ে চলে আসি। আসার দুই থেকে তিন দিনের মধ্যে আমাদের কাছে চলে আসছে কাপড়গুলো।’ তিনি বলেন, আমরা ব্যবসায়ী, ক্রেতাদের চাহিদা অনুযায়ী কাপড় তুলতে হচ্ছে। ক্রেতাদের মধ্যে প্রতিবেশী দেশের কাপড়ের চাহিদা বেশি। তাছাড়া এসব কাপড়ের ব্যবসা অনেক লাভজনক।

সরেজমিনে দেখা গেছে, সব দোকানের কর্মচারীদের মুখে প্রতিবেশী দেশের কাপড়ের কথা। চট্টগ্রামের নিউ মার্কেটের বিপনি বিতান, জিইসি মোড়ের সানমার ওসান সিটি, সেন্ট্রাল প্লাজা, টেরিবাজারের ‘সানা’, ‘মনে রেখো’, ‘বৈঠক বাজার’, মেগা মার্ট এবং রিয়াজ উদ্দিন বাজারের পরিচিত শো-রুমগুলোতে বিদেশি কাপড়ে ঠাসা। ক্রেতাদের চাহিদাও পার্শ্ববর্তী দেশের কাপড়ের প্রতি।

আশিকুর রহমান সুজন নামে একজন ক্রেতা জানান, ‘মনে রেখ’ থেকে একটি ‘ভারতীয়’ শাড়ি কিনেছি, দাম একটি বেশি হলেও ব্যতিক্রম। তেমনি অনেক ক্রেতাদের সঙ্গে কথা হলে তারা জানান, ‘ভারতীয়’ কাপড়ের মান আলাদা। একটা নতুনত্ব থাকে। চাহিদামতো পাওয়া যায়। দাম একটু বেশি হলেও পছন্দ মতো পাওয়া যায়।

গত বছরের ২৫ মে নগরীর রহমতগঞ্জের দেওয়ানজী পুকুর পাড়ে ‘অর্ণব’ নামের একটি দোকান থেকে দেড় কোটি টাকার বিদেশি কাপড় জব্দ করেছে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতর। জব্দকৃত কাপড়ের মধ্য রয়েছে ১ হাজার ৩৭টি কাতান শাড়ি, ১০৮টি জর্জেট শাড়ি, ২৬৮টি পাঞ্জাবি, ৮৮টি লেহেঙ্গা, ৬৭টি শাল।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতরের চট্টগ্রাম আঞ্চলিক কার্যালয়ের একজন রাজস্ব কর্মকর্তা জানান, অভিযোগ পেলে অভিযান পরিচালনা করা হবে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, চট্টগ্রামের বড় ব্যবসায়ীরা নিজেদের অবৈধ পথে আনা বড় চালানগুলো বাঁচানোর জন্য ছোটখাটো কিছু কাপড়ের চালান নিজেরাই ধরিয়ে দেয়। আর এ সুযোগে বড় চালানগুলো পৌঁছে যায় নির্দিষ্ট গন্তব্যে। আর এসব চালানের পণ্যগুলো নিমিষেই হজম হয়ে যায় চট্টগ্রামের সবচেয়ে বড় কাপড়ের পাইকারি বাজার নামে খ্যাত রিয়াজ উদ্দিন বাজারে। যাদের রয়েছে বিশাল একটি সিন্ডিকেট। ঈদকে সামনে রেখে এ সিন্ডিকেট দুই-তিন মাস আগে থেকে প্রশাসন ও থানার পদস্থ কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে কোটি কোটি টাকার বিদেশি শাড়ি নিয়ে আসছে চট্টগ্রামে। শুধু রিয়াজ উদ্দিন বাজার নয়, নগরীর তামাকুন্ডি লেইন, টেরি বাজারসহ নামিদামি বিপনি বিতানের একটি চক্রের মাধ্যমে সাপ্লাই হচ্ছে অবৈধ পথে আসা আমদানিকৃত এসব পণ্য।

এ প্রসঙ্গে নগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (অপরাধ ও অভিযান) আমেনা বেগম জানান, ‘ভারতীয় পণ্যের অবৈধ আমদানির কারণে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দেশীয় শিল্পোৎপাদন। অবৈধ পথে আমদানিকারকদের শুল্ক পরিশোধ করতে হয় না। তিনি বলেন, বাংলাদেশি সিন্ডিকেটের সঙ্গে ভারতীয় সিন্ডিকেটও জড়িত রয়েছে। আমরা প্রতিনিয়ত মনিটরিং করছি।’

জানা গেছে, পাচারকারী সিন্ডিকেট মাত্র কয়েক লাখ টাকার বিনিময়ে বিভিন্ন পণ্য প্রতিবেশী দেশ থেকে বাংলাদেশের যেকোনো স্থানে পৌঁছে দিচ্ছে। তাও তিন থেকে চার দিনে। গুদাম ঘরে পণ্য পৌঁছে দেওয়ার পর টাকা পরিশোধ করা হচ্ছে হুন্ডির মাধ্যমে। এছাড়া লাগেজ পার্টি প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ পোশাক আনছে। একজন লাগেজ পার্টির সদস্য জানান, প্রতিবেশী দেশে গিয়ে একজন যাত্রী কয়েক লাখ টাকার মালামাল নিয়ে আসতে পারে। শুধু দুই পারের শুল্ক বিভাগ ও সীমান্তরক্ষীদের একটু ম্যানেজ করলেই আর কোনো সমস্যা হয় না।

"