বিবিসির প্রতিবেদন

মোদির শাসনে ভারতের মুসলমানরা ভয়ভীতিতে

প্রকাশ : ১৮ মে ২০১৯, ০০:০০

প্রতিদিনের সংবাদ ডেস্ক

সম্প্রতি ভারতে মুসলমানবিদ্বেষী তৎপরতা উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। কেউ কেউ আশঙ্কা করছেন, হিন্দু জাতীয়তাবাদী দল ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) শাসনামলে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রটি মারাত্মক অসহিষ্ণু হয়ে পড়ছে। এদিকে মুসলমানরা পড়েছেন ভয়ভীতিতে।

ভারতের নির্বাচনের প্রথম ধাপের ভোট গ্রহণের মাত্র কদিন আগে এ ঘটনাটি ঘটে। সেদিন আসামের উত্তর-পূর্ব এলাকার মুসলমান ব্যবসায়ী শওকত আলী কাজ শেষে বাড়ি ফিরছিলেন। হঠাৎ বেশ কয়েকজন উচ্ছৃঙ্খল মানুষ তার ওপর হামলা চালায়। আক্রমণকারীরা তাকে চারদিক থেকে ঘিরে ধরে। তারপর ময়লা-কাদার ওপর হাঁটু গেড়ে বসতে বাধ্য করে। আপনি কি বাংলাদেশি? তার ভারতীয় নাগরিকত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলে হামলাকারীদের একজন। আপনি এখানে গরুর মাংস বিক্রি করেন কেন? আলীর দিকে আঙুল উঁচিয়ে এ প্রশ্ন করে আরেকজন।

শওকত আলীর এ লাঞ্ছনার ঘটনা দেখতে ওইখানে উৎসাহী অনেক লোকই ভিড় করেছিল। তবে আলীর সাহায্যে কেউ এগিয়ে আসেনি। তারা মোবাইলে পুরো ঘটনাটির দৃশ্য ধারণ করছিল। ঘটনার এক মাস পর। এখনো মি. আলী ঠিকমতো হাঁটতে পারেন না। আটচল্লিশ বছর বয়সি লোকটি বিছানায় পা ভাঁজ করে বসেছিলেন। সেই দিনের ঘটনার কথা বলতে গিয়ে তার চোখ ছলছল করে উঠল। তিনি বলেন, তারা আমাকে লাঠি দিয়ে মেরেছে, আমার মুখে লাথি মেরেছে। আমার পরিবার কয়েক দশক ধরে তাদের ছোট খাবারের দোকানটিতে ঝোলওয়ালা গরুর মাংস বিক্রি করে আসছে, তবে আগে কখনো এ ধরনের ঘটনা ঘটেনি।

হিন্দুরা যেহেতু গরুকে পবিত্র মনে করে, এ জন্য ভারতের অনেক প্রদেশে গরুর মাংস বিক্রি করায় নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। তবে আসামে গরুর মাংস বিক্রি করা আইনত বৈধ।

শওকত আলী শুধু শারীরিকভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হননি, তার সামাজিক মর্যাদাও হারিয়েছেন। দুর্বৃত্তরা এই ধর্মপ্রাণ মুসলমান লোকটিকে শূকরের মাংস খেতে বাধ্য করেছে।

এ ঘটানার কয়েক দিন পর স্থানীয় মুসলমান কমিউনিটির দশ-বারোজন নেতা আলীর খোঁজ নিতে তার বাসায় এসেছিলেন। তার এ বিবরণ শুনে তাদের মধ্যে কয়েকজন কেঁদে ফেলেন। তারা নিজেরাও এখন আর নিজেদের নিরাপদ ভাবতে পারছেন না। আরেকটি জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের প্রাক্কালে অনেকেই এ প্রশ্ন তুলেছেন যে পৃথিবীর সর্ববৃহৎ গণতান্ত্রিক দেশ ভারতে সংখ্যালঘু মুসলমান সম্প্রদায়, যাদের সংখ্যা প্রায় ১৭ কোটি ২০ লাখ, তাদের অধিকার এখানে ঠিক কতটা সমুন্নত রয়েছে? গরুর মাংস বিক্রি করার কারণে বা বিক্রির সন্দেহে হামলার ঘটনা ভারতে বেড়েই চলেছে। শওকত আলীর ঘটনা এর সাম্প্রতিক উদাহরণ।

২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে প্রকাশিত ‘হিউম্যান রাইটস ওয়াচ’র এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০১৫-এর মে থেকে ২০১৮-এর ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ে ভারতের ১২টি প্রদেশে ৪৪ জনকে হত্যা করা হয়েছে। এর মধ্যে ৩৬ জনই মুসলমান। জাতিসংঘের মানবাধিকার সংস্থার প্রধান, মিশেল বাচেলে, তার বার্ষিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন, ‘সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতন-হামলার ঘটনা বাড়ছে, বিশেষ করে মুসলমান এবং যারা ঐতিহাসিকভাবে বঞ্চনার শিকার, যেমন দলিত সম্প্রদায় (আগে যাদের ‘অস্পৃশ্য’ বলা হতো), তাদের লক্ষ্য করে আক্রমণের ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে।

ভারতে স্বাধীনতার কাল থেকেই সাম্প্রদায়িক সহিংসতা, দাঙ্গা-হাঙ্গামায় সব ধর্মের মানুষের ক্ষতিগ্রস্ত হওয়াটা এ দেশের একটা প্রধান অনাকাক্সিক্ষত বিষয়। তবে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এসব ঘটনায় নিন্দা জানালেও তার দলের ওই দুই ব্যক্তির বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেননি। পরে সপ্তাহব্যাপী তীব্র বিক্ষোভের মুখে তারা পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়। গণমাধ্যমের প্রতিবেদন বলছে, বিজেপির সাধারণ সম্পাদক রাম মাধব এরপরও এসব ব্যক্তির পক্ষে সাফাই গেয়েছেন।

বিজেপি হিন্দু জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী একটি রাজনৈতিক দল। এ দলটিতে এমন বেশ কয়েকজন সিনিয়র নেতা আছেন যারা মনে করেন ভারতকে হিন্দু রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। যদিও দলটির নেতারা বারবারই বলেছেন, তারা সংখ্যালঘু বিদ্বেষী নন। ভারতে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের প্রাক্কালে অনেকেই আশঙ্কা করছেন, বিজেপি দ্বিতীয়বারের মতো নির্বাচিত হলে এ দেশটি সংখ্যাগরিষ্ঠের (মেজরিটারিয়ান) দেশে পরিণত হবে। দলটির ইশতেহারে বলা হয়েছে, ভারতে অবৈধভাবে বসবাসরত সব বাংলাদেশিকে দেশ থেকে বের করে দেওয়া হবে। দলটি বেশ কিছু ধর্মের অনুসারীদের আশ্রয় দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এসব ধর্মের মধ্যে রয়েছে সনাতন, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, শিখ, পার্সি এবং জৈন ধর্মাবলম্বীরা। তবে লক্ষ্য করার মতো ব্যাপার হলো, মুসলমানরা এ তালিকায় নেই।

বিজেপি সভাপতি অমিত শাহ সভা-সমাবেশে মুসলমান অভিবাসীদের ‘উইপোকা’, ‘সন্ত্রাসী’ বলেছেন। শুধু তাই-ই নয়, তাদের তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে নানা ধরনের বক্তব্যও দিয়েছেন তিনি।

 

"