সাহ্‌রির নকিব প্রার্থনা তার আল্লাহ সন্তুষ্টি

প্রকাশ : ১৮ মে ২০১৯, ০০:০০

রাকিবুল রাকিব, গৌরীপুর (ময়মনসিংহ)

প্রায় ৪৫ বছর আগের কথা। পবিত্র রমজান মাসের রাত। রাস্তা-ঘাট জনশূন্য। সাহ্রির সময় রোজাদারদের ডেকে তুলতে রিকশা নিয়ে মাইকিং করতে বের হই। শহরের অলি-গলি ঘুরে নতুনবাজার আসতেই দেখি সড়কে অনেকগুলো শিয়াল শুয়ে আছে। রিকশাচালক অনবরত বেল বাজানোর পরও শিয়ালগুলো যাচ্ছিল না। উল্টো হিংস্র দৃষ্টিতে বারবার তাকাচ্ছিল। রিকশাচালক সড়ক থেকে একটি লাঠি নিয়ে তাড়া করতেই শিয়ালগুলো উল্টো আমাদের দিকে এগিয়ে আসে। ভয় পেয়ে চালক দৌড় দিল। আমিও ভয় পেয়ে মাইকে ডাক শুরু করলাম, আমাদের শিয়াল তাড়া করেছে। আমাদের বাঁচান। পরে এলাকাবাসী এগিয়ে এলে আল্লাহর রহমতে প্রাণে বেঁচে যাই।’ গত ৪৫ বছর ধরে সাহ্রির মাইকিং করার সময় একটি ভয়ার্ত অভিজ্ঞতার কথা জানালেন মাইক ব্যবসায়ী আকবর আলী। তার বাড়ি গৌরীপুর পৌর শহরের পূর্ব দাপুনিয়া গ্রামে। তিনি মনে করেন, তিনি সাহ্রির নকিব। টাকা-পয়সা বড় নয়, তার ইচ্ছা আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ। গত বুধবার রাত ১টার পর আকবর আলীর দেখা মিলে পৌর শহরের ধানমহাল এলাকায়। সাহ্রির সময় মাইকিং করতে হবে তাই রিকশা চালকের খোঁজ করছেন তিনি। তখন এই প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা হয় আকবর আলীর। তিনি বলেন, ‘১৯৭৪ সালে রোজার মাসের কোনো এক রাতে দোকানে বসে আছি। হঠাৎ মনে হলো সাহ্রির সময় রোজাদারদের ডেকে তুলব। এরপর রিকশায় চড়ে শহরের অলি-গলিতে মাইকিং করে রোজাদারদের ডেকে তুলি। কাজটি প্রশংসিত হওয়ায় এরপর থেকে প্রতি রমজানে স্বেচ্ছাশ্রমে সাহ্রির সময় মাইকিং করতাম। তবে আশির দশকে তৎকালীন কমিশনার আবু সাইদ ভাই দুই বছরের জন্য পারিশ্রমিক দেন। পরবর্তী সময়ে তৎকালীন পৌর প্রশাসক কামাল উদ্দিনের সময় থেকে নিয়মিত পারিশ্রমিকের ব্যবস্থা করা হয়।

প্রতিদিন রাতে সাহ্রির শুরু থেকে শেষ সময় পর্যন্ত মোমিন বান্দাদের ডেকে তোলার জন্য রিকশায় করে মাইকিং করতে বের হন আকবর। শহরের নির্জন অলি-গলির ভেতর দিয়ে ভয়হীন ছুটে চলেন মাইক নিয়ে। এভাবেই তার চলছে ৪৫ বছর, এই কাজকে তিনি সওয়াবের কাজ মনে করেন।

আশির দশকে প্রথমদিকে সাহ্রির সময় মাইকিং করার জন্য আকবর পৌর পরিষদ থেকে ৪ হাজার টাকা পারিশ্রমিক পেলেও এখন সেটা সাড়ে ১০ হাজারে গিয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে আকবরের দাবি, পারিশ্রমিক হিসাবে নয়, এলাকার মানুষের প্রতি ভালোবাসা ও আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্যই এই কাজ করেন তিনি। তবে পৌর পরিষদ তাকে সম্মানী দেয়, তাতে তিনি কৃতজ্ঞ।

জানা গেছে, একসময় নিঃস্ব থাকলেও মাইকের ব্যবসা করে আকবর জমি-বাড়ি করেছেন। দাম্পত্য জীবনে তার রনি, জনি নামে দুই ছেলে ও জহুরা নামে এক মেয়ে রয়েছে। কয়েক বছর আগে মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন। আকবর ছোট-খাটো মাইকিংয়ের জন্য ৫০০ থেকে ১ হাজার টাকা পারিশ্রমিক নেন। এতে প্রতি মাসে তার আয় হয় ৩০ হাজার টাকার মতো। তবে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন অনুষ্ঠান, রাজনৈতিক কর্মসূচি ও ধর্মীয় সভায় মাইক ভাড়া কিংবা প্রচারণার জন্য ২ হাজার থেকে সর্বোচ্চ ১৫ হাজার টাকা নেন তিনি। তবে দোকানের মালামাল চুরি, বিভিন্ন অনুষ্ঠানে মাইক ভাঙচুর ও ভাড়া না পাওয়ার তিক্ত অভিজ্ঞতাও আছে। আকবরের সঙ্গে কথা বলতে রাত দেড়টা বেজেছে। এমন সময় আগমন ঘটে রিকশা চালকের। এরপর দ্রুত রিকশায় মাইক ও ব্যাটারি বসিয়ে মাইক্রোফোন হাতে নিয়ে সিটে বসেন আকবর। নির্জন শহরের পথ ধরে ছুটে চলছে রিকশা। মাইক থেকে আকবরের ভরাট কণ্ঠের আওয়াজ ভেসে আসছে, ‘অত্র এলাকার মুসলমান ভাই ও বোনেরা পবিত্র মাহে রমজানে সাহ্রি খাওয়ার সময় হয়েছে। উঠুন সাহ্রি খান, রোজা রাখুন।’

 

"