বরিশালে কীর্তনখোলার তীরে দখলদারদের রাজত্ব

প্রকাশ : ১৪ মে ২০১৯, ০০:০০

মাসুদ রানা, বরিশাল

বরিশাল কীর্তনখোলা নদীর তীরে চলছে দখলদারদের রাজত্ব। শক্ত ঘাঁটি গেড়ে বসেছে তারা। বসতি ঘর, গোডাউন ঘর এবং বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান নির্মাণ করে নদীতীরের খাস জমি দখলে নিয়েছেন তার। বিশেষ করে বান্দ রোড, পোর্ট রোড, খেয়াঘাট ও গোডাউন রোড, চাঁদমারি, ফিশারিঘাট এলাকায় দখলদারদের বিস্তর প্রভাব। প্রকাশ্যে চলে নদী ভরাট। রয়েছে ২ শতাধিক অবৈধ স্থায়ী ও অস্থায়ী স্থাপনা।

বালু, মাটি ও কংক্রিটের তৈরি ব্লক ফেলে নদী ভরাট করছেন প্রভাবশালীরা। এছাড়া বরিশালে নদীর তীর থেকে শুরু করে জেগে ওঠা চর এলাকায় তৈরি করা হচ্ছে অবৈধ স্থাপনা। কৌশলে কৃত্রিম চরের মাধ্যমে বৃদ্ধি করা হচ্ছে চরের পরিমাণ। এসব বেআইনি কাজ প্রতিরোধে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন সোচ্চার হয়নি। কমিশনের নির্দেশনা অনুযায়ী নদীবেষ্টিত বরিশাল জেলার নদী দখল ও উচ্ছেদের প্রতিবেদন এখনোও প্রকাশ করা হয়নি। পাশাপাশি বছরের পর বছর বরিশালে কীর্তনখোলা নদীতে উচ্ছেদ কার্যক্রম বন্ধ থাকার সুযোগে অবৈধ দখলদারা এখন স্থায়ীভাবে নদী দখল ও ভরাট করে অবৈধ স্থাপনা তৈরি করছেন। সীমানা নির্ধারণ, যৌথ জরিপ, জনবল সংকটসহ বিভিন্ন অজুহাতে বরিশালে অবৈধ নদী দখল উচ্ছেদ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে না বলে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে সংশ্লিষ্টরা। তবে ভেতরকার খবরে মিলেছে ভিন্নতা। বিআইডব্লিউটিএ, পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) কিংবা জেলা প্রশাসনের দায়িত্ব অবহেলা এবং প্রভাবশালীদের বাধার মুখে বরিশালে নদীর তীরের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা যাচ্ছে না।

বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা) কীর্তনখোলা নদীতীরে ৫১৯টি অবৈধ স্থাপনা চিহ্নিত করেছে। এ সংগঠনের দাবি অবৈধভাবে রাজনৈতিক ছত্র-ছায়ায় এসব স্থাপনা গড়ে তোলা হয়েছে। বছরের পর বছর ধরে এভাবে কৃত্রিম চর বৃদ্ধি করা হলেও প্রভাবশালী ভূমিদস্যুদের ক্ষমতার কাছে অসহায় স্থানীয় প্রশাসন। নদী ভরাট বন্ধে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করতে না পারায় ওই সব চরের জমিতে ভূমিদস্যুরা গড়ে তুলেছেন কারখানা, ইটভাটা, বহুতল ভবন, মুরগির ফার্ম এবং ঘর তুলে ভাড়া দেওয়া হচ্ছে। এমনকি ছোট ছোট প্লট তৈরি করে তা বিক্রি করা হচ্ছে। নগরীকে ঘিরে রাখা কীর্তনখোলা নদীর তীরে নগরীর প্রান্তে আশির দশকে ১০ একর জমি নিয়ে জেগে ওঠে রসুলপুরচর। এরপর যে দল ক্ষমতায় এসেছে সে দলের প্রভাবশালী নেতাকর্মী ও সমর্থক চর দখল করে চরসংলগ্ন নদী ভরাট করে সৃষ্টি করেছে কৃত্রিম চর। ১০ একর চর এখন ৫০ একরে পরিণত হয়েছে। ভূমিহীন কৃষক নেতা হারুন ভান্ডারি এবং নদীতীর ও চরের বাসিন্দরা জানান, সরকারি জমিতে বহুতল ভবন থেকে শুরু করে ছোট ছোট ঘর করে তা ভাড়া দেওয়া হয়েছে। এমনকি দলিল মূলে বিক্রি করা হচ্ছে সেখানকার জমিও। একইভাবে কীর্তনখোলা নদীর তীরে নৌবন্দর, পোর্ট রোড, কেডিসি, চাদমারি, ভাডারখাল, বেলতলা, মোহাম্মদপুর, দপদপিয়া, কর্ণকাঠি, পলাশপুর, খোন্নারেরচর এবং চরবাড়িয়ার এলাকায় নদী ভরাট করে দখল করে নিচ্ছে অবৈধ দখলদাররা।

বেলা বরিশাল বিভাগীয় সমন্বয়কারী লিংকন বায়েন জানান, ব্যক্তিপর্যায়ে নদী দখলের পাশাপাশি খোদ বরিশাল সিটি করপোরেশন আইন অমান্য করে কীর্তনখোলা নদীর তীর থেকে ৫০ ফুটেরও বেশি অভ্যন্তওে তৈরি করেছে বাঁধ।

পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী আবু সাইদ এবং বিআইডব্লিটিএ’র উপপরিচালক আজমল হুদা মিঠু জানান, নদীতীরে অবৈধ স্থাপনা করায় নদীর গতি প্রাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এতে করে নদীতীরে পলিজমা পরে নদী ভরাট হচ্ছে। নাব্য সংকট তৈরি হয়ে নৌচলাচল বাধাগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি নদীর গতিপথও পরিবর্তন হয়ে যাচ্ছে। উচ্চ আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী একাধিকবার অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ ও সীমানা নির্ধারণ করতে গিয়ে হামলার শিকার হয়ে ফিরে এসেছে স্থানীয় প্রশাসন। স্থানীয় জন প্রতিনিধিদের সহযোগিতা না পওয়ায় পরবর্তী সময়ে আর বিষয়গুলো সুষ্ঠুভাবে সমাধান করা হয়নি। অপ্রীতিকর ঘটনা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অবনতির আশঙ্কায় সরকারি কর্মকর্তারা নীরব ভূমিকা পালন করছেন। আর এ সুযোগে বছরের পর বছর দখলকারীরা রয়েছে বহাল তবিয়তে। যদিও ২০১৭ সালে উচ্চ আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী ২১১টি অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ অভিযানে নামে বিআইডব্লিউটিএ ও স্থানীয় প্রশাসন। সেই সময়ে একাধিকবার ম্যাজিস্ট্রেট অবরুদ্ধ হওয়াসহ দখলকারীদের বাধার মুখে প্রশাসন পিছু হটে। তবে দখলকারীদেও দাবি ছিল তাদের পুনর্বাসন না করে এবং প্রশাসন নিয়ম অনুযায়ী উচ্ছেদ না করে তাদের মারধর করা হয়েছে। ওই সময়ে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করতে বরিশালে এসে বিআইডব্লিউটিএ’র ঢাকা কার্যালয়ের অতিরিক্ত পরিচালক মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম জানান, একটি মহলের উসকানিতে অবৈধ স্থাপনা অপসারণ করা যাচ্ছে না। এ নিয়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কা করা হচ্ছে। তবে পরবর্তী সময়ে কীর্তনখোলা নদী তীরে স্থায়ী বাঁধ দিয়ে নদী অপদখলমুক্ত করা হবে বলে জানায় বিআইডব্লিউটিএ’র প্রকৌশল বিভাগ। গত ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে জেলা প্রশাসককে অবৈধ দখল উচ্ছেদ ও প্রতিবেদন প্রকাশের নির্দেশনা থাকলেও বরিশালে দখল উচ্ছেদে সে মোতাবেক কোনো অভিযান পরিচালনা করা হয়নি। তবে জেলা প্রশাসক এস এম অজিয়র রহমান জানান, নদী তীরে দখলের তালিকা তৈরির জন্য উপজেলায় নির্বাহী কর্মকর্তাদের চিঠি দেওয়া হয়েছে। এজন্য কার্যক্রম চলমান রয়েছে। এছড়া নদী রক্ষায় পৃথক দফতর, জনবল নিয়োগ, অর্থিক বরাদ্দ দেওয়া প্রয়োজন বলেও জানান তিনি।

 

"