শাহজাদপুরের খামার থেকে নিরাপদ দুধের জোগান

প্রকাশ : ১৩ মে ২০১৯, ০০:০০

সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি

সরকার পরিচালনাধীন সমবায়ী প্রতিষ্ঠান ‘মিল্ক ভিটা’র প্রক্রিয়াজাত দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্যের জন্য দুধের সিংহ ভাগের জোগান আসে সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরের গো খামার থেকে। গো খামার ছাড়াও মিল্ক ভিটা প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে দুধ সংগ্রহ করে দেশের দুগ্ধ ও দুগ্ধজাত পণ্যসামগ্রীর চাহিদা পূরণ করে আসছে। খামারি ও কর্মকর্তাদের দাবি, মিল্ক ভিটায় তারা নিরাপদ দুধ সরবরাহ করে আসছেন। শাহজাদপুরের বাঘাবাড়িতে অবস্থিত মিল্ক ভিটার সবচেয়ে বড় কারখানায় দুধ প্রক্রিয়াজাতকরণ ছাড়াও ঘি, মাখন, দই, আইসক্রিমসহ নানা ধরনের পণ্য উৎপাদন হচ্ছে। মিল্ক ভিটার প্রায় শতকরা ৮০ ভাগ দুধ শাহজাদপুরের বিভিন্ন অঞ্চলের কৃষকদের দুগ্ধ খামার থেকে সংগ্রহ করা হয়।

শাহজাদপুর উপজেলা ভেটেরিনারি সার্জন ডা. মীর কাওসার হোসেন মুঠোফোনে প্রতিদিনের সংবাদকে জানান, নিরাপদ দুগ্ধ সরবরাহ নিশ্চিত করতে আমরা খামারি এলাকা প্রায়ই পরিদর্শন করি। তাছাড়াও মাঝে মাঝে মোবাইল কোর্ট দেওয়া হয়।

গো খামার মালিক এবং বাংলাদেশ মিল্ক ভিটা রাজশাহী বিভাগের পরিচালক মো. আব্দুস সামাদ ফকির প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, নিরাপদ ও ক্ষতিকর উপাদন মুক্ত দুধ সংগ্রহ ও সরবরাহ নিশ্চিত করতে মিল্ক ভিটার আওতাভুক্ত খামারগুলোয় নিরাপদ গো খাদ্য দেওয়া হয়। গো খামারে কর্মরত শ্রমিক কাঙ্গাল মন্ডল জানায়, এই বাথানগুলোতে রাখা গাভি ১২ থেকে ২৬ লিটার পর্যন্ত দুধ দিয়ে থাকে। এসব গরুর খাবার বলতে চারণভূমির ঘাস এবং খৈল ভুষি। সেখানে কোনো ক্ষতিকর কিছু দেওয়া হয় না। আমরা গরুকে ভেজালমুক্ত খাবার দেই।

দেশের গো সম্পদকে আরো কাজে লাগাতে স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে বাঘাবাড়িতে মিল্কভিটা কারখানা স্থাপন করা হয়। এ অঞ্চলের আওতায় শতাধিক দুগ্ধ সমবায় সমিতি রয়েছে। সমিতিতে সহ¯্রাধিক গো খামার রয়েছে। এসব সমিতি প্রতিদিন দুধ সরবরাহ করে থাকে। এছাড়া এ অঞ্চলের প্রায় বাড়িতে ব্যক্তি পর্যায় গাভী পালন করা হয়। এসব গাভীর দুধও সংগ্রহ করে মিল্ক ভিটা। শুধু মিল্ক ভিটা নয়। প্রাণ, আকিজ, আফতাব, ব্র্যাক ফুড (আড়ং), আমো ফ্রেশ মিল্ক, কোয়ালিটি, বিক্রমপুরীসহ বেশকিছু বেসরকারি দুগ্ধ প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠান দুধ সংগ্রহ করতে এ অঞ্চলে তাদের আঞ্চলিক দুগ্ধ সংগ্রহশালা স্থাপন করেছে।

শাহজাদপুরের পশ্চিমে বয়ে যাওয়া গোহালা নদীর কোল ঘেষে পোতাজিয়া ইউনিয়নের রাউতবাড়ি, বড়ভিটা, ছোটভিটা, বুড়িরভিটা, কুটিরভিটাতে এবং কাউয়ার্ক এবং হান্ড্রী এলাকায় রয়েছে সুবিশাল গোচারণ ভূমি। সেখানে আছে প্রায় ২৫টি বাথান। প্রতিটি বাথানে ৩ থেকে ৪ হাজার গাভী লালন পালন করা হয়। পৌষ থেকে জ্যৈষ্ঠ মাস (ছয় মাস) পর্যন্ত গাভীগুলো বাথান এলাকায় অবস্থান করে। সাধারণত বন্যার পানি গো চারণ ভূমি থেকে নেমে যাওয়ার পর সেখানকার ঘাস খাওয়ার উপযোগী হলেই গবাদিপশু বাথানে নেওয়া হয়। বাথানের অপেক্ষাকৃত উঁচু স্থানে বাঁশের ঘেরা দিয়ে গরুগুলো রাখা হয়। তবে বকনা, থারি, ষাঁড় এবং বাছুরগুলোর জন্য রয়েছে আলাদা থাকার ব্যবস্থা। বিস্তীর্ণ গোচারণ ভূমিতে চরে বেড়ানোর পর বিকালে এরা তাদের নির্দিষ্ট থাকার জায়গায় (ঘেরায়) ফিরে আসে। খৈল-ভুসিসহ গো খাদ্য রাখার জন্য এবং রাখালদের থাকার জন্য রয়েছে আলাদা খড়ের তৈরি ঘর। প্রায় ছয় মাস রাখালদের থাকতে হয় এখানে। প্রতি রাখালকে ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা বেতন, খাবার এছাড়াও সাপ্তাহিক হাত খরচও দেওয়া হয়।

বাথানের প্রতিটি গাভীর আলাদা আলাদা নাম রয়েছে, যেমনÑ শাবানা, জোসনা, সাধনা, ববিতা, জাহানারা, তৃপ্তি, শাবনুর ইত্যাদি। দুধ দোহনের সময় নাম ধরে ডাকলে, সেই নামের গাভি সাড়া দেয়। আর ‘শাবানার ছাওয়াল’ বললেই বাথানের অন্য প্রান্ত হতে ‘শাবানা’র বাছুরও ছুটে আসে মায়ের দুধ পান করার জন্য। প্রতি লিটার দুধের মূল্য ৪০ থেকে ৪২ টাকা। গাভির বকনা বাছুর ছাড়া অন্য বাছুর বিক্রি করে দেওয়া হয়। বছরে এমন বাছুর বিক্রি করা হয় ১০ থেকে ১২ লাখ টাকার। এলাকার সকল দুগ্ধ খামারি সমিতির সদস্যভুক্ত। প্রতিদিন সকালে বিকালে এরা তাদের সমিতিতে দুধ প্রদান করে।

জেলা প্রাণিসম্পদ অফিসার ডা. মো. আখতারুজ্জামান ভূইয়া জানান, মিল্ক ভিটার দুধ নিরাপদ, এই দুধে কোনো ক্ষতিকর উপাদান নেই। বাংলাদেশ মিল্ক ভিটা রাজশাহী বিভাগের পরিচালক মো. আবদুস সামাদ ফকির এবং রাজশাহী প্রাণিসম্পদ বিভাগের উপপরিচালক কল্যাণ কুমার ফৌজদার প্রতিদিনের সংবাদকে জানান, পুষ্ঠিহীনতা দূর করতে বঙ্গবন্ধু ভারতে আমূল ডেইরি দেখে এই মিল্ক ভিটা স্থাপন করেছিলেন। এখন প্রায় ৭০০ এর অধিক সমিতি আছে। প্রায় ১৫০টির অধিক বাথান আছে বলে জানায় কর্মকর্তারা। প্রতি লিটার দুধ ৪২ টাকা। এখানে প্রতিদিন গড়ে ১ লাখ ৩৫ হাজার লিটার দুধ উৎপন্ন হয়।

 

"