রানাপ্লাজা ট্র্যাজেডি

‘নিজের হাত নিজে কেটেই বের হই ধ্বংসস্তূপ থেকে’

প্রকাশ : ২৪ এপ্রিল ২০১৯, ০০:০০

রাকিবুল ইসলাম রাকিব, গৌরীপুর (ময়মনসিংহ)

‘পা দুটো চাপা পড়েছিল মেশিনের নিচে। কোমরে ঢুকে গিয়েছিল রড। বাম হাতটা আটকে গিয়েছিল পিলারের নিচে। সামান্য নড়াচড়াও করার সাধ্য ছিল না। উদ্ধারকর্মীরা বের করে আনার চেষ্টা চালিয়ে ব্যর্থ হন। সহকর্মীদের লাশ থেকে

ততক্ষণে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছিল, দম বন্ধ হওয়ার মতো অবস্থা। এর মধ্যে দ্বিতীয় দিন চিকিৎসক আমাকে প্রস্তাব দেন নিজে নিজে বাম হাত কেটে বের হয়ে আসতে। কিন্তু সাহস পাচ্ছিলাম না। পরে জীবন বাঁচাতে হাত কাটার সিদ্ধান্ত নেই। চিকিৎসকের শিখিয়ে দেওয়া পদ্ধতিতে তৃতীয় দিন দুপুরে বিশেষ ব্লেড দিয়ে নিজেই নিজের বাম হাত কেটে বের হই ধ্বংস্তূপের নিচ থেকে। ততক্ষণে আমার শরীর ফুলে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছিল। ধ্বংসস্তূপে চাপা থাকার সময় বারবার মনে হচ্ছিল ছোট বোন মর্জিনার কথা। পরে ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে জানতে পারি মর্জিনা ধ্বংসস্তূপে চাপা পড়ে মারা গেছে।’

২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল রাজধানী ঢাকার সাভারের রানাপ্লাজা ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে নিজের হাত নিজেই কেটে বেরিয়ে আসার ঘটনাটা প্রতিদিনের সংবাদের কাছে এভাবেই বর্ণনা করছিলেন গার্মেন্ট কর্মী রোজিনা আক্তার (২৮)।

রোজিনার বাবার নাম ছফুর উদ্দিন। তিন বোন দুই ভাইয়ের মধ্যে রোজিনা সবার বড়। খুব অল্প বয়সেই তার বিয়ে হয়। স্বামীর একার আয়ে সংসার চলত না বলে রানাপ্লাজার তৃতীয় তলায় একটি গার্মেন্ট ফ্যাক্টরিতে কাজে নেয় সে। ওই গার্মেন্টে তার ছোট বোন মর্জিনাও কাজ করত। সেটাই তার জীবনের কাল।

দুর্ঘটনা স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে রোজিনা আক্তার বলেন, ‘আগে থেকে রানাপ্লাজার ভবনে ফাটল দেখা দিয়েছিল। ঘটনার দিন (২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল) গার্মেন্ট কর্মীরা কেউই ভেতরে ঢুকতে চাচ্ছিল না। কিন্তু কর্তৃপক্ষ সকাল ৮টার শিফটে আমাদের জোর করেই কারখানার ভেতেরে নিয়ে যায়। আনুমানিক পৌনে ৯টার সময় আমার মেশিনের পাশের একটি পিলার ঝুরঝুর করে ভেঙে পড়তে শুরু করে। শুরু হয় শ্রমিকদের চিৎকার আর আর্তনাদ। যে যার মতো ছুটছে ফ্লোরজুড়ে। কেউ খুঁজছে সিঁড়ির পথ। এরপর আর কোনো কিছুই মনে নেই। চেতনা ফেরার পর চোখ মেলেই দেখি ধ্বংসস্তূপে চাপা পড়ে আছি।’

উদ্ধারের পর রোজিনা সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ), ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ও সিআরপিতে ৭ মাস চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হন। এরপর বিভিন্ন সংস্থার অনুদান থেকে পাওয়া টাকায় নিজ বাড়ি ময়মনসিংহের গৌরীপুরের গাজীপুর বাজারের পাশে জমি কিনে নতুন বাড়ি নির্মাণ করেছেন রোজিনা।

রোজিনার স্বামী সাইদুল ইসলাম পেশায় ভ্যানচালক। বড় মেয়ে রিমি আক্তার স্থানীয় একটি স্কুলে পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ে। ছোট মেয়ে সাদিয়া আক্তারের বয়স চার বছর। দুর্ঘটনার পর কয়েক বছর সুস্থ থাকলেও এখন শ্বাসকষ্ট, হৃদরোগ ও শরীর ব্যথাসহ নানা রকম রোগে ভুগছেন রোজিনা।

রোজিনা আক্তার বলেন, দুর্ঘটনার পর আমার বাসস্থানের নিশ্চয়তা হলেও জীবিকার নিশ্চয়তা পাইনি। স্বামীর ভ্যানগাড়ি চালানোর আয়ে সংসার চলে না। প্রতিবন্ধী ভাতাও ভাগ্যে জোটেনি। গত দুই বছরে নিজের চিকিৎসা করতে গিয়েই কয়েক লাখ টাকা ঋণ হয়েছে। খেয়ে না খেয়ে সংসার চলছে। সন্তানের পড়াশোনার খরচ দিতে পারি না, স্কুলে মেয়ের চার মাসের বেতন বকেয়া। দুই সন্তানের লেখাপড়া ও আমার চিকিৎসার খরচের জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে সুদৃষ্টি কামনা করছি।

ইউএনও ফারহানা করিম বলেন, সমাজসেবা কার্যালয়ে লিখিত আবেদন করলে রোজিনাকে সাহায্য করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।

 

 

"