নৌ- শ্রমিকদের ধর্মঘট বিপাকে যাত্রীরা

প্রকাশ : ১৭ এপ্রিল ২০১৯, ০০:০০

প্রতিদিনের সংবাদ ডেস্ক

বেতন-ভাতা বৃদ্ধি, নিরাপত্তা, নৌপথে চাঁদাবাজি বন্ধসহ ১১ দফা দাবিতে দেশব্যাপী লাগাতার কর্মবিরতি পালন করছেন নৌযান শ্রমিকরা। নৌযান শ্রমিকদের একাংশের ডাকে গত সোমবার দিবাগত রাত ১২টা থেকে এ কর্মবিরতি শুরু হয়। এ কারণে চট্টগ্রাম, চাঁদপুর, খুলনা, বরিশাল, ভোলা, লক্ষ্মীপুরসহ বিভিন্ন নৌবন্দর থেকে যাত্রীবাহী, মালবাহী ও তেলবাহীসহ সব ধরনের নৌযান চলাচল বন্ধ রয়েছে। এদিকে, গতকাল মঙ্গলবার সন্ধায় আবারো শ্রমিক নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে বসেন শ্রম প্রতিমন্ত্রী বেগম মন্নুজান সুফিয়ান। এরিপোর্ট লেখা পর্যন্ত বৈঠক চলছিল। নৌধর্মঘটে সীমাহীন দুর্ভোগে পড়েছেন যাত্রীরা। এছাড়া গতকাল রাত ৮টা পর্যন্ত সদরঘাট থেকে ৮টা লঞ্চ ছেড়ে যায়। সাধারণত প্রতিদিন সেখান থেকে ৭০ থেকে ৭৫টি লঞ্চ ছাড়ে যায়।

অপরদিকে, গত সোমবার শ্রম অধিদফতরের সম্মেলন কক্ষে শ্রম প্রতিমন্ত্রী মন্নুজান সুফিয়ানের সঙ্গে নৌযান মালিক-শ্রমিক নেতাদের সঙ্গে বৈঠক শেষে একাংশের নেতারা ধর্মঘট প্রত্যাহারের ঘোষণা দেন। সেই খবরে অনেকেই ঢাকা সদরঘাটসহ দেশের বিভিন্ন নৌবন্দরে এসে লঞ্চ চলাচল বন্ধ পেয়ে বিপাকে পড়েন।

বিআইডব্লিউটিএ’র পরিবহন পরিদর্শক দিনেশ কুমার সাহা বলেন, সোমবার রাত ১২টার পর ঢাকা সদরঘাট থেকে কোনো লঞ্চ ছাড়েনি। তবে দক্ষিণাঞ্চল থেকে রাত ১২টার আগে ছেড়ে আসা ৪৩টি লঞ্চ গতকাল মঙ্গলবার ভোরে সদরঘাটে এসে পৌঁছে। নৌ শ্রমিকদের ১১ দফা দাবি বাস্তবায়িত না হলে ১৫ এপ্রিল মধ্যরাত ১২টা ১ মিনিট থেকে কর্মবিরতি পালনের ঘোষণা দেন বাংলাদেশ নৌযান শ্রমিক ফেডারেশনের নেতারা। শ্রমিকদের দাবির মধ্যে রয়েছে, নৌপথে সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, শ্রমিক নির্যাতন বন্ধ, সন্ত্রাসীদের গ্রেফতার এবং নৌযান শ্রমিকদের সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। দুর্ঘটনায় কর্মস্থলে কোনো শ্রমিকের মৃত্যু হলে তার পরিবারকে ১০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। সেই সঙ্গে সমুদ্র ভাতা ও রাত্রিকালীন ভাতা নির্ধারণ করতে হবে।

ধর্মঘটেও লঞ্চ চালানোর সিদ্ধান্ত মালিকদের : নৌযান শ্রমিকদের ধর্মঘটের মধ্যেও লঞ্চ চালানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে মালিকপক্ষ। তারা অভিযোগ করেছেন, শ্রমিকরা তাদের দাবি নিয়ে আলোচনায় আসছেন না।

বিআইডব্লিউটিএর পরিবহন পরিদর্শক দিনেশ কুমার সাহা বলেন, শ্রমিকরা ধর্মঘট প্রত্যাহার করেননি। তবে কিছু লঞ্চ পন্টুনে ভিড়েছে। বরগুনা, হাতিয়া, বেতুয়া, বোরহান উদ্দিন বরিশাল, ঝালকাঠি রুটের এমভি জাহিদ ৮, রনধূত, ফারহান ৩, ৬, ১০ ও ১২ রাশেদ ১, টিপু ৭ লঞ্চগুলো পন্টুনে দেখা গেছে।

এমভি টিপু-৭ এর মহাব্যবস্থাপক ফারুক হোসেন বলেন, বিকাল সোয়া ৫টা থেকে সদরঘাট থেকে লঞ্চ ছেড়ে যাবে। মিতালী লঞ্চের মাস্টার মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, আমাদের ধর্মঘট চলছে। এখন কিছু মালিক লস্কর ও ডকে পড়ে থাকা বেকার মাস্টার দিয়ে লঞ্চ চালানোর উদ্যোগ নিয়েছেন।

চট্টগ্রাম ব্যুরো : কর্মবিরতির কারণে চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দরের বহির্নোঙরে বড় জাহাজ থেকে ছোট আকারের লাইটার জাহাজে পণ্য স্থানান্তর করা যাচ্ছে না। নৌযান শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি শাহ আলম ভূঁইয়া গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে বলেন, সারা দেশে ২ লাখ নৌযান শ্রমিক কর্মবিরতিতে অংশ নিয়েছেন।

খুলনা : নৌযান শ্রমিকদের ধর্মঘটে খুলনা ও মংলা বন্দরে পণ্যবাহী নৌ চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। গতকাল মঙ্গলবার খুলনার বিআইডব্লিউটিএ, ৪, ৫, ৬ ও ৭ নম্বর ঘাট এবং রুজভেল্ট জেটিতে অবস্থানরত কোনো জাহাজ থেকে পণ্য খালাস করা হয়নি। এমনকি মংলাবন্দর থেকে যশোরের নওয়াপাড়া পর্যন্ত কোথাও কোনো নৌযান চলছে না। ধর্মঘট খুলনা ও মংলায় সর্বাত্মকভাবে পালিত হচ্ছে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া : ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জে অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতি শুরু পালন করছেন লঞ্চ, বাল্কহেড, তেলবাহী ট্যাঙ্কার, বালুবাহী নৌকা, লাইটার জাহাজসহ সব ধরনের নৌযান শ্রমিকরা। প্রায় ২ শতাধিক কার্গো জাহাজ আশুগঞ্জ নৌবন্দরে আটকে পড়ে আছে। বন্ধ হয়ে গেছে আশুগঞ্জের সঙ্গে দেশের পূর্বাঞ্চলীয় ছয়টি নৌ-রুটের পাঁচ জেলা সিলেট, কিশোরগঞ্জ, হবিগঞ্জ, সুনামগঞ্জ এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ১৪টি উপজেলার লঞ্চ যোগাযোগ। পূর্বাঞ্চলীয় কার্গো মালিক সমিতির সভাপতি হাজি মো. নাজমুল হোসাইন হামদু জানান, ধর্মঘটের কারণে ব্যবসায়ীদের বিভিন্ন শিল্প প্রতিষ্ঠানের উৎপাদিত জরুরি কাঁচামাল নিয়ে জাহাজ আটকা পড়েছে। এ মুহূর্তে জাহাজ বন্ধ থাকলে আমরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হব।

লক্ষ্মীপুর : লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার মজুচৌধুরীরহাট ঘাট থেকে অভ্যন্তরীণ ও দূরপাল্লার কোনো নৌযান ছেড়ে যায়নি। এই ঘাট থেকে দক্ষিণাঞ্চলের ২১ জেলার মানুষ চলাচল করে। আন্দোলনরত নৌ শ্রমিকরা জানান, যত দিন পর্যন্ত তাদের দাবি মেনে না নেওয়া হবে, তত দিন আন্দোলন চলবে। অপরদিকে যাত্রীরা জানান, ধর্মঘটে বেকাদায় পড়েছেন তারা। ঘাটে কোনো খাবার হোটেল ও টয়লেট না থাকায় আরো বড় ধরনের দুভোর্গের শিকার হতে হয় হচ্ছে। দ্রুত লঞ্চ চলাচল শুরু করার দাবি জানিয়েছেন তারা।

বাগেরহাট : বাংলাদেশ লঞ্চ লেবার অ্যাসোসিয়েশনের মংলা শাখার সাধারণ সম্পাদক মো. আনোয়ার হোসেন চৌধুরী ও বাংলাদেশ লাইটারেজ শ্রমিক ইউনিয়নের মংলা শাখার সাধারণ সম্পাদক মো. মামুন হাওলাদার বাচ্চু জানান, কর্মবিরতির ফলে মংলা বন্দরের পশুর চ্যানেল ও মংলা নদীতে পণ্য বোঝাই ও খালি কার্গো-কোস্টার জাহাজ ছেড়ে যায়নি। সারা দেশের প্রায় ২০ হাজার নৌযানের ২ লাখ শ্রমিক এ কর্মবিরতি পালন করছেন বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ নৌযান শ্রমিক ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক চৌধুরী আশিকুল আলম পটল। তিনি বলেন, নৌযান শ্রমিকদের আন্দোলনকে বিভ্রান্ত ও বিভক্ত করার অপচেষ্টা চলছে।

 

"