সীমান্তে মিলনমেলা

১২ বছর পর দেখা হলো মা-বাবার

প্রকাশ : ১৬ এপ্রিল ২০১৯, ০০:০০

শাকিল আহমেদ, ঠাকুরগাঁও

১২ বছর আগে বাংলাদেশে বিয়ে হয় সুমিত্রা রানীর। এরপর আর কোনো দিনও মা-বাবার সঙ্গে দেখা হয়নি তার। এ বছর সীমান্তের মিলনমেলায় বাবা জয়দেব বর্মণ ও মা রেখা রানীর দেখা পেয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন মেয়ে সুমিত্রা রানী। এরপর কান্না সামলে মা-বাবাকে একটু খানি ছুঁয়ে দেখার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন। কারণ ভারত-বাংলাদেশের সীমান্ত এখন কাঁটাতারে বিদ্ধ। মেয়ে ও মা-বাবার মাঝখানে ছিল কাঁটাতার। ছুঁয়ে দেখতে না পারলেও দেখে শান্তি ও তৃপ্তি পেয়েছেন সুমিত্রা রানী।

এভাবেই মনের কথাগুলো বলেন ঠাকুরগাঁওয়ের রানীশংকৈল উপজেলার নেকমরদ থেকে আসা গৃহবধূ সুমিত্রা রানী। প্রতি বছরের মতো এ বছরও গতকাল সোমবার জেলার হরিপুর উপজেলার কোচাল ও চাঁপাসার এবং ভারতের নাড়গাঁও ও মাকারহাট সীমান্তের কাঁটাতারের এপারে-ওপারে প্রায় তিন কিলোমিটার এলাকাজুড়ে মিলনমেলা হয়।

স্থানীয় পাথর কালীমন্দিরের বার্ষিক আয়োজনকে কেন্দ্র করে প্রতিবারের মতো এবারও সীমান্তে মানুষের ঢল নামে। প্রতিবছর এই দিনে দুই দেশের স্বজনরা ভিড় করেন সীমান্তের ৩৪৫ ও ৩৪৬ নম্বর পিলার এলাকায়। এ দিন সকাল থেকে দুই দেশের স্বজনরা সীমান্তে সমবেত হতে থাকেন। স্বজনদের সঙ্গে একটু চোখের দেখা ও কথা বলার জন্য দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে থাকেন দুই দেশের শত শত মানুষ। দুপুর ১টা থেকে তারা স্বজনদের সঙ্গে দেখা ও কথা বলতে থাকেন। একে অপরকে নানা ধরনের খাবার ও উপহার সামগ্রী দেন।

সরেজমিন দেখা যায়, স্বজনদের দেখে অনেকে কান্নায় ভেঙে পড়েন। কেউ তাদের স্বজনকে সহজে পেলেও স্বজনকে খুঁজতে কারো অনেক সময় লেগেছে। অনেকে স্বজনকে দেখতে না পেয়ে আহাজারি করেন। স্বজনদের সঙ্গে দেখা করতে সীমান্তের মিলনমেলায় এসেছিলেন পঞ্চগড়ের বৃদ্ধা সুমাইয়া বেগম (৬৬)। তিনি বলেন, এবার দেখা হয়েছে বড় ভাই সিরাজ উদ্দীনের সঙ্গে। ১৯৭১-এর স্বাধীনতার সময় সুমাইয়ার বিয়ে হয়। সর্বশেষ ২০ বছর আগে বাবা-মা ও ভাইবোনদের সঙ্গে দেখা হয়েছিল তার।

হরিপুর উপজেলার গেদুরা এলাকার নাজমুল ইসলাম বলেন, ভারতের পশ্চিম দিনাজপুরে চাচাতো ভাই থাকেন। দেশ ভাগের সময় চাচা চলে যান সেখানে। প্রতি বছর অপেক্ষায় থাকি কখন পাথর কালীর মেলা হবে। ভাইকে দেখতে পেয়েছি, কথা বলেছি। কিন্তু তারকাঁটার কারণে ছুঁয়ে দেখতে পারিনি।

সীমান্তে মিলনমেলায় বালিয়াডাঙ্গী উপজেলার কালমেঘ গ্রামের আবদুস সোবহান (৫২) বলেন, ভারতের নদিয়া জেলার কাহারোল গ্রামে মেয়ে কমলা রানীর বিয়ে দিয়েছি। সীমান্তে এসেছি মেয়ে-জামাইয়ের সঙ্গে দেখা করতে; তাদের দেখতে পেয়ে খুব ভালো লেগেছে।

হরিপুর উপজেলার ভাতুরিয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান শাহজাহান সরকার বলেন, মিলনমেলাটি ভারতে থাকা স্বজনের সঙ্গে এই এলাকার মানুষের দেখা করার মাধ্যম। দুই দেশের সরকারকে অনুরোধ করছি, এটি যেন প্রতি বছর চালু থাকে।

হরিপুর থানার অফিসার ইনচার্জ আমিরুজ্জামান বলেন, কড়া প্রহরার মধ্যেই তারা কথা বলেছেন এবং খাদ্যবিনিময় করেছেন।

পাথর কালীপূজা কমিটির সভাপতি নগেন কুমার পাল বলেন, ভারতে নির্বাচন চলছে; এজন্য সীমান্তের মিলনমেলায় স্থানীয় প্রশাসন, বিজিবি ও বিএসএফের পক্ষ থেকে সীমান্তে কঠোর নজরদারি ছিল। তারপরও এ বছর মিলনমেলায় দুই দেশেই প্রচুর মানুষের সমাগম ঘটেছে। দুই দেশের মানুষেরা তাদের আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে দেখা করেছেন। এপার-ওপারে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলো তাদের আত্মীয়-স্বজনদের মাঝে খাদ্যবিনিময় করেছেন।

"