বাংলা নববর্ষেও কলকাতা সরগরম রাজনীতিতে

প্রকাশ : ১৬ এপ্রিল ২০১৯, ০০:০০

পার্থ মুখোপাধ্যায়, কলকাতা থেকে

কলকাতার একাডেমি অব ফাইন আর্টস চত্বরে পান্তা থেকে ইলিশ ভাপা, ভর্তা, চাটনি-মিষ্টির আয়োজন ছিলই। ঢাকার আদলে ছিল ছোট করে মঙ্গল শোভাযাত্রার আয়োজনও। কিন্তু ১৪২৬, বাংলা নববর্ষের দিন কলকাতা হেঁটেছে পুরোনো পথেই। ভোররাত থেকে দক্ষিণে কালীঘাট আর উত্তরে দক্ষিনেশ্বর মন্দিরে, ডালায় লক্ষ্মীÑ গণেশের মূর্তির সঙ্গে নতুন বছরের হালখাতার পরিচিত লাল শালু মোড়ানো হিসাবের খাতা নিয়ে লম্বা লাইন। সম্বৎসরের লক্ষ্মী লাভের আশায়। জেলা শহর বা মফস্বলে পাড়ায় পাড়ায় প্রভাতফেরি। সকাল থেকে মাংসের দোকানে দীর্ঘলাইন আর বেলা বাড়তেই বাংলাদেশের মানুষজনের চেনা জায়গা, নিউমার্কেট, মারকুইজ স্ট্রিটের দোকানগুলোতে বাংলা রান্নার খোঁজে ভোজনরসিকদের ভিড়, চেনা ছবি।

আর দুদিন পরই রাজ্যে দ্বিতীয় দফার লোকসভার ভোট। ফলে রাজনৈতিক নেতা-নেত্রীদের সঙ্গে ভোট প্রার্থীরা বছরের প্রথম দিনটাই কাজে লাগিয়েছেন জনসংযোগের সঙ্গে পথচলতি মানুষজনকে শুভ নববর্ষ বলে। রোববার মধ্যরাতেই বাড়ির সামনে কালীঘাটের মন্দিরে পুজো দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তারপর গতকাল সোমবার সকালে আবার বেরিয়ে পড়েছেন নির্বাচনী প্রচারে। এবার মুর্শিদাবাদে। বেলডাঙা-ভগবানগোলা, সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এলাকা হিসেবে পরিচিত। মাঝের কয়েক বছরে কংগ্রেসের ঘর ভাঙালেও এখনো পর্যন্ত তৃণমূল কংগ্রেস লোকসভার কোনো আসন জেতেনি মুর্শিদাবাদে। ফলে তৃণমূল নেত্রী বছরের প্রথম দিন মুর্শিদাবাদের মানুষের কাছে বাংলায় ৪২-এ ৪২ করতে তিনটি আসন চেয়েছেন। আর তা করতে গিয়ে প্রথমেই বলেছেন রাজ্যে পরজাতীয় নাগরিকপঞ্জী কিছুতেই কার্যকর হতে দেবেন না। আর তারপর অভিযোগ করেছেন, ছেলে অভিজিৎকে জঙ্গিপুর আসন থেকে জেতাতে সাবেক রাষ্ট্রপতি ও কংগ্রেস নেতা প্রণব মুখোপাধ্যায় এবার বিজেপি ঘনিষ্ঠ রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ বা আরএসএসের সাহায্য নিয়েছেন, যা নিয়ে সরগরম রাজ্য রাজনীতি।

অথচ এই সেদিনও নববর্ষ তো বটেই, পুজো, পালা পার্বণে, দাদা, প্রণব এবং বৌদি শুভ্রার জন্য ধুতি-পাঞ্জাবি, শাড়ি পাঠাতেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রাষ্ট্রপতি হওয়ার পরও।

আসলে দিনবদলে বদলাচ্ছে কলকাতার বাঙালিরা। রাজনৈতিক নেতাদের মতোই। সেক্টর ফাইভে আইটি সেক্টরে দিনরাত মানে, ২৪/৭ কাজ হয়, সেখানে নববর্ষের ছুটি নেই। রাজ্যের সরকারি অফিস বন্ধ, কিন্তু কেন্দ্রীয় সরকারের অফিস খোলা। কলকাতার তাপমাত্রা গতকাল সোমবার ছিল ৩৬ ডিগ্রি, সঙ্গে অসহ্য আর্দ্রতা। ফলে ছেলেদের পাঞ্জাবি ঘেমে একশা, মেয়েরা একটু ছায়া খুঁজতে বয় ফ্রেন্ডকে নিয়ে সিঁধিয়েছেন মাল্টিপ্লেক্সে। সেখানে বাংলা সিনেমা খুঁজতে দুরবিন লাগবে। ইংরেজি নববর্ষ রাত ১২টার পর শুরু হলেও ঐতিহ্যগতভাবে বাংলা দিন গণনা হয় সূর্যোদয় থেকে। নতুন জামা, গঙ্গাস্নানে শুরু হয় বাংলা নববর্ষ। চলে খাওয়া-দাওয়া, দিনভর আড্ডা। পহেলা বৈশাখের আগের রাত থেকেই পুজোর ডালি নিয়ে মন্দিরে হাজির হন ভক্তরা। একসময় নতুন জামা-কাপড় পরে আত্মীয়স্বজন, বন্ধু-বান্ধবের বাড়ি যাওয়া, খাওয়া-দাওয়া, আড্ডা, বড়দের প্রণাম করার সঙ্গে মিষ্টিমুখ। আর এখন নতুন জামা-কাপড় হয় বটে। কিন্তু বাকি রীতি প্রায় বিলুপ্তির পথে। আধুনিক বাঙালি ডিজিটাল পদ্ধতিতেই নববর্ষের শুভেচ্ছা বিনিময় করেছে ফেসবুক, হোয়াটস্যাপ ও মেসেঞ্জারে। কালীঘাট ও দক্ষিণেশ্বর মন্দিরে আগের দিন রাত থেকেই বহু ব্যবসায়ী ও গৃহস্থ ভিড় করেছেন চিরাচরিত। রীতি মেনে লম্বা লাইনে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে সকালে পুজো দিয়ে বাংলা বছরের প্রথম দিনটি শুরু করেছেন। মায়ের পায়ে ছোঁয়ানো সিঁদুরে স্বস্তিকা চিহ্ন ও চন্দনের ফোঁটা এবং সিদ্ধিদাতা গণেশায় নমঃ লেখা হালখাতায় ব্যবসায়ী নতুন বছরের হিসাব শুরু করেছেন। শহর ও শহরতলি এমনকি রাজ্যের বিভিন্ন স্থানে আয়োজন করা হয় বৈশাখী মেলা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের। বাংলাদেশ লাগোয়া উত্তর২৪ পরগনার গোবরডাঙার যমুনা নদীর তীরে এ দিন শুরু হয় শস্যমেলা, যা গোষ্ঠবিহারী মেলা নামেও পরিচিত।

আর শান্তিনিকেতনে কবির উপাসনা গৃহে গান-স্ত্রোত পাঠের মাধ্যমে সূচনা হয়েছে নববর্ষের। বিশ্বভারতীর উপাচার্যের নেতৃত্বে অধ্যাপক-অধ্যাপিকাদের সঙ্গে ছাত্রছাত্রীরা বরণ করে নিয়েছেন নতুন বছর, ১৪২৬। যার মধ্যে ছিলেন বাংলাদেশের ছাত্রছাত্রীরাও।

"