বিজু সাংগ্রাই বৈসুক

পাহাড় মেতেছে উৎসবে

প্রকাশ : ১২ এপ্রিল ২০১৯, ০০:০০

প্রতিদিনের সংবাদ ডেস্ক

ফাইখালে, ফাইখালে, গড়াইয়া ফাইখালে... (এসেছে এসেছে গড়াইয়া নাচের দল)। পাহাড়ের গ্রামগুলোয় এখন এই শব্দগুলো ভেসে বেড়াচ্ছে। এসব শব্দ লাগছে পাহাড়ের গায়ে। তাতে দোল খাচ্ছে শেষ বসন্তে ফোটা বাহারি ফুল, গাছপালা। পাহাড় মেতেছে উৎসবে। চাকমাদের বিজু, মারামাদের সাংগ্রাই আর ত্রিপুরাদের বৈসুক উৎসবে। পার্বত্য চট্টগ্রামের (রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান) ১১ ভাষাভাষীর ১৫টি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী পাহাড়ি জাতিসত্তাদের ঐতিহ্যবাহী প্রধান সামাজিক উৎসব হচ্ছে বিজু, সাংগ্রাই, বৈসুক, বিষু, বিহু। উৎসবটির বিভিন্ন নামে পালন করা হলেও এর নিবেদন কিন্তু একই। তাই এ উৎসবটি আদিবাসী পাহাড়িদের শুধু আনন্দের নয়, পার্বত্য চট্টগ্রামের সব সম্প্রদায়ের সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, ঐক্য ও মৈত্রী বন্ধনের প্রতীকও বটে। মূলত পুরোনো বছরের সব দুঃখ কষ্ট ও গ্লানিকে মুছে ফেলে দিয়ে নতুন বছরের নব উদ্যোগের শুভ কামনা করা হলো এ উৎসবের মূল উদ্দেশ্য। রাঙামাটি থেকে শফিকুল ইসলাম, খাগড়াছড়ি থেকে শঙ্কর চৌধুরী ও বান্দরবান থেকে জানিয়েছেন রিমন পালিত।

আজ শুক্রবার উৎসবের প্রথম দিন ফুল বিজু। এ দিন ভোরে পানিতে ফুল ভাসানোর মধ্য দিয়ে উৎসবের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হবে। এদিনে শিশু-কিশোর-কিশোরীরা খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠে বনফুল সংগ্রহ করে বাড়ির আঙিনা সাজায় ও তরুণ-তরুণীরা পাড়ায় পাড়ায় বৃদ্ধদের শ্রদ্ধার সঙ্গে স্নান করায়। আদিবাসী মেয়েরা বাড়ি-ঘর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে। সন্ধ্যায় বৌদ্ধ মন্দির, নদীর ঘাট, বাড়িতে প্রদীপ প্রজ্বালন করা হয়। এ দিন নানা খেলাধুলা ও সংস্কৃতি অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।

আর কাল শনিবার উৎসবের দ্বিতীয় দিন মূল বিজু। এ দিনে বাড়িতে বাড়িতে চলে খাওয়া-দাওয়ার পর্ব ও আনন্দ-ফুর্তি। বিভিন্ন রকমের সুস্বাদু খাবার বাড়িতে আসা অতিথিদের পরিবেশন করা হবে।

উৎসবের তৃতীয় দিন রোববার ‘গজ্যাপজ্যা বিজু’। এ দিন পাহাড়িরা সারা দিন ঘরে বসে বিশ্রাম নেয়। বৌদ্ধ মন্দিরে প্রার্থনা ও বয়োজ্যেষ্ঠদের বাড়িতে ডেকে নিয়ে এসে খাওয়ানোসহ আশীর্বাদ নেওয়া হয়।

অন্যদিকে মারমা সম্প্রদায় এ দিন ঐতিহ্যবাহী পানি খেলার আয়োজন করে থাকে। তারা পানি খেলার মাধ্যমে পুরোনো বছরের সব গ্লানি ও দুঃখ-কষ্টকে দূর করে নতুন বছরকে বরণ করে নেয়।

নববর্ষ অর্থাৎ ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের বৈসু উৎসবের সপ্তাহখানেক আগে থেকে পুরোনো বছরের বিদায় ও নতুন বছরকে স্বাগত জানাতে ত্রিপুরা গ্রামগুলোয় শুরু হয় গড়াইয়া নাচ। ত্রিপুরাদের বিশ্বাস, নাচের মধ্য দিয়ে তুষ্ট হন গড়াইয়া দেব। এতে পরিবার, এলাকাবাসীর ও সমাজের সুখ-সমৃদ্ধি অটুট থাকে। খাগড়াছড়িতে গতকাল বর্ণাঢ্য আয়োজনে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর প্রধান সামাজিক উৎসব বৈসাবি উৎসবের উদ্বোধন করা হয়েছে। সকালে খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদ প্রাঙ্গণে বেলুন ও পায়রা উড়িয়ে এ উৎসবের উদ্বোধন করেন টাস্কফোর্স চেয়ারম্যান ও সংসদ সদস্য কুজেন্দ্র লাল ত্রিপুরা।

এরপর পরিষদের প্রাঙ্গণ থেকে বর্ণিল পোশাকে বিভিন্ন বয়স ও জাতি-গোষ্ঠীর হাজারো নারী-পুরুষের অংশগ্রহণে একটি বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা শুরু হয়। শহরের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে পৌর টাউন হল প্রাঙ্গণে গিয়ে শেষ হয়। শোভাযাত্রা শেষে টাউন হল প্রাঙ্গণে আয়োজন করা হয় পাহাড়িদের ঐতিহ্যবাহী নৃত্য।

গড়াইয়া নাচে অংশগ্রহণকারীদের ‘খেয়েবাই’ বলা হয়ে থাকে। একজন আচাই বা ওঝা ও একজন দেওয়াই (দলনেতা) এই নাচ পরিচালনা করেন। গড়াইয়া নাচে রয়েছে ২২টি তাল ও মুদ্রা। এই ২২টি মুদ্রায় মানবজীবনের জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত সব ক্রিয়াকলাপ প্রদর্শিত হয়ে থাকে। এই নাচে কেউ একবার অংশ নিলে তাকে পরপর তিনবার অংশ নিতে হয়। কেউ যদি কোনো কারণে অংশ নিতে না পারে, তবে ক্ষমা চাইতে হয় গড়াইয়া দেবের কাছ থেকে।

ভাইবোনছড়া এলাকার গড়াইয়া নাচের দলের আচাই রবিধন ত্রিপুরা বললেন, গড়াইয়ার দলের সদস্যরা গৃহস্থের উঠানে ২২টি মুদ্রা প্রদর্শন শেষে শুরু হয় বাড়ির কর্তা ও নারীদের নানা বায়না। নাচের মুদ্রায় কেউ দেখতে চান যুবক-যুবতীর প্রেম-বিরহ, স্বামী-স্ত্রীর ঝগড়া।

রবিধন ত্রিপুরাদের দলটি নাচ শেষে পানীয়, টাকা, চালসহ নানা ফলমূল পেল গৃহস্থের কাছে থেকে। তারপর এ দল চলল আরেক বাড়িতে। যে কোনো মাঙ্গলিক উৎসবেই গড়াইয়া নাচের প্রচলন আছে ত্রিপুরা সমাজে। একসময় যুদ্ধযাত্রার আগেও এ নাচ হতো।

ঠিক বর্ষবিদায় ও বরণের এই সময়ে গড়াইয়া নাচের উদ্দেশ্য ওই মঙ্গল কামনাÑ এমনটাই মনে করেন পার্বত্য চট্টগ্রামের সমাজ ও সংস্কৃতির গবেষক অরুনেন্দু ত্রিপুরা। তার মতে, পাহাড়ে এই সময় গড়াইয়া নাচের মধ্যে একটি আর্থসামাজিক তাৎপর্য আছে। জুমনির্ভর গ্রামীণ পাহাড়ি সমাজের সঙ্গে আছে সাযুজ্য। চৈত্র শেষের এই সময়ে জুমের ক্ষেত্র প্রস্তুত হয়ে গেছে। বর্ষার জল পাওয়া মাত্রই জুমে বীজ বপন হবে। গড়াইয়ায় গৃহস্থের মঙ্গল কামনা করা হয়। তার ধনসম্পদ বৃদ্ধির জন্য প্রার্থনা করা হয়। ফসল ভালো না হলে গৃহস্থের মঙ্গল হবে কীভাবে। তাই তো ইষ্ট দেবতার কাছে প্রার্থনা হয় নাচের মাধ্যমে।

সমাজের সহজাত পরিবর্তনের সঙ্গে অনেক কিছুরই পরিবর্তন হয়। পাহাড়ের আর্থসামাজিক-রাজনৈতিক নানা দিকের নানা পরিবর্তন হয়েছে, হচ্ছে। গ্রামনির্ভর পুরো বাংলাদেশে নগরায়ণ হচ্ছে দ্রুত। পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি গ্রামীণ সমাজেও এসেছে পরিবর্তন।

স্থানীয় উন্নয়কর্মী মথুরা বিকাশ ত্রিপুরা মনে করেন, এসব পরিবর্তনের অনিবার্য অভিঘাত পড়ছে পাহাড়ের সংস্কৃতিতে। মথুরা ত্রিপুরা বলছিলেন, আগে সাত দিন সাত রাত গড়াইয়া নাচ হতো। এখন শুধু নিয়ম পালনের জন্যই এর চর্চা। সেই জমজমাট পরিবেশটা এখন নেই।

 

"