বাইশটেকি, প্যারিস ও কালশী

দখল ও দূষণে খাল মিরপুরে জলাবদ্ধতা

প্রকাশ : ১২ এপ্রিল ২০১৯, ০০:০০

নিজস্ব প্রতিবেদক

একসময়ের প্রশস্ত ও খরস্রোতা প্যারিস খালটি কালের পরিক্রমায় পরিণত হয়েছে মৃতপ্রায় খালে। খালে প্রতিনিয়ত ফেলা হচ্ছে ময়লা-আবর্জনা। খাল দখল করে গড়ে উঠেছে বাড়ি ও দোকানপাট। ফলে সামান্য বৃষ্টিতেই তলিয়ে যায় ঢাকার মিরপুর। জলাবদ্ধতার কারণে সড়কেও যানবাহন চলতে পারে না। মোটরসাইকেলও ডুবে যায় পানিতে। এমন অবস্থায় গতকাল বৃহস্পতিবার সরেজমিন খাল দেখতে গিয়ে ক্ষোভে ফেটে পড়েন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) মেয়র মো. আতিকুল ইসলাম। এদিকে মৃতপ্রায় বাইশটেকি ও প্যারিস খাল দুটির যতটুকুও বা টিকে রয়েছে, তা-ও ধীরে ধীরে চলে যাচ্ছে দখলদারদের কবলে। ফলে জলাবদ্ধতা থেকেও রেহাই মিলছে না নগরবাসীর।

সরেজমিন দেখা গেছে, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ৩ নম্বর ওয়ার্ডে এই খালটি অবস্থিত। এই খালটি বাউনিয়া খালের একটি অংশ। এটি বাইশটেকি ও প্যারিস রোড, এভিনিউ-৫ হয়ে মিরপুর ১১ নম্বর সেকশনের মধ্য দিয়ে রূপনগর খালের সঙ্গে মিলিত হয়েছে। ওই এলাকার সাংবাদিক প্লট খাল, ভাসানটেক খাল ও বাইশটেকি খালের প্রবাহ এই খালের সঙ্গে সম্পৃক্ত। তাই ওই এলাকার সব স্যুয়ারেজের পানি নিষ্কাশন এই খাল দিয়েই হয়। পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য মতে, খালটি ২০ থেকে ২৫ ফুট থাকার কথা; কিন্তু সরেজমিন খালটি পাঁচ থেকে সাত ফুট আবার কোথাও কোথাও দুই থেকে তিন ফুট পাওয়া গেছে। আর যেটুকু আছে, তার পানিও নোংরা ও দুর্গন্ধময়।

স্থানীয় কয়েকজন প্রবীণ ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, একসময় এই খালের প্রশস্ততা ছিল বিশাল। এটি বাউনিয়া খালের একটি শাখা খাল। এই খাল দিয়ে একসময় বড় বড় ব্যবসায়িক নৌকা চলাচল করত, জেলেরা এই খাল থেকে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করতেন। কিন্তু সেই খালটি সরু ময়লা-আবর্জনাপূর্ণ নালায় পরিণত হয়েছে।

স্থানীয় প্রবীণ বাসিন্দা রমিজ উদ্দিন বলেন, আমি ছোটবেলায় দেখেছি, যেমন ছিল এই খালটির প্রশস্ততা, তেমনি ছিল গভীরতাও। বছরজুড়েই পানিতে টইটম্বুর থাকত। আজ চোখের সামনে পর্যায়ক্রমে দখলের কারণে খালটি সরু নালায় পরিণত হয়েছে। বর্ষা মৌসুমে এলাকার বর্ষার পানি এই খাল দিয়ে নিষ্কাশন হয়। খালের প্রশস্ততা ও গভীরতা কমে যাওয়ায় এর পানি ধারণক্ষমতা কমে গেছে। তাই বর্ষা হলেই ময়লা ও দুর্গন্ধময় পানি উপচে এলাকা প্লাবিত হয়। পানিবন্দি হয়ে পড়ে হাজার হাজার পরিবার। বর্ষার পানিতে রাস্তাঘাট ডুবে যায়, তখন যানবাহন চলাচল ব্যাহত হয়। আর দুর্গন্ধ ও ময়লা পানির কারণে এলাকায় দেখা দেয় বিভিন্ন ধরনের পানিবাহিত রোগ। এই খাল থেকে প্রতিনিয়ত ময়লা-আবর্জনার পচা দুর্গন্ধে ওই এলাকার বায়ুদূষণ হচ্ছে। কিন্তু এসব কেউ যেন দেখার নেই।

স্থানীয় বাসিন্দা আলী আসগর বাবু বলেন, এই খাল বর্ষা মৌসুমে এলাকার পানি নিষ্কাশনের একমাত্র অবলম্বন। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয়, খালটি বিভিন্নভাবে ময়লা-আবর্জনা ও দুর্গন্ধের ড্রামে পরিণত হয়েছে। বিভিন্ন মহলের দখলের কারণে দিন দিন খালটির প্রশস্ততা কমছে। কর্তৃপক্ষের অবহেলার কারণে খালটির এই দুর্দশা। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ খালটি দূষণমুক্ত ও পুনর্খনন করে উদ্ধার না করলে শিগিগরই বিলীন হয়ে যাবে। দখলদার সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, নানা সময় প্রভাবশালীরা এই খাল দখল করেছে।

এ প্রসঙ্গে ডিএনসিসি মেয়র মো. আতিকুল ইসলাম বলেন, ওয়াসার খাল আমরা পরিষ্কার করছি। খালের ওপর বহুতল ভবন। এগুলো ভাঙতে না পারলে স্থায়ী সমাধান হবে না। তবে আমাদের ডিএনসিসির জায়গার ওপর অবৈধ যা কিছুই থাকুক না কেন আমরা তা ভেঙে দেব।

সম্প্রতি কয়েক ঘণ্টার বৃষ্টিতে মিরপুরের কালশী এলাকার অধিকাংশ রাস্তা তলিয়ে যায়। ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে মেয়র সাংবাদিকদের বলেন, আমরা পরিষ্কার করা ছাড়া কিছুই করতে পারছি না। আমরা ওয়াসাকে বলেছি, ঢাকা জেলা প্রশাসককে বলেছি, দ্রুত ঘটনাস্থলে এসে খালের ওপর থেকে সব অবৈধ স্থাপনা ভেঙে দিন।

আতিকুল ইসলাম সাংবাদিক নিয়ে আবাসিক এলাকার সামনে থেকে খাল দেখে মদিনানগর এলাকা পর্যন্ত যান। সেখানে ৩০ ফুট খালের মধ্যে মাত্র দুই থেকে তিন ফুট জায়গা আছে। যা দিয়ে পুরো এলাকার পানি নেমে যেতে পারছে না।

এ ব্যাপারে মেয়র বলেন, এখানে বাইশটেক খাল, বাউনিয়া খাল রয়েছে। বাইশটেক খালটি মদিনা নগরে গিয়ে ৩০ ফুটের জায়গায় দুই ফুট হয়ে গেছে। খালের ওপরে সব ঘরবাড়ি। বহুতল ভবন হয়ে গেছে। আমরা যতটুকু পারি আমাদের যন্ত্র দিয়ে খালের ময়লা পরিষ্কার করে দেব। ডিএনসিসির অধীনে অবৈধ যা কিছু থাকবে আমি সবকিছু ভেঙে দেব।

তিনি বলেন, আগামী দুই মাসের মধ্যে বাইশটেক খালের (সাংবাদিক খাল নামেও পরিচিত) সঙ্গে পূর্ব দিক দিয়ে আরেকটি ড্রেন নিয়ে দক্ষিণে বাউনিয়াতে সংযুক্ত করে দেব।

খাল ওয়াসার হলেও ভরাট হওয়ার পর এর দায় নিতে চান না প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা। মেয়রের সঙ্গে ঘটনাস্থলে ওয়াসার ডিএমডি শহিদুল আলম বলেন, আমরা খনন করে দেবো। আমাদের প্রকল্পের টেন্ডার হয়ে গেছে। আগামী সপ্তাহে কাজ শুরু হয়ে যাবে। এর দায় কার জানতে চাইলে বলেন, বৃষ্টি হচ্ছে বলে এমন হয়েছে। আমরা খনন করে দেব, এরপর আর হবে না।

এ সময় উপস্থিত ছিলেন ডিএনসিসির প্রধান প্রকৌশলী ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মুহাম্মদ যুবায়ের সালেহীন, প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপক কমডোর আবদুর রাজ্জাক, অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী সৈয়দ কুদরত উল্লাহ, পাঁচ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর আবদুর রউফ নান্নু, সাত নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর মো. মোবাশ্বের চৌধুরী প্রমুখ।

 

"