এবার সত্যিকার বাণিজ্যিক রাজধানী হচ্ছে চট্টগ্রাম

প্রধানমন্ত্রীর উদ্যোগে কমিটি গঠন

প্রকাশ : ১১ এপ্রিল ২০১৯, ০০:০০

কাজী আবুল মনসুর, চট্টগ্রাম ব্যুরো

এ পর্যন্ত চট্টগ্রামকে বাণিজ্যিক রাজধানী বলা হতো শুধু মৌখিকভাবেই, দীর্ঘবছর ধরে বিষয়টি শুধু আলোচনাতেই ছিল। ‘বাণিজ্যিক রাজধানী’র মুলা ঝুলিয়ে রাখা হয়েছিল চট্টগ্রামবাসীর সামনে। এবার কার্যকরভাবে তার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর একান্ত ইচ্ছায় গঠন করা হয়েছে কমিটি। চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনার আবদুল মান্নানকে চেয়ারম্যান এবং চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ ইলিয়াস হোসেনকে সদস্য সচিব করে একটি কমিটি গঠন করেছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়। কমিটিতে চট্টগ্রামের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের শীর্ষস্থানীয় কর্মকতা ও ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতারা থাকবেন। এরই মধ্যে লাল ফিতায় আটকা অনেক প্রকল্পও আলোর মুখ দেখতে শুরু করেছে।

গত প্রায় ২০ বছর ধরে চট্টগ্রামকে বাণিজ্যিক রাজধানী করার বিষয়টি আলোচনায় ছিল। এ সময় বড় ধরনের কোনো প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়নি। এই নিয়ে ক্ষুব্ধতা রয়েছে চট্টগ্রামবাসীর মধ্যে। তবে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ক্ষমতা গ্রহণের পর যেভাবে চট্টগ্রামের উন্নয়নের জন্য একের পর এক প্রকল্প দিচ্ছেন তাতে আশাবাদী হয়ে উঠছে চট্টগ্রামের মানুষ। সর্বশেষ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় হতে কমিটি গঠনের পর আশাবাদী হয়ে উঠছেন তারা।

বিগত বিএনপি জোট সরকারের আমলে আশানুরূপ বিনিয়োগ হয়নি চট্টগ্রামে। চলে গেছে অনেক বহুজাতিক কোম্পানি। মূলত গ্যাস, বিদ্যুৎ ও প্রশাসনিকসহ অবকাঠামোগত নানা সুযোগ-সুবিধার অভাব রয়েছে, চট্টগ্রামের উন্নয়নের সাথে জড়িত বিভিন্ন সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (চউক), চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক), চট্টগ্রাম ওয়াসা, চট্টগ্রাম বন্দরসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের হাজার কোটি টাকার প্রকল্প

বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে দীর্ঘ বছরের পর বছর ধরে আটকে ছিল। ওইসব প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের বছরের পর বছর মন্ত্রণালয়ে ফাইল নিয়ে ঘুরাঘুরি করতে হয়েছে। বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সহায়ক নীতিমালা প্রণয়নের ফলে সত্তর দশকের শেষার্ধে ও আশির দশকে দেশে অনেক প্রতিশ্রুতিশীল শিল্পোদ্যোক্তার আবির্ভাব ঘটে। যারা মাঝারি আকারের অনেক রফতানিমুখী শিল্পোদ্যোগ গ্রহণ করে। দেশে রফতানিমুখী শিল্পোদ্যোগের নবজাগরণের এই ধারাবাহিকতায় চট্টগ্রামে স্থাপিত হয় দেশের একমাত্র রফতানি প্রক্রিয়াজাতকরণ অঞ্চল। আশির দশকের শেষভাগে ৪০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের চট্টগ্রাম ইউরিয়া সার কারখানা এবং নব্বই দশকের শুরুতে ৭০০ মিলিয়ন ডলারের কাফকো প্রজেক্ট স্থাপনের পর বিশ^ব্যাপী বিনিয়োগকারীদের দৃষ্টি পড়ে চট্টগ্রামের দিকে। চট্টগ্রামের পরিচিতি ঘটে দক্ষিণ ও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার উন্নত অঞ্চল হিসেবে। সাঙ্গুতে বিশাল সামুদ্রিক গ্যাস ফিল্ডের আবিষ্কারের ফলে বাংলাদেশের চট্টগ্রাম বিশে^র দরবারে অপার সম্ভাবনাময় অঞ্চল হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। চট্টগ্রাম শাহ আমানত বিমানবন্দরের উন্নয়নের পর আরো একধাপ এগিয়ে যায় চট্টগ্রাম।

১৯৪৭ সাল থেকেই চট্টগ্রাম বন্দর তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের প্রধানতম এবং ব্যস্ততম বন্দরে পরিণত হয়। পঞ্চাশের দশকে চট্টগ্রামে অনেক স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়। এর ধারাবাহিকতায় সাতটি নতুনসহ মোট ৯টি জেটি, বেশকিছু সংখ্যক পন্টুন ও মুরিং জেটি স্থাপন করা হয়। পাকিস্তান আমলে চট্টগ্রামে বৃহৎ ও মাঝারি আকারের কিছু স্টিল মিলস। সে সময় চট্টগ্রামে অনেক বড় আকারের জুট মিলস স্থাপিত হয় এবং প্রায় সব ব্যাংক ও বীমা কোম্পানির হেড অফিসও এখানে স্থানান্তরিত হয়। প্রধান আমদানি-রফতানি নিয়ন্ত্রক এবং জয়েন্ট স্টক কোম্পানির প্রধান কার্যালয়ও চট্টগ্রামে ছিল। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফ্লাইটও চট্টগ্রাম বিমানবন্দর থেকে চলাচল করত।

কিন্তু এক পর্যায়ে দেখা যায়, একে একে বন্ধ হয়ে যায় চট্টগ্রামের ভারী শিল্পগুলো। ছোট-বড় অন্তত দুই হাজার শিল্পকারখানা বন্ধ হয়ে যায়। সে সঙ্গে সরকারি-বেসরকারিসহ বিভিন্ন বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর প্রধান অফিসগুলোও একে একে চট্টগ্রাম থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়। প্রধান সদর দফতর হিসেবে রেলওয়ের প্রধান কার্যালয়, চা বোর্ড, বিপিসি, বিএসসিসহ কিছু প্রতিষ্ঠান থাকলেও এখন নিয়ন্ত্রিত হয় ঢাকা থেকে।

চট্টগ্রামের বিদ্যুৎ নিয়ে যাওয়া হতো গ্রিডলাইনে। চট্টগ্রামে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষমতা ৭২০ মেগাওয়াট। প্রয়োজন ৩৩০ মেগাওয়াট হলেও বর্তমানে বিদ্যুৎ মিলত ১০০ মেগাওয়াটেরও নিচে। চাহিদার তুলনায় দ্বিগুণ বিদ্যুৎ উৎপাদন হলেও চট্টগ্রামবাসী বিদ্যুতের আলো পাওয়া থেকে বঞ্চিত ছিল। চট্টগ্রাম ওয়াসায় গত ২২ বছরে একটি প্রকল্পও বাস্তবায়িত হয়নি। করপোরেশন থেকে প্রতি বছর শতকোটি টাকা চাওয়া হলেও, বরাদ্দ আসত মাত্র ১৫ থেকে ২০ কোটি টাকা। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে আটকা ছিল চউকের শত শত কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্প। স্থানীয় ব্যাংক কর্মকর্তাদের ঋণ অনুমোদনের ক্ষমতা খুবই সীমিত। ডলারের মূল্যমান বিবেচনায় স্থানীয় প্রধান ব্যাংক কর্মকর্তার ঋণ প্রদানের ক্ষমতা আগের মতোই।

প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব আবুল কালাম আজাদ গত শুক্রবার চট্টগ্রামের সার্কিট হাউসে এসে উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা ও সুশীল সমাজের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রীর উদ্যোগের কথা জানান। এদিকে এরই মধ্যে চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা নিরসনের লক্ষ্যে প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প, প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মীয়মান ৩ দশমিক ৪ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যরে বঙ্গবন্ধু টানেল ও ৩ হাজার ২৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে নগরীর লালখান বাজার থেকে বিমানবন্দর পর্যন্ত প্রায় ১৭ কিলোমিটার এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পের কাজও শুরু হয়েছে।

 

"