হালদায় যেকোনো সময় ডিম ছাড়বে মা-মাছ

প্রকাশ : ১০ এপ্রিল ২০১৯, ০০:০০

তাজুল ইসলাম পলাশ, চট্টগ্রাম

দক্ষিণ এশিয়ায় মাছের একমাত্র প্রাকৃতিক প্রজনন ক্ষেত্র হালদা নদী। প্রতি বছরের রেকর্ড অনুসারে এপ্রিলের মাঝামাঝি থেকে শেষের দিকে প্রাকৃতিকভাবে ডিম ছাড়ে মিঠা পানির কাতাল, রুই ও কার্পু জাতীয় মা মাছ। এখন ডিম ছাড়ার ভরা মৌসুম। প্রতি বছরের মতো এ বছরও আগে ভাগে প্রস্তুতি নিচ্ছে ডিম সংগ্রহকারীরা। এরই মধ্যে রেণু ফুটানোর জন্য তৈরি করা হয়েছে মাটির কুয়া। সংস্কার করা হয়েছে সরকারি দুইটি হ্যাচারির পাকা কুয়াও।

বিগত ৫ বছরের পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, এপ্রিলে হালদায় রুই জাতীয় মাছ প্রথম দফায় ডিম ছাড়ে। এরপর কোনো কোনো বছর জুনে দ্বিতীয় দফায় ডিম ছাড়ে মা মাছ। ২০১৮ সালে ২০ এপ্রিল, ২০১৭ সালে ২২ এপ্রিল, ২০১৫ সালে ২১ এপ্রিল প্রথম দফা, ১৩ জুন দ্বিতীয় দফা, ২০১৪ সালে ১৯ এপ্রিল, ২০১৩ সালে ৬ এপ্রিল এবং ২০১২ সালের এপ্রিলে মা মাছ হালদা নদীতে ডিম ছাড়ে। তবে ২০১৬ সালের এপ্রিলে হালদাতে তিন দফা নমুনা ছাড়লেও শেষ পর্যন্ত ডিম ছাড়েনি মা মাছ।

ডিম সংগ্রহকারীরা জানান, নদীর দুই পাড়ে আশপাশের এলাকার প্রায় সহ¯্রাধিক ডিম সংগ্রহকারী ডিম ধরার সরঞ্জাম নিয়ে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন। অমাবস্যা কিংবা পূর্ণিমায় মেঘের গর্জন, ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢল নামলেই ডিম দিতে পারে মা মাছ। এ সময় ডিম ধরা উৎসবে মেতে উঠবেন জেলেরা। তাদের মতে, নদীতে মা মাছের আনাগোনা বেড়েছে। ডিম সংগ্রহের জন্য তারা সম্পূর্ণ প্রস্তুত। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে চলতি এপ্রিল মাসের তৃতীয় সপ্তাহে হালদায় ডিম ছাড়তে পারে রুই জাতীয় (রুই, কাতলা, মৃগেল ও কালিবাউশ) মাছ।

এদিকে অভিযোগ উঠেছে নিষিদ্ধ থাকার পরও নদীতে অবাধে চলাচল করছে যান্ত্রিক নৌযান। রাতের আঁধারে জাল ও বড়শি ফেলে নদী থেকে মাছ মারা হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেছে স্থানীয়রা। না জানার শর্তে নদীর পাড়ে বসবাসরত কয়েকজনের সঙ্গে কথা হলে তারা জানান, পাথর ও মাটিবাহী যান্ত্রিক নৌযান অবাধে চলাচল করছে। সংযুক্ত খাল পাড়ে স্তূপ করে রাখা হয়েছে ছোট বড় জাল। গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে হাটহাজারী উপজেলার খলিফার ঘোনা এলাকায় হালদা নদীতে ৮ কেজি ওজনের একটি মৃগেল মাছ ভেসে উঠে।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক মনজুরুল কিবরিয়া বলেন, বোটের ইঞ্জিনের আঘাতে রাতের কোনো এক সময় মা মাছটি মারা যায়।

এদিকে ‘মা মাছ’ হত্যার দায়ে মঙ্গলবার আবদুল আজিজ নামের ব্যক্তিকে ১০ দিনের কারাদন্ড দিয়েছে ভ্রাম্যমাণ আদালত। এরপর তাকে কারাগারে নেওয়া হয়। আবদুল আজিজের বাড়ি চট্টগ্রামের কর্ণফুলী উপজেলার শিকলবাহা গ্রামে। তার বাবার নাম আবদুল মান্নান।

মনজুরল কিবরিয়া বলেন, আর দেরি না করে হালদাকে পরিবেশগতভাবে বিপদাপন্ন এলাকা বা ইকোলজিক্যালি ক্রিটিকাল এরিয়া (ইসিএ) ঘোষণা করে এটা রক্ষণাবেক্ষণের বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন। না হলে একসময় হালদা নদী থেকে সব মাছ বিলুপ্ত হয়ে যাবে। ইউনেসকোর বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় হালদার অন্তর্ভুক্তির পদক্ষেপগুলোও আমাদের এগিয়ে নেওয়া উচিত।

এপ্রিল মাসে ডিম ছাড়ার বিষয়ে জানতে চাইলে মনজুরুল কিবরিয়া বলেন, মূলত এপ্রিলের শেষের দিকে মা মাছগুলো ডিম ছাড়ে। গত বছরগুলো পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, এপ্রিল মাসে ডিম ছাড়ে মা মাছ। অমাবস্যা কিংবা পূর্ণিমায় মেঘের গর্জন ভারী বর্ষণ হলে ডিম ছাড়ে। কয়েক দিন ধরে আবহাওয়া তাই বলছে।

সরকারি হ্যাচারি সংস্কার প্রসঙ্গে হাটহাজারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মাদ রুহুল আমিন বলেন, ‘এরই মধ্যে হাটহাজারীর মাদার্শা মাদারীপুল হ্যাচারির ৩০টি এবং মাছুয়াঘোনা হ্যাচারির ১৫টি পাকা কুয়া সংস্কার করা হয়েছে। সময় পাওয়া গেলে মাছুয়াঘোনা হ্যাচারির আরো ৭টি হ্যাচারি সংস্কার করা হবে। তাছাড়া মদুনাঘাট, মাদারীপুল ও মাছুয়াঘোনা হ্যাচারিতে বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়া হয়েছে।

প্রসঙ্গত, বিশ্বের একমাত্র জোয়ার-ভাটার নদী হালদা। যেখান থেকে রুই জাতীয় মাছের সরাসরি নিষিক্ত ডিম সংগ্রহ করা হয়। রাউজান-হাটহাজারী উপজেলা সীমানা দিয়ে বয়ে যাওয়া হালদা নদীতে স্মরণাতীত কাল থেকে প্রতি বছর বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ মাসে ডিম ছাড়ে মা মাছ। হ্যাচারি পোনার চেয়ে হালদার পোনা দ্রুতবর্ধনশীল বলে এ পোনার কদর সারা দেশে। ডিম সংগ্রহকারীরা নদী থেকে ডিম সংগ্রহ করে তা থেকে রেণু ফুটিয়ে বিক্রি করে তারা। রেণুর আয় দিয়ে পুরো বছর জীবিকা নির্বাহ করে আহরণকারীরা।

 

"