দখল, ভরাট ও দূষণে মৃতপ্রায় সুরমা নদী

প্রকাশ : ২৫ মার্চ ২০১৯, ০০:০০

মুহাজিরুল ইসলাম রাহাত, সিলেট

দখল, ভরাট ও দূষণে অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে দেশের দীর্ঘতম সিলেটের সুরমা নদী। যৌবন হারিয়ে সুরমা এখন অনেকটা মরা খালে পরিণত হয়েছে। কোথাও কোথাও এমনভাবে দখল করা হয়েছে যে সেখানে নদীর অস্তিত্বই নেই। এছাড়া নদীর বুকে জেগে উঠেছে অসংখ্য চর। বাধাগ্রস্ত হচ্ছে স্বাভাবিক প্রবাহ। গ্রীষ্মে পানিশূন্য হয়ে পড়ে, আর বর্ষায় দুই কূল ছাপিয়ে প্লাবিত হয় তীরবর্তী এলাকা। পরিবেশবিদরা বলছেন, সুরমাকে নদী ব্যবস্থাপনার আওতায় আনা জরুরি। নদীতে আবর্জনা ফেলা ও নদী দখল বন্ধ করতে হবে। নজরদারি ও জনসচেতনতা বাড়াতে হবে। এসব ব্যবস্থা না নিলে অচিরেই সুরমা নদীর অপমৃত্যু ঘটবে।

সরেজমিনে দেখা যায়, ময়লা-আবর্জনায় ঢেকে দেওয়া হয়েছে নদীর দুই পাড়। নদীর কিছু অংশ ভরাট করছেন কেউ। কেউবা আবার নদীর বুক থেকে বালু তুলছেন। কিছু জায়গায় আবার তীর থেকে নদীর ভেতরে ইট-বালি-সিমেন্টের মিশ্রণে

নির্মাণ করছে দালান। যেন নদী দখলের মহোৎসব চলছে। মাছিমপুর, কালীঘাট, তোপখানা, কাজিরবাজার, চাঁদনীঘাট, কদমতলী, ফেরিঘাট এলাকা ঘুরে নদীর পাড় দখলের এসব চিত্র দেখা যায়।

জানা যায়, নানা কৌশলে দখল চলে। প্রথমে বাজারের সব ময়লা, আবর্জনা নদী পাড়ে স্তূপাকারে রাখা হয়। পরে ওই আবর্জনার জায়গা বাঁশ দিয়ে শক্তভাবে ঘেরাও করে মাটি, ইটের সুড়কি দিয়ে স্থায়ীভাবে ভরাট করা হয়। পরে সুবিধামতো সময়ে গড়ে তোলা হয় দালান। এছাড়া আবর্জনার পাশাপাশি নদী পাড়ের কলোনির পয়ঃনিষ্কাশনের বর্জ্যও ফেলা হয় নদীতে। স্থানীয়রা বলছেন, নদী দখলের এ প্রক্রিয়া চলছে দীর্ঘদিন ধরে। প্রশাসনের কাছে বারবার অভিযোগ করেও কোনো কাজ হচ্ছে না।

নগরের বাণিজ্যিক এলাকা হিসেবে খ্যাত কালীঘাট অংশটির অবস্থা সবচেয়ে ভয়াবহ। জেলার ১৩টি উপজেলার পাইকারি বাজার বসে এই কালীঘাটে। এখান থেকে কয়েক টন বর্জ্য প্রতিদিনই ফেলা হয় সুরমায়। কালীঘাটের ঠিক ওপাড়ে চাঁদনীঘাট এলাকায় গড়ে উঠেছে সিলেটের গাড়িভাঙা শিল্প। এখানে প্রতিদিনই ভাঙা হয় একাধিক পুরনো গাড়ি। অপ্রয়োজনীয় লোহা-লক্কড় ফেলা হয় সুরমা নদীতে। পরিবেশ অধিদফতর ও সিটি করপোরেশনের কোনো তদারকি নেই।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) সূত্রে জানা গেছে, সুরমা দেশের দীর্ঘতম নদী। এর দৈর্ঘ্য ৩৯৯ কিলোমিটার। সুরমা হবিগঞ্জে গিয়ে কালনি নাম ধারণ করে। এই কালনি পুনরায় ভৈরবের কাছে গিয়ে মেঘনা নাম ধারণ করে বঙ্গোপসাগরে মিশেছে। এক সময় বরাক থেকে আসা পানির ৪০ শতাংশ সুরমা নদী দিয়ে প্রবাহিত হতো। কিন্তু উৎসস্থল জকিগঞ্জের অমলসিদ থেকে প্রায় ৩৩ কিলোমিটার পর্যন্ত বিভিন্ন স্থানে চর জেগে উঠায় বাধাগ্রস্ত হচ্ছে স্বাভাবিক প্রবাহ। ফলে ২০ শতাংশ পানি নিয়ে সুরমা অনেকটা মরা নদী।

শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সিভিল অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ কর্তৃক এক গবেষণা করা হয়েছে। গবেষণায় চারটি স্থান থেকে পানি সংগ্রহ করে পরীক্ষা করা হয়। স্থানগুলো হলো নগরের মাসিমপুর (উজানে), কালীঘাট, তোপখানা এবং কানিশাইল (ভাটিতে)। গবেষণার ফলে দেখা যায়, বর্ষাকালে সুরমা নদীর পানিতে বিওডির পরিমাণ পর্যাপ্ত থাকলেও শীতকালে কিছু কিছু জায়গায় গ্রহণযোগ্য মাত্রার চেয়ে কমে যায়। পানি দূষণের অন্যতম ধ্রুবক বিওডি-পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, শীতকালে সুরমা নদীতে দূষণের মাত্রাটা বেশি। বিওডি-এর মানও গ্রহণযোগ্য মাত্রার চেয়ে বেশি। কলিফর্ম বিশ্লেষণের দিক থেকে দেখা যায়, সুরমা নদীর পানিতে উল্লেখযোগ্য মাত্রায় ফেসাল কলিফর্ম আছে, যা পরিবেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, আকস্মিক বন্যা এবং নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বজায় রাখতে নদী খনন কার্যক্রম জোরদার করতে হবে। নদীর তীর সংরক্ষণের ব্যবস্থা নিতে হবে। অবৈধ দখল শক্ত হাতে প্রতিহত করতে হবে। নিয়মিত নদীর গুণগতমান পরীক্ষা করার পদক্ষেপ নিতে হবে। বিভিন্ন নৌযান থেকে পানিকে দূষিত করে এমন পদার্থ এবং তেল নিঃসৃত হচ্ছে কি না সে ব্যাপারে কর্তৃপক্ষের নজরদারি বাড়াতে হবে। তবেই সুরমাকে বাঁচানো সম্ভব হবে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাওবো) সিলেটের এক কর্মকর্তা জানান, অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ করা সম্ভব নয়। এটা জেলা প্রশাসনের কাজ। এ ব্যাপারে সিলেট সিটি করপোরেশনের মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, নানা অব্যবস্থাপনায় সুরমা দূষিত হচ্ছে। অনেকেই সুরমায় বর্জ্য ফেলছেন। আমরা নগরীকে আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার আওতায় নিয়ে এসেছি। নগরীর তিনটি স্থানে অত্যাধুনিক ডাস্ট সাবস্টেশন তৈরি করা হয়েছে। এরপরও নদীতে বর্জ্য ফেলা হচ্ছে যা অত্যন্ত দুঃখজনক।

পরিবেশ অধিদফতরের সিলেট বিভাগীয় পরিচালক মো. সালাহ উদ্দিন চৌধুরী প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, ‘নদীদূষণের এমন তথ্য আমাদের নজরে আছে। নদীতে বর্জ্য ফেলে নদীর ভারসাম্য নষ্ঠ করা হচ্ছে। প্রবাহে বাধা প্রদান করা হাচ্ছ এটা খবুই দুঃখজনক। তিনি এ ব্যাপারে সিলেট সিটি করপোরেশনের উদাসীনতাকে দায়ী করে বলেন, তারা চাইলে নদীতে আবর্জনা ফেললে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে পারত।’ কিন্তু তারা কার্যত কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছেন না।

 

"