সড়কে ক্ষতির হিসাবে জীবনের মূল্য কত?

প্রকাশ : ২১ মার্চ ২০১৯, ০০:০০

প্রতিদিনের সংবাদ ডেস্ক

সড়ক দুর্ঘটনায় যেসব জীবন ঝরে যায়, তাদের জীবনের আসলে মূল্য কত? অথবা সারা জীবনের জন্য পঙ্গুত্ব বরণ করে যারা বেঁচে থাকেন, তাদের এই ভোগান্তির আর্থিক মূল্যইবা কত? এছাড়া সড়ক দুর্ঘটনায় মোট কত টাকার ক্ষতি হয়? এর হিসাব বের করা হয়েছে এক সরকারি জরিপে।

সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের সড়ক ও মহাসড়ক অধিদফতর ২০১৬-১৭ সালের এক জরিপে দুর্ঘটনার শিকার হওয়া কোনো কর্মক্ষম ব্যক্তির অর্থনৈতিক ক্ষতি, চিকিৎসার খরচ, জীবনের মূল্য, গাড়ির ক্ষতি এবং প্রশাসনিক ও অন্যান্য সব হিসাব থেকে এই চিত্র তুলে ধরেছে। সেখানে বলা হয়েছে, সড়ক দুর্ঘটনায় একজনের মৃত্যু হলে গড় ক্ষতির পরিমাণ ৪৯ লাখ ৮৯ হাজার টাকা। মারাত্মক দুর্ঘটনায় ক্ষতির পরিমাণ জনপ্রতি ২ লাখ ৩৮ হাজার টাকা। আর সাধারণ দুর্ঘটনায় ক্ষতির পরিমাণ ১ লাখ ১৪ হাজার টাকা।

তবে এ হিসাবের মধ্যে দুর্ঘটনার শিকার হওয়া ব্যক্তির পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের অর্থনৈতিক চাপ, কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনার শিকার ব্যক্তির শূন্যস্থান পূরণ ও সম্পর্কিত প্রশিক্ষণ, দুর্ঘটনার ফলে রাস্তায় নষ্ট হওয়া অতিরিক্ত সময়, সড়ক দুর্ঘটনার ফলে গড় আয়ু কমার অর্থনৈতিক ক্ষতি ইত্যাদি বিষয়গুলো হিসাব করা হয়নি বলে জরিপে বলা হচ্ছে। পুলিশের রেকর্ডে থাকা জাতীয় সড়ক পরিবহন দুর্ঘটনা রিপোর্ট ২০১৪-এর ওপর ভিত্তি করে শহর ও গ্রাম থেকে ১ হাজার ৫৫৮ জন হতাহতকে নমুনা হিসেবে নিয়ে এই তথ্য বের করেছে সড়ক ও মহাসড়ক অধিদফতরের এই জরিপ।

কর্মক্ষম ব্যক্তির অর্থনৈতিক ক্ষতি

সরকারি ওই গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, সড়ক দুর্ঘটনায় একটি কর্মক্ষম ব্যক্তির প্রাণ হারানোর ফলে অর্থনৈতিকভাবে গড় ক্ষতির পরিমাণ ২৪ লাখ ৬২ হাজার ১০৬ টাকা।

আর মারাত্মকভাবে আহত হলে সেক্ষেত্রে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়ায় গড়ে ২০ হাজার ৯৭৭ টাকা। তবে সাধারণ দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে তা মাত্র ১ হাজার ৫৯৮ টাকা।

সূূত্র : সড়ক ও মহাসড়ক অধিদফতর

গবেষণা রিপোর্ট অনুযায়ী, সড়ক দুর্ঘটনার শিকার কোনো ব্যক্তির যে উৎপাদন ক্ষমতা, তার আর্থিক মূল্যের হিসাব করে এটি পাওয়া গেছে।

অধিকাংশ দুর্ঘটনার বিশ্লেষণে দুর্ঘটনার শিকার হওয়া ব্যক্তিদের ওপর জরিপ করে অথবা তাদের গড় বেতন হিসেব করে এই ক্ষতি নিরূপণ করা হয়। তবে মোটরযান ব্যবহারকারীদের ক্ষেত্রে গড় আয় নিরূপণ করা হয়েছে বাংলাদেশ রোড রিসার্চ ল্যাবরেটরির (বিআরআরএল) ট্রাভেল টাইম কস্ট (টিটিসি) জরিপের ওপর ভিত্তি করে।

শুধুমাত্র পথচারীদের গড় আয় ধরা হয়েছে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (২০১৫-১৬) তথ্য অনুযায়ী, মাথাপিছু আয় ৯ হাজার ৫৫০ টাকা হিসাব করে।

গবেষক দল বলছে, নমুনা থেকে দুর্ঘটনায় হতাহতদের গড় বয়স বের করেছেন যাতে সারা জীবনে তাদের গড় আয় কত হতে পারেÑ সেটির ধারণা পাওয়া যায়। সেখান থেকে দুর্ঘটনার জন্য যত বছর নষ্ট হলো, তার ভিত্তিতে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ বের করা হয়েছে। অন্যদিকে আহতদের ক্ষেত্রে দুর্ঘটনার পর যতদিন কোনো ব্যক্তিকে কাজ থেকে দূরে থাকতে হয়, তার সঙ্গে তার দৈনিক আয়কে গুণ করে ওই কয়েক দিনের আর্থিক ক্ষতির হিসাব বের করা হয়েছে।

২০১৬-১৭ সালের ওই জরিপে দেখা যায়, উদ্ধার ও পরিবহন বাবদ প্রত্যেক সড়ক দুর্ঘটনার শিকার ব্যক্তির জন্য গড়ে ১ হাজার ৪০০ টাকা ব্যয় হয়। অন্যদিকে হাসপাতালের খরচ বের করা বেশ কঠিন বলে মনে করা হয়। কারণ মারাত্মক আহতদের ক্ষেত্রে, হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীদের ক্ষেত্রে ১০ দিন এবং হাসপাতালে ভর্তি না হয়ে চিকিৎসা নেওয়া রোগীদের ক্ষেত্রে দুই দিন হিসাব করা হয়। এ হিসাবে একটি সাধারণ দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে একজন ব্যক্তির প্রায় ১ হাজার ৬০০ টাকা খরচ হয়, আর মারাত্মক দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে খরচ প্রায় ১০ হাজার টাকা।

মানবিক মূল্য কত?

১৯৮০-এর দশকে ভারতে রোড ইউজার কস্ট গবেষণার ক্ষেত্রে, দুর্ঘটনার ফলে পেইন, গ্রিফ অ্যান্ড সাফারিংস (পিজিএফ) ধরা হয়েছিল মোট অর্থনৈতিক ক্ষতির ২০ শতাংশ হিসেব করে। ভারতে পরবর্তী গবেষণাগুলোতে এবং ১৯৯৫ সালে নেপালেও পিজিএফ একইভাবে হিসাব করা হয়েছিল।

সেই হিসেবে প্রাণঘাতী দুর্ঘটনার শিকার জীবনের মানবিক মূল্য বা পিজিএফ গড়ে প্রায় ১৫ লাখ টাকা। আর মারাত্মক দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে তা ১২ হাজার টাকার মতো এবং সামান্য আহতদের জন্য তা ৯৭০ টাকার মতো।

সরকারের এই গবেষণায়, যেসব দুর্ঘটনার পর আহতদের প্রাথমিক চিকিৎসা ছাড়া হাসপাতালে ভর্তি হতে হয় না, সেগুলোকে ‘সাধারণ দুর্ঘটনা’ বলা হচ্ছে।

অন্যদিকে ‘মারাত্মক দুর্ঘটনা’ শব্দটি এমন ধরনের আহতের ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়েছে, যেখানে রোগীকে রাতারাতি হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছিল। এমনকি দুর্ঘটনার পর ৩০ দিনের মধ্যে মারা যাওয়ারও আশঙ্কা থাকে। তবে দুর্ঘটনার দিন থেকে ৩০ দিনের মধ্যে মারা গেলে তাকে নিহত বলে ধরা হয়েছে গবেষণাটিতে। সূত্র : বিবিসি বাংলা

 

"