এআরআইর গবেষণা

সড়ক দুর্ঘটনায় দায়ী বেপরোয়া বাসচালক

প্রকাশ : ২১ মার্চ ২০১৯, ০০:০০

নিজস্ব প্রতিবেদক

ঢাকায় অধিকাংশ সড়ক দুর্ঘটনা বাসের কারণে ঘটছে বলে তথ্য ওঠে এসেছে বুয়েটের দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের (এআরআই) গবেষণায়। ঢাকায় সাম্প্রতিক আলোচিত সড়ক দুর্ঘটনাগুলোর সবক’টিতেই বাসের বেপরোয়া চালনাকে দায়ী করা করেছে এআরআই। সর্বশেষ গত মঙ্গলবার নদ্দা এলাকায় বাসচাপায় বেসরকারি ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসের শিক্ষার্থী আবরার আহমেদ চৌধুরী নিহত হন।

রাজধানীতে আলোচিত বেশির ভাগ দুর্ঘটনায় বাসের জড়িত থাকার অভিযোগ আছে। গত বছরের ৩ এপ্রিল কারওয়ানবাজারে দুই বাসের রেষারেষিতে পড়ে হাত বিচ্ছিন্ন হয় তিতুমীর কলেজের ছাত্র রাজিব হোসেনের। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৬ এপ্রিল মারা যান রাজিব। ২০ এপ্রিল রাতে বনানীতে রাস্তা পার হওয়ার সময় বিআরটিসির একটি বাসের চাপায় ২১ বছর বয়সি তরুণী রোজিনার ডান পা বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২৯ এপ্রিল মারা যান রোজিনা। গত বছর বাসচাপায় শহীদ রমিজ উদ্দিন ক্যান্টমেন্ট কলেজের দুই শিক্ষার্থী নিহত হওয়ার পর নিরাপদ সড়কের আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছিল দেশের বিভিন্ন স্থানে। গত বছর বাসচাপায় শহীদ রমিজ উদ্দিন ক্যান্টমেন্ট কলেজের দুই শিক্ষার্থী নিহত হওয়ার পর নিরাপদ সড়কের আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছিল দেশের বিভিন্ন স্থানে। পরে রাজধানীর অন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরাও রাস্তায় নেমে আসে। নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে সারা দেশেই। ওই সময় সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানিতে সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদন্ড ও অর্থদন্ডের বিধান রেখে তড়িঘড়ি করে সড়ক পরিবহন আইনের খসড়া চূড়ান্ত অনুমোদন দেয় সরকার। তবে তাতেও সড়কে থামেনি মৃত্যুর মিছিল।

গত বছর ডিসেম্বরে গুলশানের শাহজাদপুরে বাসচাপায় স্কুলছাত্রী, বিজয় সরণিতে বাসের ধাক্কায় অটোরিকশা আরোহী এক তরুণ, অক্টোবরে দুই বাসের মধ্যে চাপা পড়ে এক তরুণ, এরও আগে সেপ্টেম্বরে বাসের চাপায় একাত্তর টেলিভিশনের কর্মকর্তা আনোয়ার হোসেনের মৃত্যু হয়। বুয়েটের এআরআই জানাচ্ছে, ২০১৬ সালের মার্চ থেকে ২০১৮ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ৬৬৬টি দুর্ঘটনায় ৬৯৯ জন নিহত এবং ১ হাজার ২২৭ জন আহত হয়েছেন। এর মধ্যে ৩৫৪টি দুর্ঘটনাই বাসের কারণে ঘটেছে। এছাড়া ১৩০টি মোটরসাইকেল, ১১৩টি ট্রাক, ৭৩টি পিকআপ এবং ৫৬টি ব্যক্তিগত গাড়ি দুর্ঘটনা ঘটিয়েছে। আর ঢাকায় ২৮০টি সড়ক দুর্ঘটনায় ২৮৬ জন নিহত হন। আহত হয়েছিল ৫৩২ জন। সে বছর ১৩৪টি দুর্ঘটনার কারণ বাস।

বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত দুর্ঘটনার সংবাদ পর্যালোচনা করে এসব তথ্য পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছেন বুয়েটের সহকারী অধ্যাপক কাজী সাইফুন নেওয়াজ।

ঢাকার গণপরিবহন ব্যবস্থায় বিশৃঙ্খলার কারণেই বেশির ভাগ দুর্ঘটনায় বাস জড়িয়ে যাচ্ছে বলে জানান তিনি। তিনি বলেন, এসব যানের অনিয়ন্ত্রিত চলাচল দুর্ঘটনার জন্য দায়ী। ঢাকা শহরে বাসের সিস্টেমটা একটু বিশৃঙ্খল। বাসের চালকরা অনিয়ন্ত্রিত, বেপরোয়া চলাচল করেন বেশি। যাত্রীর জন্য ঝুঁকিপূর্ণভাবে বাস চালান তারা। তাদের মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ আচরণগুলো বেশি হয়। ঢাকায় দুর্ঘটনা ঘটানোর ক্ষেত্রে বাসের পরই রয়েছে ট্রাক ও মোটরসাইকেল।

গত বছর দুই বাসের চাপায় হাত হারিয়ে না ফেরার দেশে তিতুমীর কলেজের ছাত্র রাজীব হোসেন। গতবছর দুই বাসের চাপায় হাত হারিয়ে না ফেরার দেশে তিতুমীর কলেজের ছাত্র রাজীব হোসেন অদক্ষ চালকদের মধ্যে যাত্রী নেওয়ার প্রতিযোগিতা ঢাকায় দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ বলে মনে করেন ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক খন্দকার এনায়েত উল্লাহ।

তিনি বলেন, ঢাকার নানা কোম্পানির নামে চলাচলকারী বাসগুলো বিভিন্ন মালিকের। এজন্য তারা প্রতিযোগিতা করেন। তারা একটি কোম্পানির নাম নিয়ে চলে। দৈনিক চুক্তিতে চলাচলের কারণে এগুলো প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়। যে কারণে দুর্ঘটনা বেশি হয়। আমাদের কাউন্টার সিস্টেম নেই, ফলে দিন শেষে চালক যে টাকা দিত মালিককে তাতেই সন্তুষ্ট থাকতে হতো। ফলে মালিকরা চালকদের সঙ্গে চুক্তিতে চলে গেছেন। এ কারণে চালকরা বেশি আয়ের আশায় প্রতিযোগিতা করে। দুর্ঘটনার দ্বিতীয় কারণ হিসেবে চালকের অদক্ষতার কথা বলেন তিনি। ঢাকা শহরে বেশির ভাগ চালকই পাকা লাইসেন্সধারী না, অনভিজ্ঞ। তারা লেগুনা, পিকআপসহ হালকা যানবাহনের চালক। ভারী লাইসেন্সধারী চালকরা ঢাকায় গাড়ি চালাতে আসে না। ফলে দক্ষ চালকের অভাবে মালিকরা তাদের (অদক্ষ) হাতে গাড়ি তুলে দিচ্ছে। ফলে দুর্ঘটনা ঘটছে। নানা চেষ্টা করেও এই প্রবণতারোধ করা যায়নি বলে স্বীকার করেন এই পরিবহন ব্যবসায়ী।

 

"