শাহজালালে তৃতীয় টার্মিনাল নির্মাণ

দরপত্রের শর্ত নিয়ে শুরুতেই জটিলতা

* ঋণ দেওয়া প্রতিষ্ঠানের পরামর্শেই সব হচ্ছে * ১৪ বছর আগের পুরোনো শর্তজুড়ে দেওয়ার অভিযোগ * বঞ্চিত হচ্ছে নামিদামি অনেক প্রতিষ্ঠান

প্রকাশ : ১৫ মার্চ ২০১৯, ০০:০০

গাজী শাহনেওয়াজ

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সক্ষমতা বাড়াতে ও আরো আধুনিকায়নের জন্য ৩য় টার্মিনাল নির্মাণ প্রকল্পে দরপত্র আহ্বান নিয়ে দ্বন্দ্ব, অস্বচ্ছতা ও জটিলতা তৈরি হয়েছে। আগামী ১৯ মার্চ দরপত্র উন্মুক্ত হবে। দরপত্রে প্রকল্প কর্তৃপক্ষের শর্তে বিশ্বের অনেক খ্যাতনামা প্রতিষ্ঠান অংশ নিতে পারছে না বলে জানা গেছে। কেন, কি স্বার্থে এবং কোন উদ্দেশে দরপত্রে এসব শর্তজুড়ে দেওয়া হলো তা নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়ে গেছে সরকারের কেন্দ্রীয় ক্রয়সংক্রান্ত টেকনিক্যাল ইউনিট (সিপিটিইউ)। সিপিটিইউ এসব শর্তে আপত্তি জানিয়ে বেবিচককে পত্র দিয়েছে।

সূত্র বলছে, দরপত্রে আচমকাজুড়ে দেওয়া শর্তের সুষ্ঠু সমাধানে চিঠি চালাচালি হয়েছে। চিঠির পর্যবেক্ষণে সিপিটিইউ বলেছে, সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত বিধিমালা এবং আন্তর্জাতিক দরপত্র সংক্রান্ত গাইডলাইন লঙ্ঘন করে নানা শর্তজুড়ে দেওয়া হয়েছে, যা অনিয়ম। এর ফলে বিমানবন্দর নির্মাণে বিশ্বে শীর্ষে অবস্থান করা কোম্পানিগুলোর দরপত্রে অংশ নেওয়ার সুযোগ সংকুচিত হয়ে পড়ছে।

এ ইস্যুতে বেবিচক বলছে, তারা পর্যবেক্ষণ প্রতিষ্ঠানের পত্রের জবাব দিয়েছে। অথচ সিপিটিইউ বলছে, তারা এখনো চিঠির জবাব পায়নি। তবে দরপত্রের শর্তের বিষয়ে প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও বেবিচক বলছে, জাপানের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা (জাইকা) এই প্রকল্পে মোটা অংকের বিনিয়োগ করবে। সংস্থাটির চাহিদা অনুযায়ী প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা দরপত্র আহ্বান করেছে। সেখানে সংশ্লিষ্ট দেশটির বড় বড় প্রতিষ্ঠানের কেউ শর্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলেনি। অথচ জাপানের বাইরের কয়েকটি দেশ এ দরপত্রের শর্ত নিয়ে ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের অপচেষ্টা করছে। জানা গেছে, শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ৩য় প্রকল্পের সম্প্রসারণ কাজ সম্পন্ন করতে দরকার হবে ১৩ হাজার ৬১৫ কোটি ৪৩ লাখ টাকা। এই অর্থের সিংহ ভাগই আসবে ঋণের মাধ্যমে। যার মধ্যে ১১ হাজার ২১৫ কোটি ৮০ লাখ টাকা আসবে জাইকার ঋণ থেকে। বাকি টাকার জোগান দেবে সরকার। প্রকল্পটির তত্ত্বাবধানে রয়েছে বেবিচক।

জানতে চাইলে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল এম নাইম হাসান বলেন, দরপত্রে যে অনিয়মের কথা উল্লেখ করে ক্রয়সংক্রান্ত টেকনিক্যাল কমিটির পত্রের জবাব দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, সিপিটিইউর পর্যবেক্ষণের সঙ্গে আমরা একমত নই। কারণ বিনিয়োগ করা প্রতিষ্ঠানের চাহিদা অনুযায়ী দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। কোনো দেশ থেকে ঋণ নিলে পিপিআর ২০১০ আর কাজ করে না। তখন যে দেশ থেকে ঋণ নেওয়া হচ্ছে, তাদের মানসিকতা বেশি বিবেচনা করতে হয়।

এই প্রকল্পে বিনিয়োগ করা জাইকার চাওয়াটাকে তো প্রাধান্য দিতে হবে। কারণ মোট ব্যয়ের বেশির ভাগ অর্থই তারা দিচ্ছেন যা ঋণ হিসেবে গ্রহণ করা হচ্ছে। কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান বলেন, আপনি ঋণ নিয়ে বাড়ি করবেন তাদের শর্তটি তো আপনাকে মানতে হবে। কারণ ওভাবেই তো আপনি লোনে রাজি হয়েছেন; এক্ষেত্রেও তাই হয়েছে।

দরপত্রে কোনো অনিয়ন হয়েছে কি না জানতে চাইলে এম নাইম হাসান বলেন, এখানে অনিয়মের সুযোগ নেই। আমাদের ও জাইকার পরামর্শক রয়েছে, তাদের নির্দেশনা অনুযায়ী এটা হচ্ছে। তিনি বলেন, বড় বড় কোনো কোম্পানি কোনো অভিযোগ দেয়নি। এ রকম প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে মিসসুবিসি ও ওজিসহ অনেক প্রতিষ্ঠান।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, তৃতীয় টার্মিনাল নির্মাণে প্রকল্প কাজ শেষ হলে এ বিমানবন্দরে প্রায় ২ কোটি যাত্রীর সেবা সক্ষমতা নিশ্চিত হবে। নিরাপত্তা ও অন্যান্য সেবার অবকাঠামো শীর্ষ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর পর্যায়ে উন্নীত করাও সম্ভব হবে। যার আয়তন হবে প্রায় ২ লাখ ২৬ হাজার বর্গমিটার। এছাড়া বর্ধিতাংশে ৯৮ হাজার ৫০০ বর্গমিটারের ‘উড়োজাহাজ পার্কিং অ্যাপ্রোন’ এলাকা, ৬৬ হাজার ৫০০ বর্গমিটারের ট্যাক্সিওয়ে এবং ৬২ হাজার বর্গমিটারের কার পার্কিং এলাকা থাকবে। এর বাইরে থাকবে ৫ হাজার ৯০ বর্গমিটারের ভিভিআইপি কমপ্লেক্স এবং ১ হাজার ৮২০ বর্গমিটারের রেসকিউ এবং ফায়ার ফাইটিং সুবিধা। চলতি বছরের জুনে শুরু করে ২০২২ সালের মধ্যে এ প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। প্রকল্পের দরপত্র খোলা হবে ১৯ মার্চ।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, জুড়ে দেওয়া শর্তে নামিদামি বিশ্বের অনেক প্রতিষ্ঠান দরপত্রই কিনতে পারেনি। সংক্ষুব্ধ একটি প্রতিষ্ঠান হচ্ছে তুরস্কের নির্মাণ প্রতিষ্ঠান গ্যাপ-ইনসাত। প্রতিষ্ঠানটির দোহা, আবুধাবি, দুবাই, ইস্তাম্বুল, রিয়াদ এবং আমস্টারডামের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর নির্মাণের অভিজ্ঞতা রয়েছে।

দরপত্রের শর্তে আপত্তি জানিয়ে সিপিটিইউর কাছে লিখিতভাবে অভিযোগ তুলে ধরা হয়। সিপিটিইউ অভিযোগ খতিয়ে অনিয়ম পায় এবং তাদের আপত্তি প্রকল্প কর্তৃপক্ষকে জানায়। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৮ অক্টোবর সিপিটিইউ থেকে বেবিচককে পাঠানো চিঠিতে বলা হয়, কোনো পূর্বশর্ত দিয়ে দরপত্র বিক্রি করা বিধিসম্মত নয়। দরপত্রের কয়েকটি শর্ত আন্তর্জাতিক দরপত্র নীতিমালা এবং সরকারি ক্রমবিধির সঙ্গেও সঙ্গতিপূর্ণ নয়। এ কারণে এসব শর্ত সংশোধনের জন্য বলা হয়। সিপিটিইউ থেকে এ চিঠি পাওয়ার পর গ্যাপ-ইনসাতের কাছে দরপত্র বিক্রি করে বেবিচক। তবে শর্ত শিথিল না করায় গত ৩১ জানুয়ারি আবারও বেবিচকের কাছে একটি চিঠি পাঠায় সিপিটিইউ। চিঠিতে সুনির্দিষ্টভাবে এই পর্যবেক্ষণ তুলে ধরা হয়, এর আগে যেসব অপ্রয়োজনীয় শর্ত পরিবর্তনের জন্য বলা হয়েছিল, দরপত্রের সঙ্গে সেগুলো এখনো থেকে গেছে। চিঠিতে এসব শর্ত আবারও সংশোধন করার আহ্বান জানিয়ে বলা হয়, যেকোনো প্রকল্পের দরপত্রের শর্ত তৈরিতে সরকারি ক্রয়বিধি এবং প্রকল্পের ঋণ দাতা সংস্থার নীতিমালা অনুসরণ করা হয়। কিন্তু এ প্রকল্পের দরপত্রে তার স্পষ্ট ব্যত্যয় দেখা গেছে। ফলে দরপত্রটি প্রতিযোগিতামূলক না হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। সর্বশেষ এ চিঠির জবাব পাওয়া নিয়ে কিছুটা ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। বেবিচক বলছে, জবাব দিয়েছে। আর সিপিটিইউ এ বিষয়ে অনেকটা নীরব।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বর্তমানে আইএসও সনদের আরো উন্নত স্তর স্থাপিত হয়েছে। কেন বেবিচকের দরপত্রে উন্নত স্তরের পরিবর্তে ১৪ বছর আগের আইএসও সনদ শর্ত হিসেবে প্রযোজ্য হওয়ার কথা বলা হয়েছে, তা বোধগম্য নয়।

আরেকটি শর্তে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে এর আগে জাইকার ঋণের প্রকল্পে এবং জি-৭ দেশে কাজের অভিজ্ঞতার শর্ত দেওয়া হয়েছে। সিপিটিইউর চিঠিতে জাইকার গাইডলাইনে এ ধরনের কোনো শর্তের বিষয় নেই। বেবিচকের দরপত্রে যোগ্যতার শর্ত সংকুচিত হয়েছে। ফলে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় কোম্পানিগুলোর দরপত্রে অংশগ্রহণ এখনো অনিশ্চিত। এই পর্যবেক্ষণের মধ্যে দরপত্রে কঠিন শর্তজুড়ে পছন্দের প্রতিষ্ঠানকে কাজ দিতে পাঁয়তারা করছে বেবিচক।

এদিকে, গত ৩ মার্চ বিমানে ৮ ধরনের এবং বেবিচকে ১১ ধরনের দুর্নীতি চিহ্নিত করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

 

"