লক্ষ্যে অটুট ১৪ দল

* ‘সমৃদ্ধির অগ্রযাত্রায় বাংলাদেশ’ গড়ার প্রত্যয় * শক্তিশালী বিরোধী দল হোক জোটসঙ্গীরা

প্রকাশ : ১৪ মার্চ ২০১৯, ০০:০০

কাইয়ুম আহমেদ

মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক ইস্যুতে এক হয়ে কাজ করবে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪-দলীয় জোট। দূরত্ব বজায় রেখে নয়; লক্ষ্যে অটুট থেকে একসঙ্গে ‘সমৃদ্ধির অগ্রযাত্রায় বাংলাদেশ’ গড়ার অঙ্গীকার বাস্তবায়ন করবে। উন্নত বিশ্বের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে জঙ্গিবাদ, দুর্নীতি আর জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় কাজ করে যাবে। গড়ে তুলবে শক্তিশালী বিরোধী দল। এ লক্ষ্যেই কৌশল প্রণয়ন করেছে টানা তিনবার সরকার গঠন করা দল আওয়ামী লীগ। তাই নতুন সরকারের মন্ত্রিসভায় শরিক দলের কোনো নেতাকে রাখা হয়নি। ক্ষমতাসীন দলটি চায় উন্নত বিশ্বের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে বিরোধী দল যে ভূমিকা রাখে, জোটসঙ্গীরাও সেই ভূমিকা রাখবেন।

সূত্র জানায়, আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনারও ইচ্ছা সরকার ও বিরোধী দলে থাকুক মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ শক্তি। তাই সরকারে না থেকে সংসদের ভেতরে ও বাইরে ভূমিকা রাখতে পারেন শরিকরা। আওয়ামী লীগের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে তাদের সাংগঠনিক শক্তিও বাড়াতে পারেন। তবে আদর্শিক জোট হিসেবে ১৪ দল টিকে থাকবে। তা ছাড়া দেশে শক্তিশালী বিরোধী দল গড়ে ওঠারও পক্ষে দলটি। তাই জাতীয় পার্টিকেও এবার পুরোপুরি বিরোধী দলে রাখা হয়েছে। জোটের অন্য শরিকরাও বিরোধী দলে গেলে সংসদ আরো প্রাণবন্ত হওয়ার আশা দলটির নেতাদের।

এদিকে, মন্ত্রিসভায় স্থান না পাওয়া নিয়েও এখন শরিকরা আওয়ামী লীগের সঙ্গে দর-কষাকষির মতো অবস্থানে নেই বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেকরা।

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হারুন-অর-রশিদ বলেন, একাদশ সংসদ নির্বাচন ও নতুন মন্ত্রিসভা গঠনের মাধ্যমে রাজনীতিতে নতুন অধ্যায়ের শুরু হয়েছে। ১৪ দলের শরিক দলগুলো মন্ত্রিসভায় নেই, তবে তারা যদি বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করে, তাহলে সাংবিধানিক কোনো বাধা নেই। বরং তারা যদি সংসদের ভেতর ও বাইরে গঠনমূলক ভূমিকা পালন করে, তাহলে গণতান্ত্রিক চর্চার যে ধারা শুরু হয়েছে, তা আরো এগিয়ে যাবে এবং রাজনীতিতে নতুন মাত্রা ও সংস্কৃতি গড়ে উঠবে।

আর রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদের ভাষ্য, এখন আওয়ামী লীগ বিপুল বিক্রমে। জোটসঙ্গীদের আগের যে চাহিদা বা আবেদন সেটা ওই অর্থে নেই। তাদের চাপ দেওয়ার মতো সক্ষমতাও নেই। তা ছাড়া পরে হয়তো মন্ত্রিসভায় দু-একজন অন্তর্ভুক্ত হলেও হতে পারেন। তবে এ মুহূর্তে বিষয়টি নিয়ে কোনো চাপ নেই। আবার জোটের শরিক দলগুলোর নেতারাও মন্তব্য করার ক্ষেত্রে এখন বেশ সাবধান। এ প্রসঙ্গে ১৪ দলের সমন্বয়ক ও আওয়ামী লীগের সভাপতিম-লীর সদস্য মোহাম্মদ নাসিম, যে আদর্শ লক্ষ্য সামনে রেখে ১৪ দল গঠিত হয়েছিল, তা পুরো বাস্তবায়ন হয়নি। তাই ১৪ দলের প্রয়োজনীয়তাও শেষ হয়ে যায়নি। কোনো পদ-পদবি বা লঘুকরণের জন্য ১৪ দল সংগঠিত হয়নি। যত দিন পর্যন্ত ১৪ দলের লক্ষ্য অর্জিত না হবে, তত দিন পর্যন্ত কাজ করে যাবে। ১৪ দল পাহাড়ের মতো ঐক্যবদ্ধ আছে। দুঃসময় ও সুসময় সব সময়ই ১৪ দল শেখ হাসিনার পাশে আছে, থাকবে। চোখের মণির মতো তাকে রক্ষা করবে।

জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনু বলেন, ১৪ দল যে লক্ষ্য নিয়ে গঠিত হয়েছিল, সেই লক্ষ্য এখনো পূরণ হয়নি। ১০ বছরে পরাজিত শক্তি এখনো সঠিক পথে আসেনি। নির্বাচনে তারা কোণঠাসা হলেও ষড়যন্ত্র অব্যাহত রেখেছে। পুনর্নির্বাচনের নামে দলটি নতুন করে চক্রান্ত শুরু করেছে। তাদের আত্মসমর্পণ বা ক্ষমা না চাওয়া পর্যন্ত ১৪ দল কাজ করে যাবে।

জাসদ সাধারণ সম্পাদক শিরীন আখতার বলেন, একটি আদর্শকে কেন্দ্র করে ১৪-দলীয় জোট গঠন করা হয়েছিল। আমরা জোটেই আছি। চিন্তা করার কোনো কারণ নেই।

শিরীন আখতার বলেন, প্রধানমন্ত্রী অনেক দিন ধরেই শরিক দলগুলোকে আরো শক্তিশালী হওয়ার তাগিদ দিয়ে আসছেন। জাসদও দলের শক্তিমত্তা বাড়ানোর বিষয়ে আরো মনোযোগী হচ্ছে। আর মন্ত্রিসভা এবং সরকার পরিচালনা একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া বলে মনে করেন জাসদের আরেকটি অংশের (আম্বিয়া) নেতা মাঈন উদ্দিন খান বাদল। তিনি বলেন, আমি এটাকে খুব আশ্চর্যন্বিত হওয়ার মতো বিষয় মনে করি না। এটা প্রধানমন্ত্রীর এখতিয়ার।

তিনি বলেন, সামনের দিনগুলোতে মন্ত্রিসভায় অনেকে সংযুক্ত হতে পারেন। এটা একটা ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। কেউ মন্ত্রী হলেন না, মন্তব্য করলেন। এটা তো আমি ঠিক মনে করব না। যখন মন্ত্রী ছিলেন তখন তো মন্তব্য করেননি।

প্রসঙ্গত, শেখ হাসিনার নেতৃত্বে এবার ৪৭ জনের নতুন মন্ত্রিসভার সবাইকে নেওয়া হয়েছে আওয়ামী লীগ থেকে। ১৯৭৩ সালের পর শতভাগ দলীয় মন্ত্রিসভা পেয়ে খুশি হয়েছেন তৃণমূল থেকে শুরু করে কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা। এর বাইরে শরিক দলগুলোর সংসদ সদস্য আছেন ৩১ জন। তাদের মধ্যে ওয়ার্কার্স পার্টির তিন, জাসদ-ইনুর দুই, তরিকত ফেডারেশনের এক ও জেপি-মঞ্জুর একজন। এ ছাড়া জাপার ২২ ও বিকল্পধারার সংসদ সদস্য আছেন দুজন।

লম্বা বিরতির পর শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ১৯৯৬ সালে ১৪৬ আসনে বিজয়ী হয় আওয়ামী লীগ। সরকার গঠনের জন্য ৩২ আসন নিয়ে জাপা ও একটি আসন নিয়ে জেএসডির সমর্থন পান তারা। জাপা থেকে আনোয়ার হোসেন ও জেএসডি থেকে আ স ম আবদুর রবকে মন্ত্রিসভার সদস্য করা হয়। এরপর ২০০৮ সাল থেকে গত তিনটি নির্বাচনেই জোটবদ্ধভাবে অংশ নেয় আওয়ামী লীগ। এককভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেও গত দুই সরকারের মন্ত্রিসভায় শরিকদের রেখেছিল আওয়ামী লীগ। তবে এবার সে ধারাবাহিকতা অক্ষুণœ থাকেনি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে নতুন গঠিত মন্ত্রিসভার ৪৭ জনের মধ্যে ২৪ জন মন্ত্রী, ১৯ জন প্রতিমন্ত্রী এবং ৩ জন উপমন্ত্রীর ৪৩ জন আর টেকনোক্র্যাট কোটায় তিনজনও আওয়ামী লীগের।

 

"