আদালত অবমাননার দায়ে সাবেক জেলা জজের দন্ড

প্রকাশ : ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০০:০০

নিজস্ব প্রতিবেদক
ama ami

ফেনীর সাবেক জেলা জজ মো. ফিরোজ আলমকে আদালত অবমাননার দায়ে পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা করেছে হাইকোর্ট। জরিমানার এই অর্থ ১৫ দিনের মধ্যে পরিশোধ না করলে সাত দিনের কারাদন্ড ভোগ করতে হবে সাবেক এই বিচারককে। ষোলো বছর আগে হাইকোর্টের একজন বিচারক ফেনী সফরে গিয়ে প্রটোকল না পাওয়ায় আদালত একটি রুল জারি করে। সে সময় ফিরোজ আলম ছিলেন ফেনীর জেলা জজের দায়িত্বে।

সেই রুলের ওপর চূড়ান্ত শুনানি শেষে বিচারপতি ওবায়দুল হাসান ও বিচারপতি এস এম কুদ্দুস জামানের হাইকোর্ট বেঞ্চ বুধবার ফিরোজ আলমকে আদালত অবমাননার দায়ে দোষী সাব্যস্ত করে রায় দেয়। পাশাপাশি সুপ্রিম কোর্টের বিচারকদের ভ্রমণ ও পরিদর্শনের ক্ষেত্রে প্রটোকল ব্যবস্থা নিয়ে কয়েক দফা নির্দেশনাও দিয়েছে হাইকোর্ট। এসব নির্দেশনা সার্কুলার আকারে জারি করতে সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল ও আইন সচিবকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আদালতে ফিরোজ আলমের পক্ষে ছিলেন আইনজীবী ফয়সাল এইচ খান ও আইনজীবী মইন উদ্দিন টিপু। এ মামলার অপর দুই বিবাদী ফেনী জেলা জজ আদালতের দুই কর্মচারী ইয়ার আহমেদ ও আলতাফ হোসেনের পক্ষে ছিলেন আইনজীবী এ এম আমিন উদ্দিন ও আইনজীবী মিনহাজুল হক চৌধুরী। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল রাফি আহমেদ। রায়ের পর আইনজীবী মিনহাজুল হক চৌধুরী পরে বলেন, হাইকোর্ট আদালত অবমাননার অভিযোগ থেকে ফেনী জেলা জজ আদালতের নাজির ও নায়েবে নাজিরকে অব্যাহতি দিয়েছে। তবে তৎকালীন জেলা জজ ফিরোজ আলমকে দোষী সাব্যস্ত করে জরিমানা করেছে।

কী ঘটেছিল? ২০০৩ সালের অক্টোবরে হাইকোর্টের তৎকালীন বিচারপতি সৈয়দ আমিরুল ইসলাম ফেনী সফরে যান। তার সফরসূচি জানিয়ে ফেনী জজ আদালতে আগেই চিঠি পাঠানো হয়। ২২ অক্টোবর দুপুরে ট্রেনে করে ফেনী পৌঁছে জেলা জজ আদালতের কোনো প্রতিনিধিকে না পেয়ে জেলা জজকে ফোন করেন বিচারপতি সৈয়দ আমিরুল ইসলাম। আদালতের একজন কর্মচারী ফোন ধরে তাকে বলেন, জজ এজলাসে আছেন, এজলাস থেকে নামলে বিষয়টি তাকে জানানো হবে। কিছুক্ষণ পর আবারও জেলা জজকে ফোন করেন হাইকোর্টের বিচারক। তখনো আদালতের ওই কর্মচারী একই কথা বলেন। দীর্ঘ সময় অপেক্ষার পর বিকাল সাড়ে ৪টায় বিচারপতি সৈয়দ আমিরুল ইসলাম তার ছেলেকে জেলা আদালতে পাঠান। কিন্তু সেখানে জেলা জজ বা কোনো কর্মকর্তা তার সঙ্গে কোনো কথা বলেননি। পরে জেলা প্রশাসক ওই বিচারপতির প্রটোকলের ব্যবস্থা করেন। সফর শেষে তিনি ঢাকায় ফেরার পর ওই বছরের ২৯ অক্টোবর ফেনীর জেলা জজ মো. ফিরোজ আলমসহ তিনজনের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার রুল জারি করেন হাইকোর্ট।

জেলা জজ ফিরোজ আলম ছাড়া অন্য দুজন হলেন ফেনী জেলা আদালতের নাজির ইয়ার আহমেদ ও নায়েবে নাজির আলতাফ হোসেন। আদালত অবমাননার নোটিশ পেয়ে ওই বছরের ১২ নভেম্বর হাইকোর্টে হাজির হয়ে তিনজনই মৌখিকভাবে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। হাইকোর্ট তাদের লিখিতভাবে ক্ষমা প্রার্থনা করতে বলে ১৭ নভেম্বর বিষয়টি আদেশের জন্য রাখে। কিন্তু নির্ধারিত তারিখের আগেই জেলা জজ ফিরোজ আলম আপিল বিভাগে আবেদন করলে আপিল বিভাগ হাইকোর্টের আদেশ স্থগিত করে। পরে ২০১১ সালের ৩১ জানুয়ারি আপিল বিভাগ ফিরোজ আলমের আবেদনটি খারিজ করে রুল শুনানির আদেশ দেয়। তার ধারাবাহিকতায় মঙ্গলবার চূড়ান্ত রুল শুনানি শেষে রায় দিলেন হাইকোর্ট।

প্রটোকল নিয়ে নির্দেশনা : সুপ্রিম কোর্টের বিচারকদের সফরে প্রটোকল দেওয়ার বিষয়ে জেলা জজশিপ ও জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপারদের কয়েক দফা নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে হাইকোর্টের রায়ে। ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল রাফি আহমেদ জানান, সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের কীভাবে প্রটোকল দিতে হবে, সে বিষয়ে বলা হয়েছে ওই চার দফা নির্দেশনায়।

ছুটির দিনে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি কোনো জেলা সদরে পরিদর্শন, ভ্রমণ বা সফরে গেলে জেলা ও দায়রা জজ পদমর্যাদার অন্তত একজন বিচারিক কর্মকর্তা সফরকারী বিচারপতিকে সার্কিট হাউস বা তার অবস্থানের জায়গায় অভ্যর্থনা জানাবেন। জেলা ও দায়রা জজ সে সময় জেলা সদর দফতরে অবস্থান করলে অবশ্যই তাকে সফরকারী বিচারপতির সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে হবে।

সপ্তাহের কোনো কর্মদিবসে অফিস চলাকালে সুপ্রিম কোর্টের কোনো বিচারপতি সফরে গেলে জাজ ইনচার্জ নেজারত তাকে অভ্যর্থনা জানাবেন। তবে আদালতের কার্যক্রম শেষে জেলা দায়রা জজ অথবা তার অনুপস্থিতেতে একজন বিচারিক কর্মকর্তা সফরকারী বিচারপতির সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করবেন। সফরকারী বিচারপতি উপজেলা বা গ্রামে অবস্থান করলে জাজ ইনচার্জ নেজারত অথবা একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা তার দেখভাল করবেন। সফরকারী বিচারপতির বিদায়ের সময় জেলা ও দায়রা জজ বা অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজকে অবশ্যই উপস্থিত থাকতে হবে। জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার বা তাদের প্রতিনিধিদেরও সে সময় উপস্থিত থাকতে হবে।

"