টাকার লোভে টাঙ্গাইলে প্রবাসীর স্ত্রীকে খুন

* আদালতে তিন আসামির স্বীকারোক্তি * ভাইয়ের স্ত্রী ও নিকটাত্মীয়রা জড়িত

প্রকাশ : ১২ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০০:০০

রেজওয়ান শরিফ, টাঙ্গাইল
ama ami

ধার নেওয়া ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা আত্মসাৎ করার অপচেষ্টা এবং চেক জালিয়াতির মাধ্যমে ব্যাংক থেকে আরো ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা তুলে নেওয়ার অপকর্ম ঢাকতেই টাঙ্গাইলের বাসাইলে গলা কেটে হত্যা করা হয় প্রবাসীর স্ত্রী মনোয়ারা বেগমকে। ঘটনাটি ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে হত্যাকারী নিজেই বাদী হয়ে মামলা করেন। অপরাধীদের শেষ রক্ষা হয়নি। গোয়েন্দাদের জালে ধরা পড়েছেন লোমহর্ষক ঘটনার ঠান্ডা মাথার খুনিরা। ওরা তিনজন। এদের মধ্যে নিহত মনোয়ারার ভাইয়ের স্ত্রীও আছেন। এ তথ্য জানিয়েছে পুলিশ।

গত ১ জানুয়ারি টাঙ্গাইলের বাসাইল উপজেলার নথখোলা পৌলী গ্রামের নিজ ঘরের ভেতর থেকে প্রবাসী ধলা খানের স্ত্রী মনোয়ারা বেগমের (৪০) গলা কাটা লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত অভিযোগে জেলা গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ নিহত মনোয়ারার ভাইয়ের স্ত্রী তাসলিমা আক্তার খুকি, তাসলিমার ছোট ভাই আল আমিন এবং নিহতের বোনের ছেলে আবদুর রহিমকে আটক করে। তারা সবাই এ খুনের সঙ্গে জড়িত বলে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে।

গত ২৩ জানুয়ারি জাতীয় দৈনিক ‘প্রতিদিনের সংবাদ’ পত্রিকায় ‘প্রবাসীর স্ত্রীকে গলা কেটে হত্যা’ খুনির বিচার চান প্রবাসী স্বামী ও ছেলে শিরোনামে এই হত্যাকান্ড নিয়ে বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। ওইদিনই পুলিশ সুপার সঞ্জিত কুমার রায় মামলাটি বাসাইল থানা পুলিশের কাছ থেকে সরিয়ে গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি দক্ষিণ) কাছে হস্তান্তর করে দ্রুত অপরাধীদের ধরতে ওসি শ্যামল কুমার দত্তকে নির্দেশ দেন। নিহত

মনোয়ারা বেগমের ভাসুরের ছেলে দেলোয়ার খান জানান, আমার চাচির বোনের ছেলে আবদুর রহিমকে ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা ধার হিসেবে দেন চাচি। সেখান থেকে ৩০ হাজার টাকা পরিশোধ করলেও বাকি টাকা দিতে গড়িমসি করে তারা। এরপর আবদুর রহিম ও চাচির ভাইয়ের স্ত্রী তাসলিমা আক্তার খুঁকি, খুঁকির ভাই আল আমিন মিলে চাচির ঘরে সিঁধ কেটে ব্যাংকের চেক বই চুরি করে। এ ব্যাপারে চাচি মনোয়ারা বেগম গত বছরের ১২ ডিসেম্বর বাসাইল থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। এরপর চাচির স্বাক্ষর জাল করে শাহজালাল ব্যাংক থেকে ৯০ হাজার টাকা তুলে নেয় তারা। এর তিন দিন পর ২১ ডিসেম্বর আবারও ৯০ হাজার টাকা তুলে নেয় তারা। সব কিছু নেওয়ার পর ভবিষ্যতের বিপদ এড়াতে আমার চাচিকে খুন করে। শেষে অপরাধ ঢাকতে নিজেই মামলার বাদী সেজে অন্যের ওপর দায় চাপানোর চেষ্টা করে। কিন্তু পাপ চাপা থাকে না।

নিহতের চাচা শ্বশুর মো. শহর আলী খান বলেন, যারা খুব কাছের ছিল। বিশ্বস্ত ছিল। তারাই সামান্য স্বার্থের কারণে খুন করল। খুন করে মামলার বাদী হয়ে দোষ আমাদের ওপর চাপানোর চেষ্টা করেছে। এমন ন্যক্কারজনক ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া উচিত।

অভিযুক্ত তাসলিমার শ্বশুরবাড়ি টাঙ্গাইল সদর উপজেলার আকুয়া গ্রামে গেলে তাসলিমার বিরুদ্ধে হাজারো অভিযোগের পাহাড় এসে জমা হয়। তাসলিমার ভাসুর লাল মামুদ বলেন, আমার ভাইয়ের স্ত্রীর সঙ্গে আমাদের কোনো উঠা-বসা ছিল না। সে তার বাড়ির চারপাশে প্রাচীর তুলে আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়। তাসলিমা তার দুই শিশু সন্তান ও আমার বোনের ছেলে আবদুর রহিমকে নিয়ে থাকত। তার বাড়িতে অচেনা মানুষের আনাগোনা ছিল। এই বিষয় নিয়ে আমিসহ এলাকাবাসী একাধিকবার তাসলিমাকে সতর্ক করলেও সে কর্ণপাত করেনি। আমার ভাই বিদেশ থাকার কারণে এখানকার বিষয়ে উদাসীন ছিল। সে কারণে তাসলিমা বেপরোয়া হয়ে উঠে। এদিকে শহরের আকুরটাকুর পাড়ার ফজলুল হকের ছেলে তাসলিমার ছোট ভাই আল আমিন সম্পর্কেও উঠে আসে নানা তথ্য। বখাটে ও বেপরোয়া জীবন-যাপন করত সে। বাবার অঢেল সম্পদ থাকা সত্ত্বেও সে বিপদগামী। অন্যদিকে বাসাইল উপজেলার কাশিল পশ্চিমপাড়া এলাকার সোলায়মান মিয়ার ছেলে আবদুর রহিম মাদকাসক্ত। নেশার টাকা সংস্থান করতে তিনজনে মিলে জালিয়াতির মাধ্যমে ব্যাংক থেকে টাকা তুলে নেয়। এছাড়াও ধার নেওয়া টাকা আত্মসাৎ করতে হত্যাকান্ডের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে।

টাঙ্গাইল গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি দক্ষিণ) কর্মকর্তা মোহাম্মদ হাফিজুর রহমান বলেন, হত্যা মামলাটি বেশ চাঞ্চল্য সৃষ্টি করে। বাসাইল থানা পুলিশ মামলাটির সমাধান করতে না পাড়ায় এর তদন্ত ভার আমাদের হাতে আসে। আমরা প্রযুক্তির সহায়তায় ওই তিনজনের সংশ্লিষ্টতা খুঁজে পাই। পরে নিশ্চিত হয়ে গত ২৮ জানুয়ারি তাদের গ্রেফতার করি। জিজ্ঞাসাবাদে তারা এই হত্যাকান্ডের সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে। তদন্ত কর্মকর্তা (এসআই) আলমগীর হোসেন বলেন, মামলার সঙ্গে জড়িত তিনজনকে শনাক্ত করে আটক করা হয়েছে। আরো কেউ সম্পৃক্ত থাকলে তাদেরও আটক করা হবে। এ ব্যাপারে তদন্ত চলছে। আটকরা টাঙ্গাইল সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট শামসুল আলম, আবদুল্লাহ আল মাসুদ ও আমিনুল ইসলাম তাদের জবানবন্দি রেকর্ড করেন।

"