ডাকসু নির্বাচন

নেতৃত্ব তৈরির ‘সূতিকাগারে’ আবার আলোর ঝলকানি

প্রকাশ : ১২ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০০:০০

কাইয়ুম আহমেদ
ama ami

নেতৃত্ব তৈরির ‘সূতিকাগার’ খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদে (ডাকসু) আবার জ্বলবে আলো। দীর্ঘদিন আঁধারে কেঁদে ফিরে পথচলাও প্রায় শেষ হতে বসেছিল; নিভে গিয়েছিল আশা-প্রত্যাশার বাতিগুলো। সুস্থ নেতৃত্বের বিকাশে এসেছিল বন্ধ্যত্ব। কিন্তু না সব শেষের পথে মিশে যেতে যেতে আবার যেন থেমে গেল, কেটে গেল আঁধার। অবসান ঘটল সব বাধা-বিপত্তি আর হতাশার। প্রতিষ্ঠার শতবর্ষের দ্বারপ্রান্তে এসে মিনি পার্লামেন্ট খ্যাত ডাকসুতে নির্বাচনের ঢোল বাজল। এদিকে, এই নির্বাচনকে ঘিরে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা বিশ্ববিদ্যালয়জুড়ে। শুধু ছাত্র সংগঠনই নয়, ডাকসু নির্বাচনের ঢেউ ছড়িয়ে পড়েছে দেশের রাজনীতির অঙ্গনেও। সাধারণ শিক্ষার্থী থেকে শীর্ষ রাজনীতিবিদ সবার প্রত্যাশা সুষ্ঠু নির্বাচন, ছাত্র-শিক্ষক সহাবস্থান এবং হারানো গৌরব ফিরে পাওয়া।

ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে স্বাধীনতা সংগ্রাম, গণতন্ত্রের জন্য আন্দোলনসহ সব ন্যায়সঙ্গত আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। সর্বশেষ কোটা সংস্কার আন্দোলনেও অগ্রগণ্য ভূমিকা ছিল এ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের। মিনি পার্লামেন্ট হিসেবেই পরিচিত ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু)। প্রতিষ্ঠার পর ডাকসুর নেতারা জাতীয় রাজনীতিতে নেতৃত্ব দিয়েছেন। তারাই ভাষা আন্দোলন, স্বাধীনতা যুদ্ধ কিংবা ৯০’র গণতান্ত্রিক আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন। অথচ গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠার পর থেকেই দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ ছিল এই মিনি পার্লামেন্টের নির্বাচন। ৯০’র পরবর্তী সময়ে পাঁচবার নির্বাচনের উদ্যোগ নিয়েও শেষ পর্যন্ত নির্বাচন করতে পারেনি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। অবশেষে ২৮ বছর পর হাইকোর্টের নির্দেশনার কারণে আগামী ১১ মার্চ নির্বাচন হচ্ছে। এ নিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যেও শুরু হয়েছে নানা আলোচনা। ডাকসু অচল থাকায় শিক্ষার্থীদের অধিকার নিয়ে কেউ কথা বলতে পারেনি। ফি সচল থাকলেও শিক্ষার্থীদের সমস্যা সমাধানে তেমন কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়নি। তাই এবারের ডাকসু নির্বাচন অনেক গুরুত্বপূর্ণ। এই নির্বাচনের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তা, অ্যাকাডেমিক বিষয়, খাবারের মান, শিক্ষক নিয়োগ, পরিবহনসহ শিক্ষার্থীদের নানা সমস্যার সমাধান হবে বলে মনে করেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা।

শিক্ষার্থীরা বলছেন, এই বিদ্যাপীঠের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান থেকে শুরু করে দেশের অসংখ্য জ্ঞানতাপস, বিজ্ঞানী, রাজনীতিবিদ, গবেষক, সাহিত্যবিশারদ ও ভাষা সংগ্রামীর নাম। কিন্তু আবাসন সংকট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান সমস্যা। প্রায় ৪০ হাজার শিক্ষার্থী থাকলেও নেই যথেষ্ট আবাসন ব্যবস্থা। স্নাতকোত্তর শিক্ষা শেষ হওয়ার পরও ৮-১০ বছর বা ১৫ বছর ধরে হলে অবস্থান করছেন অনেকেই। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে প্রথম ও দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থীরা। প্রায় প্রতিটি হলেই বিরাজ করছে এ অবস্থা। ডাকসু নির্বাচনের মধ্য দিয়ে শিক্ষার্থীদের আবাসন সমস্যার সমাধান হোক।

দ্বিতীয় প্রধান সমস্যা হলো লাইব্রেরি। প্রায় ৪০ হাজার শিক্ষার্থীর জন্য রয়েছে মাত্র ৭০০ জনের ধারণক্ষমতা সম্পন্ন কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার। কালের আবর্তে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী বাড়লেও বাড়ানো হয়নি লাইব্রেরির পরিসর। পৃথিবীতে বোধহয় এটাই একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয় যেখানে পড়ার জন্য সংগ্রাম করতে হয় প্রতিনিয়ত। তবে প্রতি বছর বাড়ানো হচ্ছে শিক্ষার্থীর সংখ্যা এবং খোলা হচ্ছে নতুন বিভাগ। অথচ এই বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর পড়াশোনা ও গবেষণা করার কিংবা থাকার নেই যথেষ্ট সুযোগ। নেই উন্নত ল্যাবরেটরি ব্যবহারের সুযোগ। হলগুলোতেও নেই পর্যাপ্ত রিডিং রুম। বিশ্ববিদ্যালয় মানেই গবেষণা। কিন্তু এখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা বলতে তেমন কিছুই হয় না। নেই পর্যাপ্ত বাজেটও যা আছে তারও আবার অপব্যবহার হয়।

হলে খাবারের মান খারাপ। প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের যে পরিমাণ খাবার বা ক্যালরি প্রয়োজন তার ছিটেফোঁটাও মেলে না। এসব দেখার দায়িত্বে থাকা আবাসিক শিক্ষকরা ব্যস্ত রাজনীতির মাঠ গরম করতে। ডাকসু নির্বাচনে এসব সমস্যা প্রাধান্য পাবে এটা সাধারণ শিক্ষার্থীদের দাবি। যদিও বর্তমান উপাচার্য দায়িত্ব নেওয়ার পর এসব সমস্যা দূরীকরণে নানামুখী কর্মপন্থা হাতে নিয়েছেন। আশার আলো দেখাচ্ছেন শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনিও। তবে সমস্যা এমন এক পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছেছে যে, রাতারাতি চাইলেই পরিবর্তন নিয়ে আসা সম্ভব নয়। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, সিনেট সভায় ছাত্র প্রতিনিধি, নতুন হল নির্মাণ, লাইব্রেরি বর্ধিতকরণ, বহিরাগতদের প্রবেশে শর্ত আরোপ ইত্যাদি পদক্ষেপের মাধ্যমে মিলতে পারে সমাধান।

বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামান বলেন, দীর্ঘদিন ধরে ডাকসু নির্বাচন না থাকায় এখানে একটা শূন্যতা তৈরি হয়েছে। আমাদের অনেক কিছুই আবার নতুন করে ভাবতে হচ্ছে। আমাদের অনেক কাজেই ভুল থাকতে পারে। তবে এই নির্বাচন যখন একাডেমিক শিডিউলে চলে আসবে; তখন অনেক কাজই সহজ হয়ে যাবে। নির্বাচনে কেউ যেন কারো অধিকার ক্ষুণœ করতে না পারে সেজন্য আমরা ব্যবস্থা নেব মন্তব্য করে অধ্যাপক আখতারুজ্জামান বলেন, ডাকসু নির্বাচনের সুন্দর একটা ব্যবস্থাপনা আছে। এখানে শিক্ষকদের বিভিন্ন কমিটির নিয়মিত নির্বাচন হচ্ছে। এখন পর্যন্ত কেউ কোনো অভিযোগ আনতে পারেনি। ডাকসু নির্বাচন নিয়েও কারো অনাস্থা বা শঙ্কার কোনো কারণ নেই। এর জন্য আমরা আমাদের সাধ্যমতো চেষ্টা করব।

ডাকসুর সাবেক ভিসি প্রফেসর মাহফুজা খানম বলেন, ডাকসু নির্বাচন হচ্ছে এই খবর অত্যন্ত আনন্দের। দীর্ঘদিন পর প্রত্যাশিত এই প্রতিষ্ঠানের নির্বাচন হচ্ছে। এর আগেও কয়েকবার উদ্যোগ নেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত নির্বাচন হয়নি, যেটা আমাদের আশাহত করেছে।

তিনি বলেন, গত ২৮ বছরে দেশ ডাকসুর ৫৬ জন নেতাকে হারিয়েছে। অর্থাৎ গত ২৮ বছরে যদি নির্বাচন হতো তবে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক মিলে মোট ৫৬ জন যোগ্য নেতা পেত দেশ।

ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের ২য় বর্ষের শিক্ষার্থী মাসুদ রানা বলেন, ডাকসু নির্বাচন ও হল সংসদ নির্বাচনে এমন প্রার্থীকেই চাই যার ভাবমূর্তি, ইমেজ সবার কাছে গ্রহণযোগ্য, যাকে সাধারণ শিক্ষার্থীরা ভালোবাসে, পছন্দ করে। নির্বাচিত হয়ে তিনি সাধারণ শিক্ষার্থীদের চাওয়া-পাওয়ার প্রতি গুরুত্ব দেবেন, শিক্ষার্থীদের প্রতিটি সমস্যাকে সমাধান করবেন।

আরবি বিভাগের ২য় বর্ষের শিক্ষার্থী হযরত আলী বলেন, ইংরেজিতে আমরা প্রায়ই একটা কথা বলে থাকি, ‘সামথিং ইজ বেটার দ্যান নাথিং।’ এবারের ডাকসু নির্বাচনকে আমি এভাবেই দেখছি। একটু ভেঙে বলি, ১৯৯০ সালের ডাকসু নির্বাচন এবং ২০১৯ সালের ডাকসু নির্বাচনকে কোনোভাবেই এক করে দেখা সম্ভব নয়। তাই ডাকসুকে নিয়ে প্রত্যাশাটায় ও নিশ্চয়ই ভিন্নতা থাকবে।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন জানিয়েছে, গত অক্টোবরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের একটি তালিকা তৈরি করে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। তালিকায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৮টি আবাসিক হলের সঙ্গে সংযুক্ত ও আবাসিক মিলিয়ে ৩৮ হাজার ৪৯৩ জন শিক্ষার্থীর তথ্য রয়েছে।

৪৭ বছরে সাতবার ডাকসু নির্বাচন : সর্বশেষ নির্বাচন হয় ১৯৯০ সালে। মূলত ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পরের বছর যাত্রা করে ডাকসু। প্রথমে পরোক্ষ হলেও পরে শিক্ষার্থীদের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচন হয়। ডাকসুর বিধান অনুযায়ী প্রতি বছর নির্বাচন হওয়ার কথা। কিন্তু দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ভোট হয়েছে মাত্র সাত বার। ১৯৯০ সালের ৬ জুলাই ডাকসুর সর্বশেষ নির্বাচন হয়।

১৯২২-২৩ শিক্ষাবর্ষে ডাকসু সৃষ্টি হয়। ডাকসুর প্রথম ভিপি ও জিএস হন যথাক্রমে মমতাজ উদ্দিন আহমেদ ও যোগেন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত। আর সর্বশেষ ১৯৯০ সালের নির্বাচনে আমান উল্লাহ আমান ভিপি ও জিএস নির্বাচিত হন খায়রুল কবির খোকন। এরপর নানা প্রতিশ্রুতিতেই চলে যায় ২৮ বছর।

বিভিন্ন সময় ডাকসুর মাধ্যমে বাংলাদেশের রাজনীতিতে অসংখ্য প্রতিভাবান নেতা তৈরি হয়েছে। তার মধ্যে আছেন রাশেদ খান মেনন, মতিয়া চৌধুরী, তোফায়েল আহমেদ, মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম, ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ফেরদৌস আহমদ কোরেশী, শফি আহমেদ, আ স ম আবদুর রব, জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলু, মাহমুদুর রহমান মান্না, আখতারউজ্জামান, সুলতান মোহাম্মদ মনসুর, মুশতাক হোসেন।

"