নিজের খেয়ে ট্রাফিক জ্যাম সামাল দেন লাকী আক্তার

প্রকাশ : ১১ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০০:০০

মানিকগঞ্জ প্রতিনিধি
ama ami

মানিকগঞ্জের লাকী আক্তারের মনজুড়ে রয়েছে মানবসেবা। মানুষের উপকার করার ইচ্ছা। নেই মনোভাব থেকেই পাঁচ ধরে বছর স্বেচ্ছায় ট্রাফিক সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। পরনে নীল রংয়ের সালোয়ার কামিজ, ছোট লাঠি হাতে প্রতিদিনই যানবাহন নিয়ন্ত্রণ করতে দেখা যাবে তাকে মানিকগঞ্জ শহরের খালপাড় এলাকায়। লাকীকে দেখে অনেকেই নারী ট্রাফিক পুলিশ মনে করলেও পরে তারা বুঝতে পারেন লাকী পুলিশ সদস্য নন। মানুষের উপকার ও কষ্ট লাঘবের মানসিকতা থেকেই তার এই যানবাহন নিয়ন্ত্রণ। কোনো আর্থিক সুবিধা দাবি করেন না তিনি যাত্রীদের কাছে। তিনি মানসিক রোগী, এটা মানুষের ধারণা। কারণ পরোপকার আমাদের সমাজ থেকে বলতে গেলে ওঠেই গেছে। এমনি একটি বাস্তবতায় নিজের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানোর কাছ যদি কেউ করে তবে তাকে পাগলই ভাবে আমাদের স্বার্থান্ধ সমাজ।

স্থানীয়রা জানান, শহরের যানবাহন নিয়ন্ত্রণের জন্য শুক্রবার বাদে প্রতিদিনই মানিকগঞ্জ শহরের খালপাড় ব্রিজ এলাকায় ট্রাফিক পুলিশ কাজ করে থাকে। ট্রাফিক পুলিশের পাশাপাশি লাকী আক্তারও গত পাঁচ বছর ধরে স্বেচ্ছায় ট্রাফিক পুলিশের কাজ করে যাচ্ছেন। ত্বক ঝলসানো রোদে কিংবা ঝড়-বৃষ্টিতে ট্রাফিক পুলিশ বিশ্রাম নিলেও লাকীর কোনো বিশ্রাম নেই। প্রতিদিন সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত টানা কাজ করে যাচ্ছে তিনি। এই কাজের জন্য কারো কাছে টাকা-পয়সা নেন না তিনি। সরেজমিনে দেখা যায়, খালপাড় ব্রিজের উত্তর পাশে হাতে ছোট লাঠি নিয়ে যানবাহন নিয়ন্ত্রণ করছেন লাকী আক্তার। আবার কখন ওপরে দাঁড়িয়ে হাতের ইশারায় যানবাহনের নিয়ন্ত্রণ কাজের নিয়জিত রয়েছেন তিনি।

যানবাহন চালকরা জানান, ট্রাফিক পুলিশের সদস্য কম হওয়ায় অনেক সময় ট্রাফিক পুলিশদের ঠিকমতো দেখা যায় না। কিন্তু ওই লাকীকে প্রতিদিনই নিরলসভাবে কাজ করতে দেখা যায়। তার এই কাজের জন্য খালপাড় ব্রিজ এলাকায় ছোটখাটো দুর্ঘটনা এবং যানজট অনেকটাই কমে গেছে। লাকীর স্বেচ্ছাশ্রমে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি অনেক কমেছে।

খালপাড় ব্রিজ এলাকার একাধিক ট্রাফিক পুলিশের সদস্যরা জানান, লাকীকে কখনো বিশ্রাম নিতে এবং খাওয়া-দাওয়া করতে দেখা যায় না। কখন ব্রিজের এপার আবার কখন ওপারে সারাক্ষণ হাতে লাঠি নিয়ে হাতের ইশারায় যানবাহন নিয়ন্ত্রণে ব্যস্ত থাকেন তিনি। কাজের সময় কথাও বলেন কম এবং কেউ কিছু জিজ্ঞেস করলে ঠিকমতো উত্তরও দেয় না। তারা আরো বলেন, আমরা সুস্থ মানুষ হয়েও সারা দিন কাজ করতে পারি না কিন্তু লাকী মানসিক রোগী হয়েও সারা দিন নিরলসভাবে কাজ করে।

মানিকগঞ্জ ট্রাফিক বিভাগের ইন্সপেক্টর (প্রশাসন) ফারুক হোসেন জানান, লাকী আক্তার একজন প্রশিক্ষিত ট্রাফিক পুলিশের লোকের মতোই ট্রাফিক সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। এই কাজের বিনিময়ে লাকী কখনো টাকা-পয়সা নেন না।

তবে দায়িত্ব থাকা ট্রাফিক পুলিশ সদস্য মাঝে মধ্যে তাকে খাবার দেয়। তিনি মনে করেন লাকী কিছুটা মানসিক ভারসাম্যহীন। তা না হলে বেতন-ভাতা ছাড়াই তিনি এভাবে কাজ করবেন কেন।

জানা যায়, লাকী আক্তারের বাড়ি মানিকগঞ্জ জেলার ঘিওর উপজেলার কুস্তা গ্রামে। তার বাবা তফিজ উদ্দিন শিকদার পুলিশ সদস্য ছিলেন। চার ভাই-বোনের মধ্যে লাকী হলেন সবার ছোট। লাকী যখন ছোট তখন বাবা-মা দুজনেই মারা যায় এবং বিয়ের ৯ মাসের মাথায় লাকীর স্বামী সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান। তাদের যে বাড়ি-ঘর ছিল ধলেশ্বরী নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। এরপর থেকেই লাকী কিছুটা মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে। স্থানীয়দের ধারণা বাবার প্রতি ভালোবাসা এবং পুলিশের প্রতি শ্রদ্ধা ও দুর্ঘটনায় স্বামীর মৃত্যুর কথা ভেবে লাকী সড়কে স্বেচ্ছাশ্রম দিচ্ছেন।

লাকীর ফুফাত বোন হাজেরা বেগম জানান, লাকীর বাড়ি-ঘর না থাকায় মানিকগঞ্জের তৎকালীন পুলিশ সুপার মাহফুজুর রহমান তাকে একটি টিনের ঘর তুলে দিয়েছেন। এরপর সেখানেই বসবাস করেন লাকী। প্রতিদিন ফজরের আজানের সময় মানিকগঞ্জের উদ্দেশে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায় লাকী। অনেক চেষ্টার পর কথা হয় লাকী আক্তারের সঙ্গে। তিনি জানান, কেউ তাকে ট্রাফিকের এই কাজ দেয়নি। তিনি নিজেই এ কাজ নিয়েছেন। তিনি মনে করেন এটা তার চাকরি। তিনি আরো জানান, সকালে বাড়ি থেকে চিড়া বা মুড়ি নিয়ে আসি এবং সন্ধ্যায় বাড়ি গিয়ে রান্না করে খাই।

"