নৈশপ্রহরী জহুর আলীর আক্ষেপ

ভুলে গেছি রাতের ঘুম : মুখ দেখেই খারাপ লোক চিনতে পারি

প্রকাশ : ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০০:০০

রাকিবুল রাকিব, (গৌরীপুর ময়মনসিংহ)

‘ছোটবেলায় মা-বাপ মইর‌্যা গেছে। লেহাপড়া কিছ্ইু করি নাই। মাইনষ্যের বাড়িত কাইজ-কাম কইর‌্যা বড় অইছি। অহন বয়স অইছে। গায়ে গতরে আগের মতো খাটতে পারি না। কিন্তু ঘরে বইয়্যা থাকলে খাওয়াইবো কেডা?। হেরলেইগ্যা ৭ বৎসর আগে নাইটগার্ডের (নৈশপ্রহরী) চাকরি লইছি। তহন থেইক্যা আমার রাইতের ঘুম হারাম। একলা একলা সজাগ থাইক্যা শহর পাহাড়া দেই। তয় আল্লার রহমতে এই ৭ বৎসরে আমারে কিনু বালা-মুছিবতে পায় নাই। তবে মনে কষ্টÑ রাতের ঘুম কারে কয়, তা ভুলে গেছি। তবে মুখ দেখেই চিনতে পারি খারাপ মানুষ।’ প্রতিদিনের সংবাদের সঙ্গে কথাগুলো বলছিলেন গৌরীপুর পৌর শহরের ‘নৈশপ্রহরী’ জহুর আলী (৬৬)। তার বাড়ি পৌর শহরের গাওগৌরীপুর মহল্লায়। বাবার নাম বাবর আলী।

সম্প্রতি রাত ১২টায় জহুর আলীর দেখা হয় পৌর শহরের মধ্যবাজার এলাকায়। তার পড়নে খাকি প্যান্ট-শার্ট। গায়ে জড়ানো ময়লা ওয়েস্ট কোর্ট। মুখ মাফলারে বাধা। এক হাতে বর্শা ও আরেক হাতে টর্চ লাইট। সড়কের একমাথা থেকে আরেক মাথায় আসা যাওয়া করছেন। অপরিচিত কাউকে দেখলেই টর্চ মেরে গতিরোধ করে নাম পরিচয় জানতে চাইছেন তিনি।

সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে জহুর আলীর সঙ্গে কথা হয় এ প্রতিবেদকের। তিনি বলেন, নাইটগার্ডের চাকরি অত সহজ না। মেলা মাইনষ্যের জান-মাল দেইখ্যা-হুইন্যা রাখতে হয়। লোকজন আমার ওপরে বিশ্বাস কইর‌্যা দোকান-ঘরে মালামাল রাইখ্যা ঘুমাইতে যায়। আমি জানবাজি রাইখ্যা পাহারা দেই। রাইতের বেলায় কত কিছিমের মানুষ রাস্তা-দিয়া আনাগোনা করে। তয় আমরা চেহারা দেখলেই কইতারি কে চোর আর কে ভদ্রলোক।

জহুরের স্ত্রী ও তিন ছেলে রয়েছে। এর মধ্যে বড় দুই ছেলে ইজিবাইক চালায়। ছোট ছেলে মাদ্রাসাতে পড়ে। প্রতিদিন রাত ১০টা থেকে ভোর ৬টা পর্যন্ত পৌর শহরের মধ্যবাজার, সিনেমা হল রোড, গোবিন্দবাড়ি সড়ক ও হারুন পার্ক এলাকায় নৈশপ্রহরীর দায়িত্ব পালন করেন জহুর। অন্ধকার রাতে তিনি একা একা সড়কের অলিগলি দিয়ে ঘুরলেও ভয়ডর তাকে স্পর্শ করে না। তবে মাস তিনি যে ৪ হাজার টাকা বেতন পান সেটা দিয়ে সংসার ও ছোট ছেলের পড়াশোনার খরচ চালাতে তার কষ্ট হয়।

জহুর আলী বলেন, ‘৭ বৎসর চাকরি কইরাও বেতন বাড়ল না। আমরার কাছে অহন চইত-কার্তি বারো মাসই হমান। মেঘের মইধ্যে বৃষ্টিত ভিইজ্যা, শীতের মইধ্যে কুয়াশাত ভিইজ্যা পাহারা দেই। কয়দিন কমান্ডার সাবরে কইলাম রাইতে মেলা শীত পড়ে, আমরারে একটা কইরা কম্বল দেইন। কমান্ডার সাব কয়-কম্বল দিলে ঝামেলা আছে, পরে আর ঠিকঠাক পাহারা দিবার পারবা না। অহন শীত লাগলে কাগজ টুকাইয়্যা আগুন জ্বালাইয়্যা শইল গরম করি।’

এরই মাঝে ঘড়ির কাঁটায় রাত সাড়ে ১২টা বেজেছে। জনশূন্য হয়ে গেছে শহরের সড়কগুলো। এমন সময় মধ্যবাজার সড়কের মরিচ মহলে লুঙ্গি পরিহিত এক যুবককে দেখে তার গতিরোধ করে জহুর। মুখে টর্চ মেরে ধমকের সুরে জিজ্ঞাস করে ‘অই তোমার বাড়ি কই, রাইতের বেলা এনো ঘুরাঘুরি করতাছ কে? জহুরের কথায় থমকে গিয়ে ওই যুবক বলেন, আরে ভাই আমার বাড়ি কোনাপাড়া। গাড়িত কইর‌্যা মাল আনছি, নামানির জায়গা খুঁজতাছিলাম।’

 

"