সড়কে থামছে না প্রাণহানির মিছিল

প্রকাশ : ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০০:০০

জিয়াউল হক ইমন, চট্টগ্রাম
ama ami

সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে মামলা, জরিমানা, কারাদন্ড দিয়েও থামানো যাচ্ছে না সড়কে প্রাণহানির মিছিল। চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ ও বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) চেষ্টা করছে এ প্রাণহানি থামাতে। গত ২৬ দিনে চট্টগ্রাম মহানগরীসহ এর আশপাশের এলাকায় ৩৪টি সড়ক দুর্ঘটনায় ১৬ জন নিহত এবং ৩৯ জন গুরুতর আহত হয়েছে। হতাহতদের মধ্যে রয়েছেন ডাক্তার, বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রী, কলেজছাত্রী, স্কুলছাত্র, বৃদ্ধ, যাত্রী, পথচারী, যানবাহন চালক ও শ্রমিক এবং সরকারি কর্মচারী।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নুসরাত চৌধুরী নিশাত, সিটি কলেজের শিক্ষার্থী সোমা বড়ুয়া, কলেজিয়েট স্কুলের শিক্ষার্থী কাজী মাহমুদর রহমানও শিক্ষানবিশ চিকিৎসক জোবাইদুল হক নিহতের পর জোরালো হয় গণপরিবহনের এই প্রাণঘাতী নৈরাজ্য বন্ধের দাবি। পরিবহন সংশ্লিষ্টরাও স্বীকার করছেন এ অনিয়ম আর বিশৃঙ্খলার কথা। তাই সমন্বিতভাবে এ খাতে শৃঙ্খলা ফেরানোর তাগিদ তাদেরও। সড়কে মৃত্যুর মিছিল থামাতে সম্প্রতি ছাত্রদের আন্দোলনের প্রতি সম্মান দেখিয়ে পরিবহন আইন পাস করেছে সরকার। নগর ও জেলা পুলিশ নানামুখী তৎপরতা, পরিবহন আইন পাসের পরও সড়কে থামছে না মৃত্যুর সারি।

সর্বশেষ গত ৩ ফেব্রুয়ারি সকালে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কে পটিয়া উপজেলার ভাইয়ার দীঘির পাড়ে বাস ও মাইক্রোবাসের সংঘর্ষে চারজনের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছে আরো ১৬ জন। গত ৮ জানুয়ারি মঙ্গলবার দিবাগত রাতে নগরীর ইপিজেড মোড়ে লরির নিচে চাপা পড়ে বরগুনা জেলার রাজু মিয়াসহ (৪০) সিএনজি চালিত অটোরিকশার দুই যাত্রী নিহত হয়েছে। গত ১৬ জানুয়ারি সকাল ১০টার দিকে নগরীর কোতোয়ালি মোড়ে কাভার্ড ভ্যান চাপায় সরকারি সিটি কলেজের উচ্চমাধ্যমিকের শিক্ষার্থী সোমা বড়ুয়া (১৮) নিহত হয়েছে। গত ২১ জানুয়ারি সকালে পরীক্ষা দিতে বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার পথে ভাটিয়ারি এলাকায় সড়ক দুর্ঘটনায় আহত চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নুসরাত চৌধুরী নিশাত (২৩) চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউতে ১২ দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়ে গত শনিবার

মারা যান। গত ২২ জানুয়ারি সকাল ৯টার দিকে নগরীর ধনিয়ালাপাড়া এলাকায় সিএনজি অটোরিকশা ও টেম্পোর মুখোমুখি সংঘর্ষে কাজী মাহমুদুর রহমান (১৪) নামে কলেজিয়েট স্কুলের এক শিক্ষার্থী নিহত হয়েছে।

গত ২৩ জানুয়ারি সাতকানিয়ায় চট্টগ্রাম-কক্সবাজার সড়কে মোটরসাইকেলে হানিফ পরিবহনের একটি বাসের ধাক্কায় নিহত হয়েছেন জোবাইদুল হক ফাহাদ (৩৫) নামে কক্সবাজারের কুতুপালং রোহিঙ্গা শিবিরে চিকিৎসাসেবায় নিয়োজিত এক শিক্ষানবিশ চিকিৎসক। গত ২৯ জানুয়ারি দিবাগত রাত সাড়ে ১০টার দিকে চন্দনাইশের দেওয়াহাট এলাকায় চট্টগ্রামে-কক্সবাজার মহাসড়কে ট্রাকের ধাক্কায় নিহত হন মোটরসাইকেল আরোহী চট্টগ্রাম হাজি মুহাম্মদ মহসিন কলেজের শিক্ষার্থী সাইফুল ইসলাম (২২) ও হামিদ হাসান (২১)।

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ বিভিন্ন চিকিৎসা কেন্দ্রের চিকিৎসক ও চিকিৎসা কর্মীদের মতে, চট্টগ্রামে সড়ক দুর্ঘটনা বাড়ছে। কারণ সড়ক দুর্ঘটনার সব খবর সংবাদমাধ্যমে কিংবা পুলিশের নজরে যায় না। ভয়াবহ দুর্ঘটনাগুলোই কেবল খবর হয় এবং পুলিশের মামলায় আসে। তারা জানান, প্রতিদিনই সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানি তো ঘটছেই, তদুপরি বহু মানুষ পঙ্গুত্ববরণ করছে।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) হিসাবে দেশে যানবাহনের সংখ্যা প্রায় ৩৩ লাখ। এর মধ্যে চালকের লাইসেন্স আছে ১৮ লাখ। বাকি ১৫ লাখ যানবাহন চলছে লাইসেন্সবিহীন চালক দিয়ে।

বিআরটিএ চট্টগ্রাম সার্কেলের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারিতে সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে ভ্রাম্যমাণ আদালতের সমন্বিতভাবে জরিমানা করেছেন ১৮ লাখ ৮০ হাজার ২০০ টাকা, মামলা হয়েছে ৯৬৫টি, কাগজপত্র জব্দ করেছে ৯৯টির গাড়ির ও ডাম্পিং পাঠিয়েছে ১১টি গাড়ি।

বিআরটিএ চট্টগ্রাম সার্কেলের উপপরিচালক মো. শহীদুল্লাহ জানান, সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে তিনজন ম্যাজিস্ট্রেট দিয়ে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা কার্যক্রম চলছে। সরকারের সব সংস্থাসহ সংশ্লিষ্ট সবাই একযোগে কাজ করলে সড়কে শৃঙ্খলা ফিরে আসবে।

নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) চট্টগ্রাম মহানগরী কমিটির সাধারণ সম্পাদক শফিক আহমেদ সাজীব প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, নগরী এবং নগরীর বাইরে মহাসড়কে অনাকাক্সিক্ষতভাবে সড়ক দুর্ঘটনা বাড়ছে। যাত্রী, চালক এবং পথচারীÑ এ তিনই হচ্ছে ট্রাফিক ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ স্টকহোল্ডার। এই তিন শ্রেণি যত দিন সচেতন হবে না; তত দিন সড়ক দুর্ঘটনা বন্ধ করা সম্ভব নয় বলে মনে করেন তিনি।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের (আঞ্চলিক কমিটি) সভাপতি মোহাম্মদ মুছা বলেন, ‘সড়ক দুর্ঘটনা রোধে মালিক, শ্রমিক ও যাত্রী সবাইকে সচেতন হতে হবে। শুধু ড্রাইভারের ওপর দোষ চাপিয়ে, শাস্তি দিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। নিজ নিজ ক্ষেত্রে সবাইকে সচেতন হতে হবে। তাহলে হয়তো সড়ক দুর্ঘটনা রোধ সম্ভব।’

চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কমিশনার ও অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) কুসুম দেওয়ান প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, সড়ক দুর্ঘটনা বা গাড়ি চাপা দিয়ে হত্যার ঘটনায় এখন সরাসরি হত্যা মামলা হচ্ছে। সহজেই আসামিরা পার পেয়ে যাওয়ার দিন শেষ। পাশাপাশি পথচারীকেও রাস্তার নিয়মকানুন মেনে পথ চলতে হবে। জনসাধারণ যদি সড়কে সতর্কভাবে চলাচল করে এবং চালকরা যদি যানবাহন চালনায় সতর্কতা অবলম্বন করে, তাহলে দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব। পাঠ্যবইয়ে ট্রাফিক আইনকানুন নিয়ে কোনো অধ্যায় থাকলে শিক্ষার্থীদের জন্য ভালো হতো।

ভারপ্রাপ্ত কমিশনার বলেন, চালকের পাশাপাশি পথচারী ও যাত্রীদের এবং আইনের আওতায় থাকলে সড়ক দুর্ঘটনা কমত। উদাহরণ দিয়ে বলেন, অনেক সময় যাত্রীরা চালককে গাড়ি দ্রুত চালাতে উৎসাহ জোগায়, অন্যদিকে পথচারীরা অনেক সময় নিয়মবহির্ভূতভাবে চলাফেরা করে। এমনকি মোবাইলে কথা বলতে বলতে রাস্তা পার হয়। আইনে না থাকায় এতে আমরা কিছুই করতে পারি না। সব মিলে সবার সতর্কতাটাই জরুরি বলে মনে করেন তিনি।

বাংলাদেশ যাত্রীকল্যাণ পরিষদের মহাসচিব লুৎফুল আজম প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, সড়কে বেপরোয়া গতি নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলা আনার কোনো চেষ্টা দেখি না। ফলে প্রতিদিন সড়ক দুর্ঘটনায় ও প্রাণহানি প্রতিনিয়ত বাড়ছে।

 

"