জরায়ুমুখ ক্যানসারে বিনামূল্যে পরীক্ষা

শনাক্তের বাইরে ৭০ শতাংশ নারী

প্রকাশ : ২৩ জানুয়ারি ২০১৯, ০০:০০

নিজস্ব প্রতিবেদক
ama ami

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) অনকোলজি বিভাগে চিকিৎসা নিচ্ছেন খায়রুন্নেসা। ৫৯ বছরের নারী বলেন, ‘কী লজ্জার কথা! এমন এক অসুখ হইছে, কারো কাছে কইতেও পারি না। মানুষের লগে আলোচনা করতে পারি না, ডাক্তারের কাছে যামু কী?’ কিন্তু শেষ পর্যন্ত খায়রুন্নেসাকে চিকিৎসকের কাছে আসতে হয়েছে। জরায়ুমুখ ক্যানসারের কারণে শারীরিক সমস্যাগুলো প্রকট হয়েছে তখন ছুটে যেতে বাধ্য হয়েছেন দিনাজপুরের একটি হাসপাতালে। সেখানকার পরামর্শ নিয়ে পরে আসতে হয়েছে বিএসএমএমইউয়ে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, খায়রুন্নেসার মতো সচেতনতার অভাব, পারিবারিক অসহযোগিতা, নারীদের নিজের প্রতি উদাসীনতা, বাল্যবিয়ে, ঘন ঘন সন্তানের জন্মের মতো কারণগুলো নারীকে জরায়ুমুখ ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে ফেলছে। আর চিকিৎসকরা বলছেন, উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিসের মতো অসুস্থতাগুলো যেমন আমরা নিয়মিত চেকআপের আওতায় রাখি, জরায়ুমুখ ক্যানসার ও স্তন ক্যানসারের মতো রোগগুলোও তেমনই আমলে নিতে হবে। এসব রোগের নিয়মিত পরীক্ষা করতে হবে। আর এজন্য পরিবারের সদস্যসহ বাকি সবাইকেও এগিয়ে আসতে হবে।

চিকিৎসকরা জানালেন, পাঁচ বছর পরপর ভায়া টেস্ট (ভিআইএ, জরায়ু মুখ ক্যানসার পরীক্ষা) করাতে হবে। ভায়া টেস্ট পজিটিভ হলে সে অনুযায়ী চিকিৎসা এবং নেগেটিভ হলে পাঁচ বছর পর আবার ভায়া টেস্ট করাতে হবে। আর এই পরীক্ষা সারা দেশেই করার সুযোগ আছে বিনামূল্যে।

বিএসএমএমইউয়ের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৮ সালে দেশে জরায়ুমুখ ক্যানসারে আক্রান্ত নারীর সংখ্যা ছিল ৮ হাজার ৮৬ জন। এই ক্যানসারে মারা গিয়েছেন ৫ হাজার ২১৪ জন। সে হিসাবে জরায়ুমুখ ক্যানসারে প্রতিদিন মারা যাচ্ছেন ১৫ জন করে।

ক্যানসার গবেষণার আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিবেদন ‘গ্লোবোক্যান-২০১৮’ অনুযায়ী, প্রতি বছর ৮ হাজার নারী নতুন করে আক্রান্ত হচ্ছেন জরায়ুমুখ ক্যানসারে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের প্রায় ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ নারী রয়ে গেছেন শনাক্তের বাইরে এবং শনাক্তের আগেই আক্রান্ত প্রায় অর্ধেক নারী মৃত্যুর শিকার হচ্ছেন।

জানা গেছে, মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, জেলা সদর হাসপাতাল, নির্বাচিত উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্র এবং মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রসহ দেশের মোট ৪৩১টি স্বাস্থ্য কেন্দ্রে জরায়ুমুখ ক্যানসার ও স্তন ক্যানসার নির্ণয় করার সুযোগ আছে। আর এসব পরীক্ষা করা যায় বিনামূল্যেই। অথচ এই সেবার কথা তৃণমূল পর্যায়ে না জানা ও সচেতনতার অভাবে নারীরা এ সুযোগ থেকে বঞ্চিত। তারা থেকে যাচ্ছেন রোগ শনাক্তকরণের বাইরে।

জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের সহযোগী অধ্যাপক ডা. হাবিবুল্লাহ তালুকদার রাসকীন বলেন, সাধারণত আর্থসামাজিকভাবে প্রান্তিক পর্যায়ে থাকা নারীরা এই ক্যানসারে বেশি আক্রান্ত হয়। এর অন্যতম কারণ অল্প বয়সে বিয়ে, অল্প বয়সে সন্তান ধারণ, বেশি সন্তান নেওয়া, ঘন ঘন সন্তান নেওয়া, ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতার অভাব, তামাকজাতীয় দ্রব্যের ব্যবহার এবং হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাস নামের একটি ভাইরাসের সংক্রমণ।

বিএসএমএমইউ সেন্টার ফর সার্ভিক্যাল অ্যান্ড ব্রেস্ট ক্যানসার স্ক্রিনিং অ্যান্ড ট্রেনিংয়ের প্রকল্প পরিচালক অধ্যাপক ডা. আশরাফুন্নেসা বলেন, ‘এই ক্যানসার সাধারণত ৩০ বছর বয়সের আগে হয় না। যার জন্য স্ক্রিনিংটা আমরা শুরু করি ৩০ থেকে।’ নারীরা ঠিকমতো চেকআপ করান না মন্তব্য করে বিশেষজ্ঞ এই চিকিৎসক বলেন, ‘যদি তারা নিয়মিত চেকআপ করাতেন তাহলে ৩০ থেকে ৬০ বছর বয়সের মধ্যে তাদের ক্যানসার পূর্ববতী অবস্থা নির্ণয় করা যায় এবং সে অনুযায়ী চিকিৎসাও শুরু করা যায়।’

সব নারীকে স্ক্রিনিংয়ের আওতায় আনা গেলে জরায়ুমুখ ক্যানসার অবলুপ্ত করা যেত জানিয়ে ডা. আশরাফুন্নেসা বলেন, মানুষ এখনো জানে না সরকারি হাসপাতালগুলোতে এই সেবা রয়েছে, যেখান থেকে তারা বিনামূল্যে পরীক্ষা করাতে পারে। তাই মানুষের কাছে এ বার্তা পৌঁছে দিতে হবে। একইসঙ্গে রোগী ও তার পরিবারের সদস্যদের জন্য কাউন্সিলিংটাও সমান জরুরি বলে জানান এই চিকিৎসক।

বিএসএমএমইউ গাইনি ক্যানসার বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. সাবেরা খাতুন বলেন, এইচপিভি টিকা গ্রহণ ও নিয়মিত স্ক্রিনিংয়ের মাধ্যমে এই ক্যানসারকে অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব।

"