মাসের পর মাস শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন বাকি

দুর্নীতিতে ডুবছে কুষ্টিয়ার ‘রেনউইক ও যজ্ঞেশ্বর’

প্রকাশ : ১৮ জানুয়ারি ২০১৯, ০০:০০

কুষ্টিয়া প্রতিনিধি
ama ami

মাসের পর মাস শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন হয় না। পরিবার-পরিজন নিয়ে অভাব-অনাটনে মানবেতর জীবন-যাপন করতে বাধ্য হচ্ছেন তারা। অন্যদিকে চিনিকলগুলোর কাছে কোটি কোটি টাকা বকেয়া পাওনা আদায় হচ্ছে না বছরের পর বছর। সেই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলছে লাগামহীন দুর্নীতি আর অনিয়ম। এই অবস্থায় ডুবতে বসেছে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান কুষ্টিয়ার রেনউইক, যজ্ঞেশ্বর অ্যান্ড কোং (বিডি) লিমিটেড। দেশের চিনিকলগুলোর নতুন যন্ত্রাংশ তৈরি ও মেরামতের একমাত্র এই প্রতিষ্ঠানটির রুগ্ণ অবস্থা থেকে বের হয়ে আসতে পারছে না কিছুতেই। রেনউইক, যজ্ঞেশ্বর অ্যান্ড কোং বিডি লিমিটেডের দুর্নীতি ও অনিয়মের বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আল ওয়াদুদ আমিন বলেন, আমি মাত্র এক মাস হলো এখানে যোগদান করেছি। আগে কী হয়েছে এটা আমি এই মুহূর্তে বলতে পারছি না। সূত্র জানায়, ১৮৮১ সালে ৩৭ একর জায়গা নিয়ে গড়ে তোলা হয় কুষ্টিয়ার রেনউইক, যজ্ঞেশ্বর অ্যান্ড কোং (বিডি) লিমিটেড নামক রাষ্ট্রায়ত্ত এই প্রতিষ্ঠানটি। শুরুর দিকে প্রতিষ্ঠানটি বেশ লাভজনক অবস্থানে থাকলেও বর্তমানে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের লাগামহীন দুর্নীতি ও অনিয়মের কারণে প্রতিষ্ঠানটি মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে ব্যর্থ হচ্ছে। অনিয়ম ও দুর্নীতির প্রভাব যে কতটা ভয়াবহ হতে পারে তা এই প্রতিষ্ঠানে পা না দিলে বোঝা যাবে না। প্রায় ১৫ বছর ধরে রেনউইক, যজ্ঞেশ্বর অ্যান্ড কোং চিনিকলগুলোর কাছ থেকে ২৬ হাজার টাকা টন হিসেবে স্ক্র্যাব ক্রয় করত। কিন্তু গত বছরের নভেম্বর মাসে রেনউইক, যজ্ঞেশ্বর অ্যান্ড কোং কর্তৃপক্ষ এর জন্য দরপত্র আহ্বান করে আজম অ্যান্ড সন্স নামের রাজশাহীর একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ২৬ হাজার টাকা টনের পরিবর্তে ৫১ হাজার টাকা টন হিসেবে স্ক্র্যাব ক্রয় করছে। এই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে প্রায় ৩০০ টন স্ক্র্যাব নেওয়া হয়েছে। ৫১ হাজার টাকা টন হিসেবে যার মূল্য দাঁড়ায় ১ কোটি ৫৩ লাখ টাকা। আগের মতো চিনিকলগুলোর কাছ থেকে স্ক্র্যাব ক্রয় করা হলে ব্যয় হত মাত্র ৮৭ লাখ টাকা। ৬৬ লাখ টাকা বেশি দর দিয়ে এই স্ক্র্যাব কেনার নেপথ্যে প্রতিষ্ঠানটির একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট কাজ করেছে বলে জানা গেছে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগসাজশে এভাবে সরকারি টাকা লুটপাট করে খাচ্ছে ওই সিন্ডিকেট। গত বছর এই প্রতিষ্ঠানটির একটি অংশ বিনোদন পার্ক হিসেবে গড়ে তোলা হয়। বালি দিয়ে কিছু জায়গা ভরাট করে বসার কয়েকটি ছাউনি বসিয়ে এই পার্কের পেছনে প্রায় এক কোটি টাকা খরচ করা দেখানো হয়েছে। দর্শনার্থীদের কাছ থেকে ১০ টাকা নিয়ে পার্কে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হচ্ছে। তবে চলতি বছরের জানুয়ারি মাস থেকে পার্কের প্রবেশ মূল্য ১০ টাকা থেকে বাড়িয়ে করা হয়েছে ২০ টাকা। চিনিকলগুলোর কাছে নতুন ও পুরাতন যন্ত্রাংশ সরবরাহ করে থাকে এই প্রতিষ্ঠানটি। সম্পূর্ণ বাকিতে চিনিকলগুলোর কাছে যন্ত্রাংশ বিক্রি করে আসছে এই প্রতিষ্ঠানটি। এমনকি শুধু বাকিতে যন্ত্রাংশ বিক্রিই নয়; যন্ত্রাংশ বিক্রির ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক ভ্যাটের টাকাও নিজেরাই প্রদান করছে রেনউইক, যজ্ঞেশ্বর অ্যান্ড কোং কর্তৃপক্ষ। গত বছর দেশের সব চিনিকলগুলোর কাছে অত্র প্রতিষ্ঠানের বকেয়া পাওনা ছিল ৩৪ কোটি ৫৫ লাখ টাকা। আর এ বছর তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৩ কোটি ১ লাখ টাকা। বছরের পর বছর চিনিকলগুলোর কাছে কোটি কোটি টাকা এভাবে বকেয়া পাওনা পড়ে থাকলেও এ নিয়ে কর্তৃপক্ষের কোনো মাথাব্যথা নেই। সম্প্রতি ছয়জনকে সিকিউরিটি গার্ড হিসেবে নিয়োগ প্রদান করা হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, এই সিকিউরিটি গার্ড নিয়োগের ক্ষেত্রেও ৫০ থেকে ১ লাখ টাকা করে ঘুষ নেওয়া হয়েছে। সরেজমিন অনুসন্ধানকালে জানা যায়, এই প্রতিষ্ঠানের দুর্নীতি-অনিয়মের যে সিন্ডিকেট রয়েছে সেই সিন্ডিকেটের অন্যতম হচ্ছেন অর্থ ব্যবস্থাপক আলমগীর হোসেন যিনি প্রায় ৩ বছর ধরে এই প্রতিষ্ঠানে কর্মরত রয়েছেন এবং অন্যজন হচ্ছেন হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা পার্থ প্রতীম সাহা যিনি কর্মরত রয়েছেন প্রায় ১০ বছর। অনিয়ম-দুর্নীতির বিষয়ে কেউ টু শব্দ করলে তাকে সঙ্গে সঙ্গে অন্যত্র বদলি করা হয়। প্রতিবাদ করায় গত বছরের জুলাই মাসে রেনউইক যজ্ঞেশ্বর শ্রমজীবী ইউনিয়নের সাবেক সহ-সভাপতি হাসান আলীকে কুষ্টিয়া চিনিকলে বদলি করে দেওয়া হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির ৫১ ভাগ শেয়ার সরকারের হাতে বাকি ৪৯ ভাগ শেয়ার পাবলিকের হাতে। কিন্তু আশ্চার্য হওয়ার মতো বিষয় হচ্ছে এই ৪৯ ভাগ শেয়ারহোল্ডারদের মধ্যে কোনো প্রতিনিধিকে পরিচালক করা হয় না। যে দুজনকে পাবলিক প্রতিনিধি দেখানো হয়েছে তাদের কোনো পাবলিক শেয়ার নেই। নিজেদের স্বার্থে পছন্দের দুজনকে পাবলিক প্রতিনিধি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। পাবলিক কোনো প্রতিনিধি পরিচালক না থাকায় শেয়ারহোল্ডারদের সুবিধা-অসুবিধা তুলে ধরা সম্ভব হচ্ছে না। যে কারণে সরকারি লোকজন ইচ্ছা মত প্রতিষ্ঠানটি পরিচালনা করায় অনিয়ম-দুর্নীতি ও স্বেচ্ছাচারিতা এখানে নিয়মে পরিণত হয়েছে। প্রতিষ্ঠানে কর্মরত প্রায় ২০০ শ্রমিক-কর্মচারীর বেতন বকেয়া পড়ে থাকায় পরিবার-পরিজন নিয়ে তারা বর্তমানে মানবেতর জীবন-যাপন করে আসছেন। প্রায় তিন মাসের বেতন বকেয়া রয়েছে শ্রমিক-কর্মচারীদের।

"