উখিয়া ক্যাম্পের রোহিঙ্গারা ২০ হাজার দোকান মালিক

প্রকাশ : ১২ জানুয়ারি ২০১৯, ০০:০০

উখিয়া প্রতিনিধি

কক্সবাজারের উখিয়া টেকনাফে ৩০ ক্যাম্পে অবস্থানকারী রোহিঙ্গারা ক্যাম্পের ভেতরে ও বাইরে বিপুলসংখ্যক দোকানপাট গড়ে উঠেছে। এর সংখ্যা ২০ হাজার ছাড়িয়ে যাবে। এসব দোকান পরিচালনা করছে রোহিঙ্গারা। নিয়ম না থাকলেও তারা দোকান গড়ে তুলে জেকে বসছে ব্যবসা-বাণিজ্যে। একদিকে সরকারি-বেসরকারি অনুদান, অপরদিকে দোকানপাট গড়ে তোলা ব্যবসায় বিপুল টাকার মালিক হয়ে যাচ্ছেন তারা। এভাবে তাদের ভেতরে বাংলাদেশে স্থায়ীভাবে বসবাস করার একটি প্রবণতা তৈরি হয়ে যাচ্ছে। এসব অর্জিত অর্থ দেশের স্বার্থবিরোধী কাজে ব্যয় হওয়ার আশঙ্কা করছে স্থানীয়রা। অপরদিকে, রোহিঙ্গাদের অবারিত ব্যবসা-বাণিজ্যের সুযোগে মারাত্মকভাবে বঞ্চিত হচ্ছেন স্থানীয়রা। ক্যাম্প ইনচার্জসহ সংশ্লিষ্টদের অভিমত, স্থানীয় প্রভাবশালীরা অবকাঠামো তৈরি করে দিচ্ছে। সেখানে রোহিঙ্গারা দোকান করছে আর প্রভাবশালীরা নিয়মিত ইজারার নামে চাঁদাবাজি করে চলেছে।

উখিয়ার বালুখালী বি-৯নং পান বাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বড় আকারের দোকানের ব্যবসা করছে রোহিঙ্গা আবদুস সবুর (৫০)। বর্তমানে তার দোকানে অন্তত এক লাখ টাকার মালামাল আছে। সেখানে নিত্যপ্রয়োজনীয় প্রায় সব ধরনের পণ্য পাওয়া যাচ্ছে। তার সঙ্গে মোবাইলে কথা বলে জানা যায়, প্রায় পাঁচ মাস আগে থেকে দোকান করছে দৈনিক ৩০ হাজার টাকার বেশি বিক্রি হয়, এর মধ্যে লাভ থাকে। আর ক্যাম্পের বিভিন্ন বাসা-বাড়ি বা এজেন্ট থেকে মালামাল সংগ্রহ করেন। আবার কক্সবাজারসহ অনেক জায়গা থেকে গ্রাহক আসে মালামাল নিতে। তারা আমাদের কাছ থেকে বিভিন্ন মালামাল সংগ্রহ করে একটু বাড়তি দামে বাইরে গিয়ে বিক্রি করে। তিনি বলেন, আমাদের ক্যাম্পে অন্তত এক হাজার দোকান বসেছে। এর মধ্যে সবাই রোহিঙ্গা। কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ডি-ব্লকের রোহিঙ্গা দোকানদার মোস্তাক আহমদ বলেন, এখানে কয়েক শত দোকান আছে। আমরা বার্মা থাকতেও দোকান করতাম, এখানে এসে প্রথমে কয়েক মাস ঘরে বসে থাকার পর এখানে দেখছি অনেকে দোকানপাট করছে। পরে ভেবে-চিন্তে অনেক টাকা পুঁজি খাটিয়ে দোকান করেছি। ব্যবসাও বেশ ভালো চলছে।’

তিনি বলেন, ‘আমরা বাংলাদেশে অনেক দিন ধরেই বেশ ভালো আছি। সত্যি কথা বলতে কী বার্মাতেও আমরা এত ভালো ছিলাম না। প্রত্যাবাসন বিষয়ে জানতে চাইলে বলেন, ‘মিয়ানমারে যতদিন আমাদের ঘরবাড়িসহ ফেরত দেওয়া না হবে, ততদিন যাব না। বালুখালী ৯নং ব্লকে কর্মরত মরিয়ম আক্তার নুপুর বলেন, আমাদের ক্যাম্পে পথে-ঘাটে দোকান বসিয়েছে রোহিঙ্গারা। এর ফলে ঠিকমতো হাঁটাও যায় না। আর বর্তমানে রোহিঙ্গাদের সঙ্গে কথা বলাও যায় না, তারা এখন স্থানীয়দের চেয়ে প্রভাবশালী।

এদিকে স্থানীয় প্রভাবশালী ফজলুল কাদের ভুট্টু নামের এক সাবেক মেম্বারসহ আরো অনেক প্রভাবশালী রোহিঙ্গাদের দোকান করতে দিয়ে নিয়মিত ইজারা আদায় করছে এমনকি দৈনিক ৪০ হাজার টাকাও হাসিল নেয় বলে জানা যায়।

এদিকে উখিয়ার পালংখালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এম গফুর উদ্দিন চৌধুরী বলেন, রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ইতোমধ্যে কয়েক হাজার দোকান গড়ে উঠেছে। যার সবগুলোর মালিক রোহিঙ্গা। তারা শ্যাম্পু থেকে শুরু করে নখ কাটার মেশিন পর্যন্ত ফ্রি পাচ্ছে। সপ্তাহে একবার চাল, ডাল থেকে শুরু করে সবকিছু পায়। সেগুলো খেতে না পেরে বাইরে বিক্রি করে দেয়। অনেকে বাইরে শ্রমিক হিসেবে কাজ করছে। তাদের এখন টাকার অভাব নেই। তারা চাইলে এখানে হয়তো জমিও কিনতে পারবে। তাদের তুলনায় স্থানীয়রা ভালো নেই বরং এখন তারা কাজ না পেয়ে বেকার হয়ে আছে এবং আমি নিশ্চিত তারা বাংলাদেশ থেকে অর্জিত অর্থ বাংলাদেশের বিরুদ্ধেই খরচ করবে।

টেকনাফ কলেজের অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম বলেন, বাজারের সর্বত্র রোহিঙ্গারা ব্যবসা-বাণিজ্য করছে। পথের দুই পাশে সবখানেই দেখি রোহিঙ্গারাই ব্যবসা করছে। তারা যদি এত বেপরোয়াভাবে নিজের ইচ্ছেমতো সবকিছু করতে পারে তাহলে একদিন সেটা আমাদের জন্য খুবই খারাপ হবে।

উখিয়ার সুজন সভাপতি নূর মোহাম্মদ সিকদার বলেন, আমার জানা মতে ক্যাম্প ইনচার্জের কারণেই ক্যাম্পের ভেতরে সব অনিয়ম হচ্ছে। সেখানে কোনো এনজিও কাজ করতে গেলে আগে তার মন জয় করতে হয়। এ ছাড়া সেখানে বেশির ভাগ দোকান করে রোহিঙ্গারা। সেসব দোকান থেকে মাসোহারা নিচ্ছে একটি প্রভাবশালী গ্রুপ। মূলত প্রশাসনিক ইন্ধন ছাড়া কোনো অনিয়ম সম্ভব না।

উখিয়ার ব্যবসায়ী নুরুল আবছার, নাছির উদ্দিনসহ অনেকে জানান, কোট বাজারসহ অনেক স্টেশনে যতগুলো খুচরা ব্যবসায়ী দেখবেন সব রোহিঙ্গা। এদের কারণে আমাদের ব্যবসা লাটে উঠার অবস্থা। কারণ আমরা গাড়ি ভাড়া দিয়ে কক্সবাজার থেকে মালামাল আনি ওরা ত্রাণের মালামাল সংগ্রহ করে বিক্রি করে।

তিনি আরো বলেন, ‘আমি যতটুকু জানি অনেক রোহিঙ্গা এখন বিপুল টাকার মালিক হয়ে গেছে। যার ফলে তারা এখন বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে স্থানীয় গরিব নারীদের বিয়ে করছে। যাতে আর ফিরে যেতে না হয়। আর প্রত্যাবাসনের কথা মুখে আনা যায় না, ক্যাম্পে আগে স্থানীয় নারী বা পুরুষদের অনেক সম্মান দিত রোহিঙ্গারা। কিন্তু এখন হচ্ছে তার উল্টোটা। তারা স্থানীয়দের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করে। আবার তার প্রতিবাদও করা যায় না।

এ ব্যাপারে কুতুপালং ক্যাম্প ইনচার্জ রেজাউল করিম বলেন, ‘অনেক রোহিঙ্গা এখানে দোকান করছে। এটা সত্যি উদ্বেগজনক। এখন বেশির ভাগ দোকান পরিচালনা করছে রোহিঙ্গারা তবে এসব দোকান বা মার্কেট করে দিয়েছে স্থানীয় প্রভাবশালীরা। তিনি বলেন ইতোমধ্যে এক মেম্বার সরকারি পাহাড় কেটে বড় আকারের মার্কেট করছে সেগুলো রোহিঙ্গাদের ভাড়া দেবে।

এ ব্যাপারে জেলা প্রশাসক মো. কামাল হোসেন বলেন, রোহিঙ্গারা বেশিসংখ্যক হারে দোকান করাটা সমস্যার। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

"