মধুমতির তীরে অবৈধ ইটভাটা নষ্ট হচ্ছে প্রাণবৈচিত্র্য

প্রকাশ : ১১ জানুয়ারি ২০১৯, ০০:০০

কে এম রুবেল, ফরিদপুর
ama ami

ফরিদপুরের বোয়ালমারী উপজেলার সঙ্গে মাগুরার মহম্মদপুর উপজেলার সীমান্ত। এখানে মধুমতি নদীর তীরে গড়ে ওঠেছে কয়েকটি অবৈধ ইটভাটা। কোনো ধরনের নিয়মকানুন এবং পরিবেশ দূষণের তোয়াক্কা না করেই ফসলি জমিতে টিনের তৈরি ড্রাম চিমনি ব্যবহার করে ইট পোড়ানো হচ্ছে এসব ভাটায়। কেটে নেওয়া হচ্ছে কৃষিজমির উপরি ভাগের উর্বর মাটি এবং নদী তীরের মাটি। এসব ইটভাটার পাশে কৃষি জমি, বসতবাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বনাঞ্চল থাকার পরও প্রতিনিয়ত নির্গমন করা হচ্ছে কার্বন-ডাই-অক্সাইড। এতে ঝলসে যাচ্ছে প্রকৃতির সবুজ রূপ। নষ্ট হচ্ছে প্রাণবৈচিত্র্য। সরেজমিন গিয়ে জানা যায়, মধুমতি নদীর পশ্চিম পাড়ে মহম্মদপুর উপজেলার মূল ভূখন্ড। নদীর পূর্ব পাড়ে বোয়ালমারী উপজেলার সঙ্গে রয়েছে মহম্মদপুর উপজেলার রুইজানি ও জাঙ্গালিয়া মৌজার ফসলি জমি। ওই জমিতে রুইজানি মৌজায় মেসার্স নদী ব্রিকস ও এসটিসি ব্রিকস নামে দুটি এবং জাঙ্গালিয়া মৌজায় শরীফ ব্রিকস নামে একটি মোট তিনটি ভাটায় ইট পোড়ানোর কাজ চলছে। এছাড়াও ওই এলাকায় আরো কয়েকটি ভাটা স্থাপনে কাজ শুরু হয়েছে।

ভাটাগুলোতে টিনের তৈরি ড্রাম চিমনি ও কাঠ ব্যবহার করে ইট পোড়ানো হচ্ছে, আর ইট তৈরির মাটি নেওয়া হচ্ছে মধুমতি নদী থেকে। অথচ ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) ২০১৩ এ বলা হয়েছে লাইসেন্স ছাড়া ইটভাটা করা যাবে না। কোনো ব্যক্তি ইট প্রস্তুতে কৃষি জমি কিংবা পাহাড় কেটে মাটি ব্যবহার করতে পারবে না। অনুমতি ছাড়া খাল, পুকুর, নদীরপাড় কিংবা চরাঞ্চল কেটে মাটি সংগ্রহ করতে পারবে না। ওই অঞ্চলের একাধিক বাসিন্দা

জানান, প্রতিদিন এই ইটভাটাগুলোতে ট্রাককে ট্রাক ছোট বড় গাছ পোড়ানো হচ্ছে। তারা জানান, দুই জেলার সীমান্ত হওয়ায় কোনো প্রশাসনই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিচ্ছে না। এতে স্থানীয় বাসিন্দারা রয়েছে স্বাস্থ্যঝুঁকিতে।

স্থানীয় একটি গাড়িচালক আইনাল মোল্লা জানান, মধুমতি নদীর পলি কেটে ভাটা মালিকরা ইট তৈরি করছে, এছাড়া টিনের তৈরি ছোট ড্রাম চিমনি ব্যবহার করায় প্রচুর পরিমাণ কালো ধোয়ার সৃষ্টি হচ্ছে। তিনি বিষয়টি এখনি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থার জন্য সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের কাছে জোড় দাবি করেন।

বোয়ালমারীর বাসিন্দা রাসেল আহমেদ জানান, দুই জেলার সীমান্ত এলাকা হওয়ায় সুবিধা নিচ্ছে অবৈধ ভাটা মালিকরা। তিনি অভিযোগ করে বলেন, মধুমতি নদীর পাড়ে গড়ে উঠা ইটভাটা মালিকদের নেই কোনো সরকারি অনুমোদন, যে কারণে ইচ্ছা-খুশিমতো ছোট বড় গাছ পোড়াতে পারছে। তিনি বলেন, এইভাবে গড়ে ওঠা ইটভাটার কারণে সরকার হারাচ্ছে রাজস্ব।

অবৈধ ইটভাটা স্থাপনের বিষয়ে নদী ব্রিকসের অংশীদার মিনহাজুল ইসলাম জানান, আমরা নতুন শুরু করায় অস্থায়ী ভিত্তিতে ইট পোড়ানোর কাজ করছি। ভবিষ্যতে সব নিয়মকানুন মেনে পরিবেশবান্ধব ভাটা করব। পরিবেশের ক্ষতি ও কাঠ পোড়ানোর অনিয়ম প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমরা বিভিন্ন জায়গা ম্যানেজ করে আপাতত কাজ চালাচ্ছি। ওই ভাটার অপর অংশীদার ফয়সাল আহমেদ মাসুদ বলেন, নিয়ম মেনে ইটভাটা করা খুব কঠিন। তাই আমরা স্থানীয় প্রশাসনকে ম্যানেজ করেই ভাটা চালাচ্ছি।

শরীফ ব্রিকসের অংশীদার শরীফুল ইসলাম জানান, পরিবেশবান্ধব ১২০ ফুট উঁচু চিমনি তৈরি করতে প্রচুর ইটের প্রয়োজন। এজন্য আমরা নিজেদের তৈরি ইট দিয়েই ভবিষ্যতে পরিবেশবান্ধব চিমনি বানাবো। এ মুহূর্তে আমাদের ভাটার কোনো পরিবেশ ছাড়পত্র বা জেলা প্রশাসনের লাইসেন্স নেই। ভবিষ্যতে সব কিছুই পাকা পোক্তভাবে করব।

এসটিসি ব্রিকসের মালিক জাফর মোল্লা জানান, আমাদের কোনো অনুমতি নেই, তবে আগামীতে সরকারের কাছে অনুমতির জন্য আবেদন করব। তিনি বলেন, অটো ভাটা করতে অনেক অর্থের প্রয়োজন, যে কারণে আমরা শুরুতে টিনের তৈরি ড্রাম চিমনি দিয়ে ইট পোড়াচ্ছি। কাট বা গাছ পোড়ানো বিষয়ে বলেন, ড্রাম চিমনিতে কাট বা গাছ ছাড়া ইট পোড়ানো হয় না।

ফরিদপুর জেলা ইটভাটা মালিক সমিতির সহ-সভাপতি, বোয়ালমারীর মেসার্স রাজ ব্রিকসের স্বত্বাধিকারী শ্যামল কুমার সাহা বলেন, বোয়ালমারী উপজেলার সীমান্ত এলাকায় গড়ে ওঠা অবৈধ ইটভাটাগুলোর সঙ্গে আমরা রীতিমতো প্রতিযোগিতায় মার খাচ্ছি। তারা কাঠ দিয়ে ইট পুড়িয়ে পরিবেশের ক্ষতি করছে আর আমরা পরিবেশদূষণ রোধে বেশি ব্যয়ে কয়লা দিয়ে ইট পোড়াচ্ছি। অনুমোদনের বালাই না থাকায় ওই ভাটাগুলো সরকারি কোনো ভ্যাট ট্যাক্স পরিশোধ করতে হচ্ছে না। ফলে তারা আমাদের চেয়ে অনেক কম দামে ইট বিক্রি করতে পারছে।

অবৈধ ইটভাটার বিষয়ে ফরিদপুর চেম্বার অব কমার্সের সিনিয়র সহ-সভাপতি মো. সিদ্দিকুর রহমান জানান, অবৈধ ভাটা স্থাপনের কারণে বৈধ ভাটা মালিকরা ক্ষতিগ্রস্ত হোক এটা কেউ চায় না। তাছাড়া অবৈধ ভাটা মালিকদের তো সরকারি রাজস্ব দিতে হয় না, লাইন্সেস নবায়ন করতে হয় না।

তিনি দাবি করে বলেন, বিষয়টি দুই জেলা প্রশাসনের হস্তক্ষেপে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। তা না হলে বৈধ ব্যবসায়িরা আর্থিক ক্ষতিতে পড়বে।

ফরিদপুরের জেলা প্রশাসক উম্মে সালমা তানজিয়া জানান, ইটভাটার বিষয়ে আমরা জেলা ভাটা মালিকদের সরকারি নির্দেশ জানিয়ে দিয়েছি। তিনি বলেন, পরিবেশর ক্ষতি হয় এমন কোনো কাজে জেলা প্রশাসনের ছাড় নেই।

ফরিদপুর ও মাগুরার সীমান্ত এলাকায় গড়ে ওঠা অবৈধ ভাটার বিষয়ে সরকারি এই কর্মকর্তা বলেন, এ ব্যাপারে পার্শ্ববর্তী মাগুরা জেলা প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে পরিবেশ দূষণ রোধে সর্বোচ্চ পদক্ষেপ নেব।

"