বিশ্বের সব রোহিঙ্গার গন্তব্য যেন বাংলাদেশ

প্রকাশ : ১১ জানুয়ারি ২০১৯, ০০:০০

উখিয়া প্রতিনিধি
ama ami

ভয়াবহ নির্যাতনের মুখে মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা ৭ লক্ষাধিক রোহিঙ্গার বাংলাদেশের আশ্রয় নেওয়ার পাশাপাশি প্রতিবেশী ভারতসহ সৌদি আরব, দুবাই, মালয়েশিয়া ও অস্ট্রেলিয়াতেও আশ্রয় নেয় অল্প সংখ্যক নির্যাতিত। কিন্তু বিশ্বের সবচেয়ে ঘনবসতির দেশ বাংলাদেশে এই বিপুল সংখ্যক নির্যাতিতদের আশ্রয় মিললেও অন্যান্য দেশে আশ্রয় নেওয়া স্বল্প সংখ্যক রোহিঙ্গাদের সম্প্রতি বের করে দেওয়ার ঘটনা ঘটছে। অনেকে পালিয়ে কিংবা বাংলাদেশি পাসপোর্ট যোগাড় করে বাংলাদেশে আসছে। বের করে তাদের দেশের বদলে পাঠানো হচ্ছে বাংলাদেশে। গত মঙ্গলবার সৌদি আরব থেকে ১৩ রোহিঙ্গা নাগরিককে পাঠানো হয়েছে ঢাকায়। এছাড়া ভারত থেকে সীমান্ত ফাঁকি দিয়েও অনেক রোহিঙ্গা ঢুকছে বাংলাদেশে। গত ৪ দিনে উখিয়ার কুতুপালংয়ে ভারত থেকে পালিয়ে আসা ৭৪ জন রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়েছে। মূলত বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে বসবাসকারী সব রোহিঙ্গাদের নিরাপদ গন্তব্য স্থল এখন যেন বাংলাদেশ।

একাধিক বিদেশি গণমাধ্যম সূত্রে জানা গেছে, গত বৃহস্পতিবার ভারতীয় কর্তৃপক্ষ ৫ রোহিঙ্গাকে মিয়ানমারের কাছে হস্তান্তর করেছে। ভারতের মনিপুর সীমান্ত দিয়ে একই পরিবারের মো. আয়াজ, রিয়াজ আলী, আহমদ হোছাইন, তৈয়বা খাতুন ও আজিদা বেগমকে মিয়ানমার ইমিগ্রেশন পুলিশের কাছে সোপর্দ করা হয়েছে। ২০১৪ সালে রাখাইন থেকে ভারত অনুপ্রবেশ কালে তারা আটক হয়ে আসামের তেজপুর জেলে কারাবন্দি ছিল। ওই জেলে আরো ১০ জন রোহিঙ্গা এখনো বন্দি রয়েছে। গত অক্টোবরে ৭ জনের রোহিঙ্গার প্রথম দলটিকে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ মিয়ানমারের কাছে হস্তান্তর করেছিল। তাদের কী অবস্থা তা জানা যায়নি।

জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থাসহ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো এখনো রাখাইনে রোহিঙ্গা ফিরে যাওয়ার মতো অনুকূল পরিবেশ তৈরি হয়নি। তাই রোহিঙ্গাদের জোর করে ফেরত না পাঠানোর অনুরোধ জানানো হয়। তা সত্ত্বেও ভারত দ্বিতীয় দফায় ৫ রোহিঙ্গাকে মিয়ানমার ফেরত পাঠাল। জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থার তালিকাভুক্ত ১৮ হাজারসহ অনিবন্ধিত আরো ২২ হাজারসহ ৪০ হাজারের মতো রোহিঙ্গা ভারতের বিভিন্ন এলাকায় অবস্থান করছে। জাতিসংঘ এসব অসহায় রোহিঙ্গাদের মানবিক সাহায্য সহযোগিতা প্রদানের সুযোগ চাইলেও ভারত তাতে রাজি হচ্ছে না বলে জানা গেছে।

ভারত থেকে রোহিঙ্গাদের জোর করে মিয়ানমার ফেরত পাঠানো, ধরপাকড় করা, আয় রোজগারসহ নানা সমস্যায় পড়া শত শত রোহিঙ্গা দালালের মাধ্যমে গোপনে সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে পালিয়ে আসছে বলে জানা গেছে। গত শনিবার থেকে মঙ্গলবার পর্যন্ত গোপনে সীমান্ত পেরিয়ে ভারত থেকে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা ৭৪ রোহিঙ্গাকে কক্সবাজারের উখিয়ার কুতুপালং আশ্রয় শিবিরে (ট্রানজিট ক্যাম্পে) আশ্রয় দেওয়া হয়েছে বলে কুতুপালং রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবির ইনচার্জ ও সহকারী কমিশনার মো. রেজাউল করিম জানিয়েছেন। এসব রোহিঙ্গাদের অধিকাংশ নারী ও শিশু বলে তিনি জানান। তারা ভারতের জম্মু, কাশ্মীর, দিল্লি, ফরিদাবাদসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে পালিয়ে আসছে বলে খবর পাওয়া গেছে। জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা নিয়ন্ত্রিত কুতুপালং ট্রানজিট ক্যাম্পে কঠোর কড়াকড়ি থাকায় বিভিন্ন দেশ থেকে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি।

খবর নিয়ে জানা গেছে, গত মঙ্গলবার হযরত শাহ জালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে সৌদি আরব কর্তৃপক্ষ ১৩ জন রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠিয়েছে। তারা প্রায় ৫/৭ বছর ধরে সৌদি আরবের বিভিন্ন স্থানে অবস্থান করছিল। সম্প্রতি সৌদি সরকার ভিসা ও আকামার মেয়াদ শেষ হওয়ায় তাদের আটক করে ডিটেনশন কেন্দ্রে রেখেছিল। তারা বিভিন্ন সময় দালালের মাধ্যমে বাংলাদেশি পাসপোর্ট যোগাড় করে সৌদি আরবসহ বিভিন্ন দেশে অভিবাসিত হয়েছিল। এ ধরনের আরো কয়েক শতাধিক রোহিঙ্গা সৌদি আরব থেকে বাংলাদেশে আসার অপেক্ষায় রয়েছে। এছাড়াও মালয়েশিয়াতেও অনেক রোহিঙ্গা জেলে রয়েছে। এদেরও অনেকে দালালের মাধ্যমে বাংলাদেশি পাসপোর্ট যোগাড় করে বাংলাদেশে চলে আসছে বলে খবর পাওয়া গেছে।

তাছাড়া আরব আমিরাত, ইন্দোনেশিয়া, পাকিস্তান, অস্ট্রেলিয়া, কানাডাসহ বিভিন্ন দেশ থেকে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশি পাসপোর্ট নিয়ে তাদের আত্মীয় স্বজনদের কাছে বাংলাদেশে ফেরত আসছে বলে নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে। এসব বিভিন্ন দেশ থেকে ফেরত আসা রোহিঙ্গাদের একটি অংশ কক্সবাজার, বান্দরবান ও চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় তাদের আত্মীয়স্বজনদের কাছে গিয়েও আশ্রয় নিচ্ছে বলে তারা জানান। কুতুপালং এলাকার স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা মো. নুরুল হক খান বলেন, এমনিতে অতিরিক্ত রোহিঙ্গার ভারে উখিয়া ও টেকনাফের জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছে। তার ওপর এখনো মিয়ানমার, ভারতসহ বিভিন্ন দেশ থেকে রোহিঙ্গাদের অনুপ্রবেশ বন্ধ হয়নি। উখিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি অধ্যক্ষ হামিদুল হক চৌধুরী উদ্বেগ প্রকাশ করে জন নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় এনে এ ব্যাপারে সরকারকে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।

"