ঐতিহ্যের সোনারগাঁ : প্রবাসীরা আনছেন আধুনিকতা

প্রকাশ : ১০ জানুয়ারি ২০১৯, ০০:০০

আশরাফুল আলম, সোনারগাঁ (নারায়ণগঞ্জ)

ইতিহাস, ঐতিহ্য ও শিল্প বাণিজ্যে সমৃদ্ধ জনপদ নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে নানা কারণে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে ছিল চরম দরিদ্রতা ও বেকারত্বের অভিশাপ। আদমজী জুট মিলে শ্রমিকের কাজ, কৃষি ও মৎস্য শিকার ছিল এখানকার মানুষের পেশা। সাম্প্রতিক কালে প্রবাসী ও স্থানীয় ব্যবসায়ীরা ধীরে ধীরে বদলে দিয়েছে সোনারগাঁয়ের দৃশ্যপট। মাত্র দেড় যুগ আগেও যেখানে ছিল ৫০ ভাগ মানুষের দুই চালা টিনের ও কুঁড়েঘর। এখন সেখানে প্রায় প্রতিটি গ্রামেই দৃশ্যমান নান্দনিক সব আলিশান দালান কোঠা। বদলে গেছে অর্থনীতি ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন আর এর সবই সম্ভব হয়েছে প্রবাসী বাংলাদেশি ও ব্যবসায়ীদের কারণে। তারা নিজেদের উন্নয়নের পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন জাতীয় অর্থনীতিতে। প্রতি মাসে বিশাল অঙ্কের রেমিট্যান্স পাঠাচ্ছেন প্রবাসীরা। এভাবেই বদলে গেছে সোনারগাঁ উপজেলার ১০টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভার দৃশ্যপট।

আগে যেখানে ছিল ছোট ছোট দুই চালা টিনের কিংবা ছনের তৈরি কুঁড়েঘর। এখন সেখানে গড়ে উঠেছে নান্দনিক সব বহুতল বিশিষ্ট আলিশান পাকা দালান ঘর। আধুনিক জীবন যাত্রার মান উন্নয়নে যাবতীয় সব উপাদানের সমন্বয় ঘটানো হয়েছে ওই সব বহুতলা ভবন নির্মাণে। এই পরিবর্তনের নেপথ্য কারিগর প্রবাসী বাংলাদেশি ও ব্যবসায়ীরা। সোনারগাঁ অঞ্চলে প্রথম ৯০ এর দশক থেকে পুরোপুরি শুরু হয় বিদেশ যাত্রা। বিশেষ করে উপজেলার পিরোজপুর ও শম্ভুপুরা দুটি ইউনিয়নকে মধ্যপ্রাচ্যের সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার, সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়া প্রবাসীরাই বদলে দিয়েছেন। মাত্র ১৫ থেকে ২০ বছরের মধ্যে এসেছে এই অবিশ্বাস্য পরিবর্তন। আগে বিদেশ যেতে ভিসা পাওয়া এত জটিল ছিল না। অভিবাসন ব্যয় ছিল অনেক কম। সেই সময় অনেকে ভিটেমাটি বিক্রি করে ও বিদেশে পাড়ি জমান। পরিবারের কেউ একজন বিদেশ গিয়ে পরে তিনি তার পরিবারের লোকজনসহ নিকট আত্মীয় ও প্রতিবেশী আরো অনেক লোকজনকে নিয়ে গেছেন সেখানে।

তিনটি নদী বেষ্টিত ঈশা খাঁর রাজধানী সোনারগাঁ ছিল এক সময় কৃষি প্রধান এলাকা। রাজধানী ঢাকার সন্নিকটে হলেও এখানকার বাসিন্দাদের একমাত্র জীবিকা ছিল কৃষি ও মৎস্য শিকার। তথ্যপ্রযুক্তি ও আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে শিল্প উন্নয়নের ছোঁয়ায় দ্রুত বদলে গিয়ে উন্নয়নের মডেল হিসেবে রূপ নিয়েছে সোনারগাঁ। যারা প্রবাসে পাড়ি দিতে পারেননি তাদের অনেকেই শুরু করেন বালুর ব্যবসা। বালুর ব্যবসা করেও অনেকেই একাধিক বাড়ি গাড়ির মালিক বনে গেছেন।

পিরোজপুর ইউনিয়নের প্রতাবনগর, ঝাউচর, ইসলামপুর, গঙ্গানগর, আষাঢ়িয়ারচর, পিরোজপুর, জৈনপুর গ্রামবাসী এক সময় মেঘনা ফেরিঘাটে কলা, কমলা, আঙ্গুর, আপেল বিভিন্ন ফল বিক্রি ও কুলি মজুরের কাজ করতেন। মেঘনা সেতু হওয়ার পর তাদের ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটতে শুরু করে। সেতু এলাকায় গড়ে উঠে দেশের বৃহৎ অনেক শিল্প প্রতিষ্ঠান। এসব শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোতে ও ঢাকার বিভিন্ন অভিজাত এলাকায় বালু সরবরাহ করে অনেক লাভবান হয় তারা। সেই থেকে তাদের উন্নয়ন অগ্রযাত্রা শুরু হয়। স্থানীয় প্রবাসী ও বালু ব্যবসায়ীরা এখন একাধিক ড্রেজার, বাল্কহেড ও বাড়ি গাড়ির মালিক। ঢাকার অভিজাত এলাকা গুলশান, বনানীর মতো সোনারগাঁ এলাকাকে মডেল হিসেবে রূপ দিয়েছেন তারা। প্রবাসীরা জন্মভূমির সুখসমৃদ্ধি আর আপনজনদের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য বহু কষ্টার্জিত শ্রমের ডলার, পাউন্ড, ইউরো, দিনার, রিয়েল ও রিংগিত পাঠিয়ে নিজ এলাকা ও দেশের উন্নয়নে অসামান্য অবদান রাখছেন। নিজ পরিবারের সুখ সমৃদ্ধির অগ্রযাত্রায় শিক্ষিত যুবকদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে অশিক্ষিত যুবকরাও এগিয়ে যাচ্ছে। উপজেলার ভাটিপাড়া গ্রামের প্রবাসী আবদুল ছাত্তার জানান, প্রথমে তিনি তার এক আত্মীয়ের সহযোগিতায় সৌদি আরব যান। পরে সে তার ভাই-ভাতিজাসহ নিকট আত্মীয়স্বজন ও আশপাশের আরো ৩৫ জনকে ভিসা দিয়ে তিনি সৌদি আরবে নিয়েছেন। অনেকে বিদেশে চাকরির পাশাপাশি নিজস্ব দোকানপাট খুলে ব্যবসা করে বিপুল পরিমাণ বিদেশি মুদ্রা আয় করছেন। নিজ উপার্জনের টাকায় বাড়িতে তিন-চারতলা দালান ঘর নির্মাণ ও অনেক জায়গা জমি কিনেছেন।

শম্ভুপুরা ইউনিয়নের কাজিরগাঁও গ্রামের প্রবাসী মুদিদোকানি ব্যবসায়ী কামরুল ইসলাম জানান, এক সময় নিজেদের কৃষি জমি বিক্রি করে বহু কষ্টে তিনি সৌদি আরব যান। তিনি নিজ পরিবারের লোকজনসহ আশপাশের প্রায় অর্ধশতাধিক লোকজনকে সৌদি আরবে নিয়ে যান। প্রবাসে ব্যবসা করে তিনি অনন্য সফলতা এনেছেন। তিনটি পাকা বাড়িসহ ২৫ বিঘা জমিও কিনেছেন। তিনি বলেন, এলাকার মানুষ চায় প্রবাসী ও সরকারের সম্মিলিত উদ্যোগে সোনারগাঁয়ে এমন কিছু হোক যাতে সেখানে আরো কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়। যারা বিদেশ যেতে পারছেন না, যাতে করে তারাও নিজের শ্রম বিক্রি করে সুখ শান্তিতে বসবাস করতে পারেন সেই ব্যবস্থা সরকারকে করতে হবে।

মেঘনা শিল্পনগরী এলাকার প্রতাবের চর গ্রামের একজন বালু ব্যবসায়ী জানান, এক সময় সোনারগাঁয়ে কর্মসংস্থানের তেমন কোনো সুযোগ ছিল না। মেঘনা সেতু হওয়ার পর থেকে মেঘনাঘাট এলাকায় বহু শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে, সেই সুবাদে স্থানীয় অনেকেই বালু ও পাথর ব্যবসার সঙ্গে জড়িত হয়। বর্তমান সময়ে মানুষ বিদেশ গিয়ে ও ব্যবসা-বাণিজ্য করে জীবন মানের অনেক উন্নতি করেছে। সোনারগাঁয়ের অধিকাংশ মানুষই এখন অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী ও শৌখিন জীবনযাপন করছেন।

"