সাভারে সংঘর্ষে আহত ৩০ : ১৫ গার্মেন্টে ছুটি

প্রকাশ : ১০ জানুয়ারি ২০১৯, ০০:০০

নিজস্ব প্রতিবেদক

নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের দাবিতে গতকাল বুধবার চতুর্থ দিনের মতো বিক্ষোভ করেছেন পোশাক শ্রমিকরা। এ সময় রাস্তায় নামা শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষে ঢাকার সাভারে অন্তত ৩০ জন আহত হয়েছেন। আশুলিয়ার আবদুল্লাহপুর, গাজীপুরের গাজীপুরা ও নাওজোড়সহ বিভিন্ন এলাকায় শ্রমিকরা সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ দেখিয়েছেন। পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য কমপক্ষে ১৫টি কারখানায় ছুটি ঘোষণা করেছে কর্তৃপক্ষ। গাজীপুরে বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে।

সাভারের উলাইল, আশুলিয়া, কাঠগড়া, জিরাবো, নরসিংহপুরসহ কয়েকটি এলাকায় গতকাল বুধবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত শ্রমিকরা রাস্তায় নেমে অবরোধ সৃষ্টির চেষ্টা করলে সংঘর্ষের এসব ঘটনা ঘটে। বেরন এলাকার নারী ও শিশু স্বাস্থ্যকেন্দ্রের পরিচালক রফিকুল ইসলাম বলেন, তাদের চিকিৎসাকেন্দ্রে সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত অন্তত ১৫ শ্রমিক আহত অবস্থায় এসেছেন। প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হলে তারা চলে যান। এ ছাড়া উলাইলে আল-মুসলিম কারখানার সামনে পুলিশের সঙ্গে শ্রমিকদের ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ায় আরো অন্তত ১৫ জন আহত হন বলে জানান সাভার থানার ওসি আবদুল আউয়াল। তবে আহতরা কোথায় চিকিৎসা নিয়েছেন সে বিষয়ে তিনি কিছু বলতে পারেননি।

পরিস্থিতি আরো উত্তপ্ত হওয়ার আশঙ্কায় কিছু কারখানা হঠাৎ করে ছুটি দেওয়া হয়। শিল্প পুলিশ-১-এর পরিচালক সানা সামিনুর রহমান বলেন, হেমায়েতপুরের ডার্ড গ্রুপ, উলাইলের আনলিমা ও আল-মুসলিম গ্রুপসহ ১৫টি কারখানায় বুধবার ছুটি ঘোষণা করেছে কর্তৃপক্ষ। এ ছাড়া শ্রমিকদের ইট-পাটকেলে ‘বেশ কয়েকজন’ পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন বলে তিনি জানান।

তিনি বলেন, ‘সকাল থেকে সাভার-আশুলিয়ার বিভিন্ন স্থানে শ্রমিকরা সড়ক অবরোধের চেষ্টা করে।’

সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, বেলা ১১টার দিকে উলাইলে আল-মুসলিম গ্রুপের পোশাক কারখানা থেকে শ্রমিকরা বেরিয়ে আসতে শুরু করেন। এ সময় পুলিশ ও বিজিবি সদস্যরা তাদের সরিয়ে দেন। কিছুক্ষণ পর শ্রমিকরা আবার এসে কারখানার সামনে ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক অবরোধের চেষ্টা করে। এ সময় পুলিশ লাঠিচার্জ করার পাশাপাশি রাবার বুলেট ও কাঁদানে গ্যাস ছুড়ে তাদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। শ্রমিকরা চলে গেলে পরিস্থিততি স্বাভাবিক হয়। এরপর সড়কে জলকামান ও পুলিশের বিশেষ সাঁজোয়া যান এসে মহড়া দিতে দেখা গেছে।

এর আগে সকালে হেমায়েতপুরের স্ট্যান্ডার্ড গ্রুপের শ্রমিকরা হেমায়েতপুর এলাকার ট্যানারি-হেমায়েতপুর সড়ক অবরোধ করে আগুন জ্বেলে বিক্ষোভ দেখান। তারা কিছু কারখানায় ইটপাটকেল নিক্ষেপ করেন। সেখানেও শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটে। পরে কর্তৃপক্ষ কারখানা বন্ধ ঘোষণা করে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক শ্রমিক বলেন, নতুন বেতন কাঠামোয় মজুরি বৈষম্যের কারণে তারা আন্দোলন করছেন।

এ ছাড়া সকাল ৭টার দিকে আশুলিয়ার আবদুল্লাহপুর-বাইপাইল সড়কের পাশের বিভিন্ন পোশাক কারখানার শ্রমিকরা ওই সড়কে ৮-১০টি যানবাহনের কাচ ভাঙচুর করেন। পুলিশ তাদের ঠেকাতে গেলে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটে। এ সময় পুলিশ লাঠিচার্জ করে এবং কাঁদানে গ্যাসের শেল ছুড়ে রাস্তা ফাঁকা করে।

শ্রমিকরা জানান, সকাল সাড়ে ১০টায় বেরন সরকার মার্কেট, ছয়তলা, জামগড়া, শিমুলতলা ও ইউনিক এলাকার কয়েকটি পোশাক কারখানার শ্রমিকরা কাজ বন্ধ রেখে রাস্তায় নেমে আসেন। তখনো পুলিশের সঙ্গে তাদের সংঘর্ষ হয়। তখন দূরপাল্লার শাহ ফতেহ আলী পরিবহন, সিমেন্টভর্তি কাভার্ড ভ্যান, পাজেরো জিপ, মিনিবাসসহ ১৫-২০টি গাড়ি ভাঙচুর করেন শ্রমিকরা। ক্ষুব্ধ শ্রমিকরা একপর্যায়ে ইউনিক ও শিমুলতলা পলমল গ্রুপ এলাকা থেকে বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে জামগড়া চৌরাস্তায় গেলে পুলিশের একটি দল তাদের বাধা দেয়। পুলিশ লাঠিচার্জ শুরু করলে তারা চলে যান।

প্রত্যক্ষদর্শী দাবি করে কয়েকজন শ্রমিক জানান, সকালে আশুলিয়ার শিমুলতলা এলাকায় শ্রমিকরা রাস্তায় বড় বড় পাথর ও ময়লার বস্তা ফেলে গাড়ি চলাচলে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেন। এ ছাড়া ওই এলাকার শেড ফ্যাশন, উইন্ডি গ্রুপ, স্টার্লিং অ্যাপারেলস, এ এম ডিজাইন, হিয়ন অ্যাপারেলস, দি ড্রেস আইডিয়াস, পলমল গ্রুপসহ কয়েকটি কারখানার শ্রমিকরা বিক্ষোভ দেখিয়েছেন।

আশুলিয়া থানা পরিদর্শক (তদন্ত) জাভেদ মাসুদ বলেন, শ্রমিকরা তাদের দাবি নিয়ে রাস্তায় যান চলাচলে বাধা দেওয়ার পাশাপাশি ভাঙচুর ও প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছেন। তবে পুলিশ তাদের শান্তিপূর্ণভাবে সড়ক থেকে সরিয়ে দিয়েছে। এসব ঘটনায় কাউকে আটক করা হয়নি বলে তিনি জানান।

গাজীপুরের গাজীপুরা ও নাওজোড়সহ বিভিন্ন এলাকায় শ্রমিকরা সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ দেখিয়েছেন। পরে পুলিশ কাঁদানে গ্যাসের শেল ছুড়ে তাদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। জেলা প্রশাসক দেওয়ান মুহাম্মদ হুমায়ুন কবির বলেন, ‘পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে চার প্লাটুন বিজিবি নামানো হয়েছে। গাজীপুরের (দক্ষিণ) সহকারী কমিশনার থোয়াই অং প্রু মারমা জানান, সকাল সাড়ে ৯টা থেকে বেলা সোয়া ১১টা পর্যন্ত শ্রমিকরা মহাসড়কে অবস্থান নেওয়ায় যানজট দেখা দেয়।

‘পুলিশ গিয়ে কয়েক রাউন্ড টিয়ার শেল ছুড়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করে। বেলা সাড়ে ১১টায় যান চলাচল শুরু হয়। তবে মহাসড়কে বেলা সোয়া ১২টার দিকেও গাড়ির দীর্ঘ সারি ছিল।’ টঙ্গীর বিসিক এলাকায় বিভিন্ন পোশাক কারখানার শ্রমিকরা বিক্ষোভ দেখিয়েছেন বলে জানান টঙ্গী পূর্ব থানার ওসি মো. কামাল হোসেন।

এদিকে শ্রমিকদের দাবির প্রতি সংহতি জানিয়ে ও আন্দোলনে শ্রমিক নিহতের ঘটনার বিচার দাবিতে বিক্ষোভ করেছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) প্রগতিশীল ছাত্রজোট। গতকাল বুধবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে বিক্ষোভ মিছিলটি সমাজবিজ্ঞান অনুষদ থেকে শুরু হয়ে কয়েকটি ভবন ও সড়ক প্রদক্ষিণ করে মুরাদ চত্বরে এসে শেষ হয়। পরে সেখানে শাখা ছাত্রফ্রন্টের সাংগঠনিক সম্পাদক শোভন রহমানের সঞ্চালনায় এক সংক্ষিপ্ত সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সমাবেশে শাখা ছাত্রফ্রন্টের সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ দিদার বলেন, ‘উন্নয়নের জোয়ারে দেশ ভাসছে। কিন্তু শ্রমিকদের উন্নয়ন কোথায়? আমরা এমন উন্নয়ন চাই যে, উন্নয়নে শ্রমিকরা দুবেলা পেট ভরে খেতে পারবে। আজ শ্রমিকদের ন্যায্য দাবির বাস্তবায়ন চাইতে রাস্তায় নামতে হচ্ছে, গুলি খেতে হচ্ছে। আমরা দাবি জানাই, যেসব শ্রমিক সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত কাজ করেও মাত্র ৮ হাজার টাকা বেতন নির্ধারণ করা হলো, তা যেন শিগগিরই বাস্তবায়ন করা হয়। ছাত্র ইউনিয়ন জাবি সংসদের সহসভাপতি অলিউর রহমান সান বলেন, ‘যে রাষ্ট্র শ্রমিকদের লাশের ওপর দিয়ে উন্নয়নের মহাসড়কে প্রবেশ করছে, আমরা তেমন রাষ্ট্র চাই না। আমলাদের বেতন বাড়ানো হচ্ছে অথচ যাদের শরীরের ঘাম দিয়ে দেশের ভীত গঠন হয়, তাদের হত্যা করা হচ্ছে। আমরা শ্রমিকদের দাবির সাথে সংহতি প্রকাশ করছি। যে শ্রমিককে নির্বিচারে হত্যা করা হলো, আমরা তার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাই। সেই সাথে অপরাধীদের শাস্তির দাবি জানাচ্ছি।’

"