গণমাধ্যমের সতর্ক প্রতিবেদন কমাতে পারে আত্মহত্যা

প্রকাশ : ০৯ ডিসেম্বর ২০১৮, ০০:০০

নিজস্ব প্রতিবেদক

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (হু) তথ্য মতে, বিশ্বে প্রতি বছর ৮ লাখ মানুষ আত্মহত্যা করে। প্রতি ৪০ সেকেন্ডে বিশ্বের কোথাও না কোথাও কেউ না কেউ আত্মহত্যা করছে। প্রতিদিন আত্মহত্যা করছে ৩ হাজার মানুষ। প্রতি একজনের আত্মহত্যা অপর প্রায় ২৫ জনকে আত্মহত্যা প্রবণতার দিকে নিয়ে যায়। এ কারণে আত্মহত্যা প্রতিরোধের বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে হু। সে লক্ষ্যে গণমাধ্যমে এ সংক্রান্ত সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে একটি গাইডলাইন তৈরি করেছে সংস্থাটি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, হু এর গাইডলাইন মেনে এ সংক্রান্ত সংবাদ গণমাধ্যমে সতর্কতার সঙ্গে প্রচার করা হলে আত্মহত্যা প্রবণতা অনেক কমবে। হু এর তথ্য মতে, হংকংয়ের মিডিয়া বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ফু কে ডব্লিউ তার এক গবেষণায় দেখিয়েছেন, দেশটির সংবাদপত্রগুলোতে আত্মহত্যার সংবাদ প্রকাশ না করায় অথবা প্রকাশ করলেও অত্যন্ত কম গুরুত্ব দেওয়ায় সেখানে আত্মহত্যার হার ও প্রবণতা কমে গেছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, বেশির ভাগ মানুষই অনুকরণপ্রিয়। তারা গণমাধ্যমে প্রকাশিত আত্মহত্যার প্রতিবেদন থেকে যেন কোনো সুযোগ না নেয় তাই গণমাধ্যমের সতর্কতা হওয়া প্রয়োজন। এ বিষয়ে ব্রাইটার টুমোরো ফাউন্ডেশনের প্রেসিডেন্ট শিপ্রা জামান জয়শ্রী বলেন, আত্মহত্যার সংবাদ পরিবেশনে দায়িত্বহীনতা ধ্বংসাত্মক পরিণাম বয়ে আনতে পারে। তাই সতর্কতার সঙ্গে সুচিন্তিতভাবে এ ধরনের প্রতিবেদন তৈরি করতে হবে। কারণ এক্ষেত্রে কেবল সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির পরিবার ও বন্ধুরাই কেবল নন ঘটনা সম্পর্কে যারা জানতে পেড়েছেন, সংবাদ পরিবেশনে ত্রুটি তাদেরও প্রভাবিত করতে পারে। আর এ বিষয়টি কখনোই খাটো করে দেখা উচিত নয়। জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মো. তাজুল ইসলাম বলেন, ‘বেশিরভাগ মানুষই অনুকরণপ্রিয়। এজন্য যাদের মধ্যে এ প্রবণতা আছে বা সুযোগ আছে তারা আত্মহত্যার প্রচার বেশি হলে আত্মহত্যায় ঝুঁকতে পারে। বিশেষ করে আত্মহত্যাকারী যদি তারকা ব্যক্তি কেউ হয়। সব সময় দেখা যায়, তারকা কেউ মারা গেলে তার কিছু দিন পর কেউ আত্মহত্যা করে। কেউ আত্মহত্যা করলে তাকে নিয়ে রিপোর্টিংয়ের ক্ষেত্রে খেয়াল রাখতে হবে এ ব্যাপারে যেন খুব বিস্তারিত কিছু না বলা হয়।

তিনি সম্প্রতি ভিকারুননিসা নূন স্কুলের এক ছাত্রীর আত্মহত্যার পর বিষয়টি আলোচনায় আসা প্রসঙ্গে বলেন, অরিত্রীর বিষয়টি যেমন যে শিক্ষক পরীক্ষার হলে অরিত্রীকে ধরেছেন তিনি তো তার দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি তো বেশি দায়ী না। দায়ী হলো যারা অরিত্রীকে বকাঝকা করেছেন। তাহলে প্রচার হলো কী? তার নকল ধরার কারণে সে আত্মহত্যা করেছে। এটি প্রচার হওয়ার কারণে আইন ও প্রশাসন ওই শিক্ষিকাকে আটক করল। নকল ধরলে আত্মহত্যা করাটা যদি জাস্টিফাই হয় তাহলে যারা পরবর্তীতে নকল করে ধরা পড়বে তারাও বলবে আমিও আত্মহত্যা করি। এটা যেন মানুষের কাছে না যায়।

সম্প্রতি হু এর সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে গণমাধ্যমের সাংবাদিকদের সচেতন করতে ট্রেনিং প্রোগ্রামের আয়োজন করে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট। এ প্রসঙ্গে ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক হেলাল উদ্দিন আহমেদ বলেন, আমরা এ পর্যন্ত ১০টি ব্যাচে ১০টি প্রোগ্রাম করেছি। প্রতি ব্যাচে ২০ জন করে সাংবাদিককে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। শুধু আমাদের ট্রেনিংয়ের ওপর তো বিষয়টি নির্ভর করে না তবে এখন রিপোর্টিংয়ের ক্ষেত্র অনেক পরিবর্তন হয়েছে। সম্প্রতি যে মেয়েটি আত্মহত্যা করল সেই অরিত্রীর বেশি বেশি ছবি প্রকাশ এবং তাকে মহান করে সংবাদ পরিবেশন এখন হচ্ছে না। যদিও সেন্টিমেন্ট অরিত্রীর পক্ষে তারপরও তেমন বেশি তাকে হাইলাইট করা হচ্ছে না।

শিপ্রা জামান জয়শ্রী বলেন, গণমাধ্যমে এমনভাবে প্রতিবেদন তৈরি করা যাবে না যাতে আত্মহত্যা বেড়ে যায়। যাদের পরিবারের সদস্য আত্মহত্যা করে তাদের মধ্যেও আত্মহত্যা করার আশঙ্কা তৈরি হয়। এক্ষেত্রে গণমাধ্যমকে সতর্ক হতে হবে যেন প্রশ্ন করার সময় তাদের আঘাত করা না হয়। যেমন একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আত্মহত্যা করার পর তাকে নিয়ে বেশকিছু গণমাধ্যম অতিরঞ্জিত লেখা লিখেছে। এটা করা যাবে না। যেসব জিনিস দিয়ে আত্মহত্যা করে, সেটা বলা যাবে না। নাটকীয় হেডলাইনের ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে। যেসব জায়গায় গেলে আত্মহত্যাপ্রবণ ব্যক্তিরা সহায়তা পেতে পারেন তা জানাতে হবে। কোথায় গেলে মানুষ সাহায্য পাবেন সেটা নিয়ে লিখতে হবে, নেতিবাচক কাভারেজ তরুণ বয়সীদের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। তাই বারবার আত্মহত্যার খবর ছাপানো যাবে না। জল্পনা-কল্পনা করে কিছু লেখা যাবে না। আত্মহত্যার সঙ্গে সামাজিক, মানসিক প্রত্যেকটা বিষয় সম্পর্কিত। পরিসংখ্যানের ব্যাপারে সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে। আত্মহত্যাকারীর ছবি প্রকাশ করা যাবে না। একজন সংবাদকর্মীকে সমাজে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে হবে। সামাজিকভাবে যেন আত্মহত্যা কমে সেই লক্ষ্যে কাজ করতে হবে।

আত্মহত্যা প্রতিরোধ প্রসঙ্গে হু এর নির্দেশনা হচ্ছে, এছাড়া আত্মহত্যা প্রবণতা থেকে কীভাবে বেরিয়ে আসা যাবে তা তুলে ধরতে হবে প্রতিবেদনে।

"