‘একই আকাশ একই বাতাস এক হৃদয়ে একই তো শ্বাস’

প্রকাশ : ০৮ ডিসেম্বর ২০১৮, ০০:০০

রানীশংকৈল ও হরিপুর প্রতিনিধি

বাবা আর মেয়ের ওপর একই আকাশ, নিচে একই জমিন, মাঝে কাঁটাতারের বেড়া জানান দিয়েছে তারা দুদেশের নাগরিক। পরস্পরের প্রতি দুজনের ভালোবাসা আর আবেগ থাকলেও মাঝখানে রয়েছে রাষ্ট্রের প্রভেদ, কাঁটাতার। বাবা জব্বার এসেছিলেন ভারতের জলপাইগুড়ি থেকে আর মায়ের সাথে কন্যা সুরভী এসেছিলেন ঠাকুরগাঁও থেকে। দূর থেকে দেখলেন, করলেন কুশলবিনিময় কিন্তু ছুঁতে পারলেন না ভালোবাসার মানুষকে।

ঠাকুরগাঁওয়ের রানীশংকৈল কোচল এবং হরিপুর উপজেলার চাঁপাসার তাজিগাঁও সীমান্তের নীভৃত গ্রাম টেংরিয়া গোবিন্দপুর কুলিক নদীর পারে বসেছিল পাথর কালীর মেলা। সেখানে দুদেশের সীমান্তবর্তী ৪ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে বসেছিল স্বজনদের মিলনমেলা।

তবে ১০ ফুট দূরত্বেও কাঁটাতারের বেড়ার এপাশ-ওপাশ থেকেই সব কুশলবিনিময় করলেন তারা। ঠিক এভাবেই বাবা সন্তানকে, মেয়ে মাকে, ভাই ভাইকে আর স্ত্রী স্বামীকে দেখেছেন, তারা ঘনিষ্ঠ স্বজন কিন্তু দুই দেশের নাগরিক।

সীমান্তের এই অঞ্চলে প্রতি বছর বসে এই পাথরকালীর মেলা। বিজিবি ও বিএসএফের সম্মতিতে পাসপোর্ট ভিসা ছাড়াই এই সাক্ষাতের সুযোগ হয়। সেখানে কথা হয় পঞ্চগড়ের সালামের সাথে। তিনি বলেন, ২১ বছর পর ছোট ভাই সৌরভের সঙ্গে দেখা। আনন্দ যেন বাঁধ মানছিল না ভাই। সৌরভ থাকেন ভারতের জলপাইগুরি জেলার রায়গঞ্জ থানায়। অনেক দিন পর আজ দেখলাম কাঁটাতারের এপার উপারে।

বাংলাদেশের ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড়, দিনাজপুর, রংপুর এবং ভারতে কোচবিহার, আসাম, দার্জিলিং, শিলিগুড়ি, জলপাইগুড়ি, কলকাতাসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে বাইসাইকেল, অটোরিকশা, মাইক্রোবাস, মিনিবাসযোগে মেলা স্থলে হাজির হন দুদেশের মানুষ। এরপর চলে প্রতিক্ষার প্রহর। গতকাল শুক্রবার বিজিবি ও বিএসএফের সম্মতিতে সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত চলে এ মিলনমেলা। কিন্তু তারা অপেক্ষা করছিলেন ভোর থেকেই। কারণ মিলিত হওয়ার এমন সুযোগ হাতছাড়া করতে চায় না কেউ। এদিন লাখো মানুষ কথা কন তাদের প্রিয়জনের সঙ্গে। দুদেশের সীমারেখা কাঁটাতার দিয়ে আলাদা করা হলেও আলাদা করা যায়নি তাদের ভালোবাসার টান। দীর্ঘদিন পর দেখা হওয়ায় অনেকে কান্নায় ভেঙে পড়ে। আবার কেউ প্রিয়জনের দেখা না পেয়ে বাড়ি যেতে হয় চোখে পানি নিয়ে।

দুদেশের বিভিন্ন স্থানে থাকা সাধারণ মানুষ টাকা-পয়সার অভাবে পাসপোর্ট ভিসা করতে পারেন না। তারা এ দিনটির অপেক্ষায় থাকে। সারা বছর দুদেশের মানুষ অপেক্ষা করে এ দিনটির জন্য। মোবাইল ফোনের মাধ্যমে আগে থেকেই জানিয়ে দেন স্বজনরা। কে কোথায় দেখা করবে। ভারতীয় অধিবাসী কাঁটাতারের পাশে এলে সেখানে বাংলাদেশেরও লাখো নারী-পুরুষ সমবেত হয়।

জামাই হেদলু রাম ভারতীয় সীমান্তে আর শাশুড়ি মুক্তিরাণী এসেছেন বাংলাদেশ সীমান্তে, সঙ্গে নাতি-নাতনি। সবাই কান্নাজড়িত কণ্ঠে কথা বলছেন। রানী বসাক বলেন, ৮ বছর পর জামাই ও মেয়ের দেখা পেলাম। মেয়েকে জড়িয়ে ধরার ইচ্ছা থাকলেও পারছি না। একই কথা বলছিলেন ভারতের মাকড়হাটে থাকা ছোট বোন রোজিনাকে দেখতে আসা দিনাজপুরের আবুল বাসার। তিনি বলেন, ‘জড়িয়ে একটু চিৎকার করে কান্না করি। তাতে হয়তো দীর্ঘদিনের জমে থাকা কষ্টগুলো থেকে একটু রেহাই পেতাম।’

পাথরকালীর মেলার সভাপতি মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার নগেন পাল জানান, কৃষকের ধান মাঠে থাকার কারণে মেলার সময় এক সপ্তাহ পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে। এ এলাকাটি পাক ভারত বিভক্তির আগে ভারতের দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার অধীনে ছিল। এ কারণে দেশ বিভাগের পর আত্মীয়স্বজনরা দুদেশে বিভক্ত হয়ে পড়ে। তাই সারা বছর কেউ কারো সাথে দেখা-সাক্ষাৎ করতে পারেন না। অপেক্ষা করে থাকে এই দিনটির জন্য।

ব্রিটিশ আমল থেকেই বসত ‘পাথরকালীর মেলা’। দেশ বিভাগের পর মেলাটি বাংলাদেশের অংশে পড়ে। তবে এই দিনে সীমান্ত উন্মুক্ত করে দেয় ভারত। হাজার হাজার ভারতীয় প্রতি বছরই মেলায় এসে বাংলাদেশে অবস্থানরত তাদের আত্মীয়স্বজনদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।

গতকাল শুক্রবার ভোর থেকে রিকশা, ভ্যান, মোটরসাইকেল, টেম্পো, মাইক্রো, বাস, নছিমন-করিমন, বাইসাইকেল, অটোগাড়িযোগেও হাজার হাজার মানুষ আসেন এ মেলায়। কাঁটাতারের বেড়ার ফাঁক দিয়ে হাত ধরাধরি করে খাবার বিনিময় করে সময় কাটে অনেকের। মেলাস্থলে কথা হয় জেলা সদর থেকে আসা দানেস, সংগিতা রানী, দিনাজপুরের মিলন, শিলারানী, রমেস, শ্রীকান্ত, নীলফামারীর বিমল, নারায়ণ, সুদীপ, আখিরানী পঞ্জগড়ের সুভাস জিতেন গোবিন্দগঞ্জের তমাবসাক, তনুরানী পীরগঞ্জের আলীম, মমিনাসহ অনেকের সঙ্গে। তারা জানান, ভারতে বসবাসরত আত্মীয়-স্বজনদের সথেঙ্গ দেখা-সাক্ষাৎ করার জন্যই তারা মেলায় আসেন।

এ বিষয়ই হরিপুর থানার ওসি আমিরুল ইসলাম আমির বলেন, মেলায় আইনশৃঙ্খলার জন্য সব প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। এবারও কোনোরূপ অপ্রীতিকর পরিস্থিতি ছাড়াই মেলা শেষ করা হয়।

"