হুমকিতে সুলতানা কামাল সেতু, মাসে ২০ কোটি টাকার বাণিজ্য

শীতলক্ষ্যা দখল করে ৩০ বালুমহাল

প্রকাশ : ০৬ ডিসেম্বর ২০১৮, ০০:০০

আবদুল আলীম, নারায়ণগঞ্জ

গভীর রাতেও নদী কাঁদে। সেই মৃত্যুকান্না কেউ শুনতে পায় না। নন্দিত কথাশিল্পী সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহর ‘কাঁদো নদী কাঁদো’ উপন্যাসে নদীর মৃত্যুর মর্মবেদনার কথা সত্য হয়ে উঠেছে নারায়ণগঞ্জের শীতলক্ষ্যার ক্ষেত্রে। প্রতিদিন একটু একটু করে মৃত্যুযাত্রী শীতলক্ষ্যার কান্না শুনতে পাচ্ছে না কেউ। নির্বিচারে প্রতিদিন শীতলক্ষ্যা দখল চলছে। নদীঘাতকরা মানছে না আইনকানুন, কারো পরোয়াও করছে না তারা। নদীটি দখল করে বসানো হয়েছে ৩০ বালুমহাল। আজকের নারায়ণগঞ্জ নগরী যে শীতলক্ষ্যার দান, তার নিষ্ঠুর প্রতিদান দিচ্ছে মানুষ।

শীতলক্ষ্যার রূপগঞ্জ অংশের তারাবো থেকে পুটিনা পর্যন্ত নদীর দুতীর দখল করে ৩০টি বালুমহাল গড়ে উঠেছে। ‘বালুর গদি’ বসিয়ে বিভিন্ন দল ও সংগঠনের ব্যানারে প্রভাবশালীরা নদীর তীর দখল করে রেখেছে। প্রতিদিন কোটি কোটি টাকার ব্যবসা চলছে এসব বালুমহালে। অবৈধভাবে দখলদারদের বিরুদ্ধে মেরিন কোর্টে মামলাও রয়েছে। বালু ব্যবসায়ীদের দাবি, তারা বিভিন্ন দফতরে মাসোহারা দিয়েই এ ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন। তবে সংশ্লিষ্ট কোনো দফতরই এ অভিযোগ মানতে রাজি নন। টানা এক সপ্তাহ সরেজমিনে গিয়ে প্রতিদিনের সংবাদের অনুসন্ধানে মিলেছে এসব তথ্য।

অনুসন্ধানে জানা যায়, সুলতানা কামাল সেতুর আশপাশে শীতলক্ষ্যার তীরঘেঁষেই বালুর গদি রয়েছে ২০টি। এর মধ্যে ডেমরা ঘাট দখল করে ১৩টি ইট-বালুর গদি বসিয়ে ব্যবসা করছেন স্থানীয় প্রভাবশালীরা। তারাবো পৌরসভার একসময়কার চুনার মিলের পাশে নদী দখল করে ৫টি গদি বসিয়েছে স্থানীয় প্রভাবশালীরা। তারাবো কাঠপট্টির পাশে রয়েছে দুটি গদি। এ ছাড়া রূপসী এডিবয়েল মিলের সামনে ৪টি, রূপসী খেয়াঘাটের সামনে ৩টি এবং কাঞ্চনে ৩টি বালুমহাল রয়েছে। এতে হুমকির মুখে রয়েছে ৭২ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত সুলতানা কামাল সেতু। এসব বালুমহালে মাসে প্রায় ২০ কোটি টাকার বালু বেচাকেনা হয়। পাশাপাশি চলছে শীতলক্ষ্যা দখলের প্রক্রিয়া। বালু ব্যবসার টাকার ভাগ বিআইডব্লিউটিএ, পরিবেশ অধিদফতর, প্রশাসন ও বিভিন্ন মহলের পকেটে যায় বলে জানা যায়।

কারা এই বালু ব্যবসায়ী : সরেজমিনে গিয়ে অনুসন্ধান ও বিআইডব্লিউটিএ সূত্রে জানা গেছে, সুলতানা কামাল সেতুর নিচে শীতলক্ষ্যা নদী দখল করে অবৈধভাবে বালু ব্যবসা করছেন আবুল বাশার (আকাশ এন্টারপ্রাইজ), হাজি হাবিবুর রহমান হাসুর (সাবিক্ষর এন্টারপ্রাইজ), ইউনুসসহ নয়জন বিসমিল্লাহ এন্টারপ্রাইজ, আবদুর রহমান (রহমান এন্টারপ্রাইজ), হাজি মো. সালাউদ্দিন (জিএসআর এন্টারপ্রাইজ), মো. সোহেল (সোহেল এন্টারপ্রাইজ), মো. আবদুল ওহাব (ওহাব এন্টারপ্রাইজ), মো. মোস্তফা (মোস্তফা এন্টারপ্রাইজ), হাজি মো. আলাউদ্দিন (আলাউদ্দিন এন্টারপ্রাইজ), মো. মমিন মিয়ার (মেসার্স ডেমরা এন্টারপ্রাইজ), হাজি মো. আতিকুল রহমান (অনিক সাপ্লাইয়ার), আবদুল মালেক (খালেক এন্টারপ্রাইজ) আর ডেমরা বালু ব্যবসায়ী সমিতির নামে রয়েছে আরো একটি গদি। তারাবো পৌরসভার চুনার মিলের পাশে রয়েছে শহীদুল্লাহ, বারেক, নুরু মিয়া, চনপাড়ায় জয়নাল ডাক্তার, রূপসী মফিজ হাজি, আনোয়ার, কাদির, মোহাম্মদ আলী, দেলোয়ারসহ ৩০ জন শীতলক্ষ্যা দখল করে বালুমহাল গড়ে তুলেছেন।

সরেজমিন একদিন : গতকাল বুধবার সকালে সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, তারাবো পৌরসভার চুনার মিলের নদীর তীর ভূমির প্রায় দেড় একর জায়গা দখল করে বালু ফেলে ভরাট করা হয়েছে। নদীপথে বালু এনে সেখানে স্তূপ করে রাখা হয়েছে বিক্রির জন্য। স্তূপের ওপরেই রয়েছে কয়েকটি ট্রাক। ট্রাকগুলোয় বালু লোড করা হচ্ছে। বালু লোডের জন্য কাজ করছে প্রায় ৩০ থেকে ৪০ জনের মতো শ্রমিক। সেই বালু ফের চলে যাচ্ছে নদীর পেটে। বালু ব্যবসায়ীদের ভয়ের মুখে কেউ মুখ খুলতে চায় না। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্কুলছাত্র বলে, ‘এহন যেহানে বালু আছে, ছয়-সাত বছর আগে আমরা এহানে গোসল করতাম।’ বালুর স্তূপের পাশেই রয়েছে টিনের বেড়ায় তৈরি ‘গদিঘর।’ এসব গদিঘর থেকে রসিদ দিয়ে প্রতি ট্রাক বালু দুই হাজার থেকে সাড়ে তিন হাজার টাকায় বিক্রি করা হচ্ছে। বালু বিক্রির কাজে নিয়োজিত রতন মিয়া ও জুলহাস আলম নামে দুজন কর্মচারী বলেন, প্রতিদিন এ ঘাট থেকে ১৫০ থেকে ২০০ ট্রাক বালু বিক্রি হয়। আর ডেমরা ঘাটে গিয়ে দেখা যায় এলাহি কা-। এখানে প্রতিদিন কয়েক শ ট্রাক বালু বিক্রি হয়। সুলতানা কামাল সেতুর নিচেই গড়ে উঠেছে ১০ থেকে ১২টি গদিঘর। তারাবো ও ডেমরা ঘাটের মতো রূপসী, কাঞ্চনসহ শীতলক্ষ্যা দখল করে ৩০টি বালুমহালে চলছে রমরমা বালু ব্যবসা। শর্টকার্ট ফর্মূলায় বড়লোক হতে অনেকে এখন নদী দখল করে এ ব্যবসার দিকে ঝুঁকছেন। জেলা প্রশাসন ও ভূমি জরিপ অধিদফতরের নির্ধারিত সীমানাখুঁটির ভেতরেই চলছে ভরাটকাজ।

কয়েকজন দখলদারের কথা : কথা হয় তারাবো এলাকার দখলদার শহীদুল্লাহ মিয়ার সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘ব্যবসা না করলে খামু কী। পোলাপাইনরে কী খাওয়ামু। আমরা নদী দহল করি নাই। এইডা আমাগো বাপ-দাদাগো জায়গা।’ দখলদার বারেক মিয়া বলেন, ‘দল করি টেকা-পয়সা কামাইবার লেইগ্যা। চুরি-ডাকাতি তো করছি না। ব্যবসা কইরা খাইতাছি।’ নদী দখল করার ব্যাপারে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘নদী দহল করলাম কই। লোড-আনলোডের সুবিধার কারণে নদীর পারে বালু রাহি।’ অভিযুক্ত রূপসী এলাকার দখলদার হাজি মফিজ মিয়ার সঙ্গে তার সেলফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘ভাই আমি বালুর ব্যবসা করি। তবে নদী দখল করি নাই।’ কথা হয় আরেক দখলদার আনোয়ার মিয়ার সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘আমি সরকার থেকে লিজ নিয়া বালু ব্যবসা করছি। লিজের কাগজপত্র দেখতে চাইলে তিনি বলেন, কাগজপত্র বাড়িতে আছে। পরে দেখাতে পারব।’ নাম প্রকাশ না করার শর্তে বালু ব্যবসার সঙ্গে জড়িত দুই কর্মী বলেন, ‘তারা এ ব্যবসা থেকে যে আয় করেন, তার একটি বড় অংশ প্রভাবশালী নেতা, স্থানীয় পুলিশ, সড়ক ও জনপথ (সওজ), বিআইডব্লিটিএর কর্মকর্তা, পরিবেশ অধিদফতরের মধ্যে ভাগবাটোয়ারা করে দেন।

কর্তৃপক্ষের বক্তব্য : নারায়ণগঞ্জ সড়ক ও জনপথের নির্বাহী প্রকৌশলী অলিউর হোসেন বলেন, যথাশিগগিরই সড়ক ও নদী দখল করে যারা অবৈধ বালু, পাথর ব্যবসা করছেন, তাদের উচ্ছেদ করা হবে। বিআইডব্লিউটিএ নারায়ণগঞ্জ নদীবন্দরের উপপরিচালক শহীদুল্লাহ বলেন, যারা শীতলক্ষ্যা নদী ভরাট করে অবৈধভাবে বালু-পাথর ব্যবসা করছে, তাদের বিরুদ্ধে মেরিন কোর্টে মামলা দেওয়া হয়েছে, বাকিদের বিরুদ্ধে শিগগিরই ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আর কেউ যাতে দখল ও ভরাট করতে না পারেন, সে জন্য সার্বক্ষণিক মনিটরিং করা হচ্ছে।

নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসক মো. রাব্বি মিয়া বলেন, ইতোমধ্যে আমরা শীতলক্ষ্যা নদী রক্ষার জন্য আলোচনা করেছি, যাতে শীতলক্ষ্যা নদী ভরাট ও দূষণ থেকে রক্ষা করা যায়।

 

"