আর্সেনিকে যাচ্ছে প্রাণ আক্রান্ত ৩ হাজার

প্রকাশ : ০৪ ডিসেম্বর ২০১৮, ০০:০০

ইয়াকুব আলী, চৌগাছা (যশোর)

যশোরের চৌগাছার মাড়–য়া গ্রামে ভয়াবহ আর্সেনিক ছড়িয়ে পড়েছে। আর্সেনিকের বিষে গ্রামে এ পর্যন্ত মারা গেছে ২৩ জন। আক্রান্তের সংখ্যা তিন হাজার ছাড়িয়েছে। বর্তমানে এ গ্রামের মানুষের সঙ্গে কেউ আত্মীয়তার বন্ধন করতে ভয় পায়। এ গ্রামের মানুষ এখন সামাজিকভাবে নানা বৈষম্যের স্বীকার হচ্ছেন বলে ভুক্তভোগীরা জানিয়েছেন।

উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলী অফিস ও এশিয়া আর্সেনিক নেটওয়ার্ক জানায়, উপজেলার মাড়–য়াসহ বেশ কিছু গ্রামকে আর্সেনিকযুক্ত গ্রাম হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। গ্রামগুলো হলো উপজেলার মাড়–য়া, বেড়গোবিন্দপুর, কুষ্টিয়া, রামভদ্রপুর, ফুলসারা, জগদীশপুর, পাতিবিলা, সিংহঝুলী, জগন্নাথপুর, হাকিমপুর, কয়ারপাড়া, মাজালী, বলিদাপাড়া, সুখপুকুরিয়া, তেঘোরি, গরীবপুর, জাহাঙ্গীরপুর ও চৌগাছা। এ ছাড়া অধিকাংশ গ্রামের নলকূপে মাত্রাতিরিক্ত আর্র্সেনিকের উপস্থিতি ধরা পড়েছে। শত শত মানুষ এখন আর্সেনিকজনিত রোগে আক্রান্ত। এই রোগীরা জমি, জায়গা বিক্রি করে দেশ ও বিদেশে চিকিৎসা নিচ্ছেন। মাড়–য়া গ্রামের চার হাজার জনসংখ্যার মধ্যে ৭০ শতাংশ নারী, পুরুষ বিভিন্ন মাত্রায় আর্সেনিকে আক্রান্ত। পানিতে আর্সেনিকের সহনীয় মাত্রা প্রতি লিটারে শূন্য দশমিক ৫ মিলিগ্রাম হলেও এ গ্রামের গড়মাত্রা শূন্য ৮৫ মিলিগ্রাম। বর্তমানে মাড়–য়া গ্রামে আর্সেনিকে আক্রান্ত নারী-শিশু ও পুরুষ তিন হাজার ছাড়িয়ে গেছে। এ গ্রামে আর্সেনিকে আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়ারা হলেন আনিছুর রহমান (২০), ডাক্তার ইয়াকুব আলী (৭০), মুক্তিযোদ্ধা আলতাপ হোসেন (৫৫), নূরজাহান (৬৫), আবদুল আজিজ (৫২), ইউছুপ আলী (৩৫), সালমা খাতুন (৩০), কাশেম আলী (৬০), পদ্মা খাতুন (৫৩), আয়ুব হোসেন (৩৮), আকরাম হোসেন (৪০), নূর ইসলাম (৫৫), হোসেন আলী (৫০), ময়না বিবি (৪০), মুকতার আলী (৪৫), আতিয়ার রহমান (৪৮), আক্কাচ আলী (৪৪), মনসের আলী (৪২), ইলাহুড়ি (৬৭) ও ইউনুচ আলী (৫৫) মৃত্যুবরণ করেন।

এশিয়া আর্সেনিক নেটওয়ার্কের সংগঠক লুৎফর রহমান বলেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে সর্বোচ্চ সহনীয় মাত্রা ০.০১ মিলিগ্রাম প্রতি লিটার পানিতে। কিন্তু দেশে ০.৫ মিলিগ্রাম সহনীয় মাত্রা ধরা হয়। মাড়–য়া গ্রামে গড়ে আর্সেনিকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে, .৮৫ মিলিগ্রাম প্রতি লিটারে। তবে মাড়–য়া দক্ষিণপাড়ায় প্রতি লিটার পানিতে ১০০ মিলিগ্রাম উপস্থিতি পাওয়া গেছে, যা ভয়াবহ মাত্রার চেয়েও বেশি। বর্তমানে এ গ্রামে তিন হাজার রোগী আছে। আমি নিজেই আর্সেনিক রোগে আক্রান্ত। আর্সেনিকের কারণে আমার ফুসফুস ক্যানসার দেখা দেয়। সে কারণে ঢাকা থেকে আট লাখ টাকা খরচ করে অপারেশন করি। আমার ফুসফুসের বামপাশের অংশটি কেটে ফেলা হয়েছে। কোনো মতে এখন বেঁচে আছি। তিনি বলেন, ২০০১ সালে এশিয়া আর্সেনিক নেটওয়ার্ক মাড়–য়া গ্রামে বিশেষ গবেষণা শুরু করে। মাটি, পানি, মানুষের রক্ত, মলমূত্রসহ নানা বিষয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালান। তারা আর্সেনিকযুক্ত পানির উৎস্য বন্ধ করার পরিকল্পনা করেন। পরে নিরাপদ পানির জন্য গ্রাবেল সেন্ড ফিল্টার (জিএসএফ), পন্ড সেন্ড ফিল্টার (এএসএফ), আর্সেনিক আয়রন রিমুভাল প্লান্ট ও ডাগ ওয়েল নির্মাণ করেন। ২০০৮ সালে তাদের প্রজেক্ট শেষ হয়। পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ার কারণে উল্লিখিত প্লান্ট থেকে মানুষ পানি সংগ্রহ করতে পারে না। প্রজেক্ট শেষ হলেও তারা এ গ্রামকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত ফলোআপে রাখে। পরে মানবিক বিবেচনায় উন্নত প্রযুক্তি ও মেশিনের মাধ্যমে তারা পুরো গ্রামে নিরাপদ পানি সরবরাহের জন্য একটি বৃহৎ প্রকল্প হাতে নেন। যার সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছিল ১৫ কোটি টাকা। কিন্তু ২০১৫ সালের ৩ অক্টোবর রংপুর জেলায় জাপানি নাগরিক হোশি কুনিও হত্যাকা-ের শিকার হলে ওই প্রকল্প আলোর মুখ দেখেনি।

ইউনিয়ন তথ্যসেবা কেন্দ্রের হাবিবুর রহমান বলেন, এ গ্রামের মোট জনসংখ্যা ৪ হাজার। ভোটার রয়েছে ২১১৬ জন। অনেক কষ্ট করেই পানি সংগ্রহ করতে হয়। পানির জন্য রীতিমতো যুদ্ধ চলে এখানে। ভয়াবহ আর্সেনিকোসিস রোগে আক্রান্ত হয়ে অনেকে মৃত্যুবরণ করেছেন। দুটি পরিবারের ১০ জন মৃত্যুবরণ করেছেন।

গ্রামের বাসিন্দা রোকেয়া বেগম (৫২) জানান, আমার ডান হাতের দুটি আঙুল কেটে ফেলতে হয়েছে। ২০০০ সালের ১৭ ডিসেম্বর ঢাকায় আমার অপারেশন হয়। বর্তমানে আমি ক্যানসার বিশেষজ্ঞ জি এম ফারুকের চিকিৎসাধীনে। আমার শরীরে আর্সেনিকের দাগ। আর্সেনিকের কারণে আমাদের পরিবারের সাতজন মারা গেছে।

আর্সেনিকোসিস রোগে আক্রান্ত মাড়–য়া বাজার মসজিদের মুয়াজ্জিন আনছার আলী জানান, তিনি ২০ বছর ধরে এ রোগে ভুগছেন। এখন তার শ্বাসকষ্ট আর হার্টের সমস্যা দেখা দিয়েছে। অসুস্থতার কারণে ঠিকমতো মসজিদের যেতে পারেন না। তিনি বলেন, ১০ কাঠা জমিও তিনি বিক্রি করেছেন। তার পরও সুস্থ হননি। অনেক কষ্টে দিন কাটছে। একই গ্রামের আর্সেনিক রোগী জাহানারা বেগম, মমতাজ বেগম, মিজানুর রহমান, রফিউদ্দীন, জহুরা বেগম, রাজুবালা, মাজেদা বেগম, হাকিম দর্জি, তাবারক আলী, মাইরুন বেগম, রকিবউদ্দীনসহ অনেকের সঙ্গে কথা হয়। তারা জানান, আর্সেনিক রোগ হওয়ার পর তাদের শরীর বিবর্ণ হয়ে গেছে। কারো পা ফুলে গেছে। পায়ে ক্ষতের সৃষ্টি হয়েছে। শরীর দুর্বল হয়ে শক্তি-ক্ষমতা তারা হারিয়ে ফেলছেন। আর্সেনিকের ভয়াবহতার কারণে এলাকায় দেখা দিয়েছে সামাজিক সমস্যা। বাইরের এলাকার সচেতন লোকজন মাড়–য়া এলাকায় বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হতে অনীহা প্রকাশ করেন।

উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলী অধিদফতরের ফিল্ড অ্যাসিসট্যান্ট ফারুক হোসেন বলেন, সহনীয় মাত্রা প্রতি লিটারে ০.৫ মিলিগ্রাম হলেও এই মাত্রার চেয়ে উপজেলায় আর্সেনিকের আধিক্য বেশি। উপজেলায় গড়ে ২০ মিলিগ্রাম প্রতি লিটারে আর্সেনিকের উপস্থিতি আছে। কিন্তু মাড়–য়া গ্রামে ৮৫ মিলিগ্রাম প্রতি লিটারে পাওয়া গেছে। এ গ্রামের কোনো কোনো স্থানে এর চেয়ে বেশিও আর্সেনিকের উপস্থিতি পরীক্ষার মাধ্যমে লক্ষণীয়।

উপজেলার জগদীশপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান তবিবর রহমান খান বলেন, আমার জন্মস্থান মাড়–য়া গ্রামে। আমার গ্রামকেই আর্সেনিকের গ্রাম বললে সবাই চেনে। এ গ্রামের অল্পসংখ্যক মানুষ ছাড়া সবাই আর্সেনিকের রোগী। আর্সেনিক রোগের কারণে দুটি পরিবারের দুজন মহিলা ছাড়া ১০ জন মারা গেছে। জাপানি সংস্থা জাইকার সহযোগিতায় এশিয়া আর্সেনিক নেটওয়ার্ক ২০০৩ সালে বিভিন্ন গ্রাবেল সেন্ড ফিল্টার, আর্সেনিক আয়রন রিমুভাল প্লান্ট ও ডাগওয়েল তৈরি করলেও সেগুলোর অধিকাংশ নষ্ট। তবে যেসব পাড়ায় প্লান্টগুলো নষ্ট, সেখানের মানুষজন নিরাপদ পানি না পেয়ে বাধ্য হয়ে আর্সেনিকযুক্ত পানি পান করছে। তবে মাড়–য়াসহ জগদীশপুর ইউনিয়নে আমরা পাতকুয়ার ব্যবস্থা করেছি।

উপজেলা ৫০ শয্যা হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. আওরঙ্গজেব বলেন, নিরাপদ পানি ছাড়া আর্সেনিকের কোনো ওষুধ নেই। এ রোগের লক্ষণ যেমন হাতে-পায়ে ক্ষত বা ক্ষত বৃদ্ধির উপশোমের জন্য এন্টি অক্সিডেন্ট ট্যাবলেট, কমবাইন বেনজায়িন সেলিসাইলিক অয়েন্টমেন্ট দেওয়া হয়। ২০০৫ সালে হাসপাতালে আর্সেনিক রোগীর চিকিৎসাসেবা কার্যক্রম শুরু হয়।

উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. সেলিনা বেগম বলেন, ২০০৭ সাল থেকে এখন পর্যন্ত এ গ্রামে ২৩ জন মার গেছে আর্সেনিকে। বর্তমানে আর্সেনিকে আক্রান্ত হচ্ছে অসংখ্য মানুষ। তাদের তালিকা তৈরি করে আমরা চিকিৎসা দিচ্ছি।

"