ইটভাটার পেটে উর্বর জমি হুমকির মুখে পরিবেশ

প্রকাশ : ০৪ ডিসেম্বর ২০১৮, ০০:০০

রবিউল আলম ইভান, কুষ্টিয়া

উর্বর কৃষিজমি এবং উদ্বৃত্ত খাদ্যশস্য উৎপাদনের অঞ্চল দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জেলা কুষ্টিয়া। এসব তিন ফসলি জমি এখন যাচ্ছে ইটভাটার পেটে। এতে মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে এলাকার পরিবেশ। তথ্য মতে, জেলার মোট ১ লাখ ৬২ হাজার হেক্টর জমির মধ্যে প্রায় ১ লাখ ১৭ হাজার হেক্টর কৃষিজমি হিসেবে চিহ্নিত। এর মধ্যে অতি উর্বরা তিন বা অধিক ফসলি কৃষিজমির আয়তন মাত্র ৭৬ হাজার হেক্টর। কৃষি বিভাগের তথ্য মতে, প্রতি বছর এসব কৃষিজমিতে উৎপাদিত খাদ্যশস্য জেলার প্রায় ২২ লাখ মানুষের বার্ষিক খাদ্যচাহিদা পূরণ করেও উদ্বৃত্ত খাদ্যশস্য দেশের অন্যান্য জেলায় খাদ্য সরবরাহের জোগান দিচ্ছে। সর্বশেষ উৎপাদন বর্ষেও এই জেলা থেকে ২ লাখ ১ হাজার টন উদ্বৃত্ত খাদ্য অন্যত্র সরবরাহ করা হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে জেলার কৃষি বিভাগ। খাদ্যশস্য উৎপাদনে এমন গৌরবময় অর্জন থাকলেও জেলায় ক্রমবর্ধমান কৃষিজমি ধ্বংসের শঙ্কার কথা জানাচ্ছেন তারা। বিশেষ করে বেপরোয়া ইটভাটা মালিকদের কৃষিজমি আগ্রাসনকে এক আত্মঘাতী ঘটনা হিসেবে দেখছে কৃষি বিভাগ। ইটভাটার মালিকরা তাদের কাজকে বে-আইনি বলে স্বীকার করেই বলছেন, কিছুই করার নেই; কারণ এসব দেখার দায়িত্বে যারা আছেন, তাদের সবাইকে আর্থিক সুবিধার বিনিময়ে ম্যানেজ করেই হচ্ছে এসব। তবে এমন অভিযোগ নাকচ করাসহ সংশ্লিষ্টরা একে অন্যের ওপর দায় দিচ্ছেন। কেউবা বলছেন অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কিন্তু প্রকৃত চিত্র হলোÑনামকাওয়াস্তে প্রশাসনের পক্ষ থেকে দু-একটি অভিযান পরিচালিত হলেও কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে নাÑএমনই অভিযোগ ভুক্তভোগীদের। অবশেষে পাল্টাপাল্টি এমন অভিযোগ খতিয়ে দেখতে মাঠে নেমে বিধিলঙ্ঘনের সত্যতা পেয়েছেন বলে নিশ্চিত করে দুদক কুষ্টিয়ার আভিযানিক দল। বিধি মতে, জেলায় ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থানের জন্য জেলা প্রশাসন থেকে যথাযথ নিয়ম মেনে লাইসেন্সসহ আনুষঙ্গিক ছাড়পত্র নিতে হয়। জেলা প্রশাসন ইটভাটা স্থাপনে চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রধানত কৃষি বিভাগ ও পরিবেশ অধিদফতর কর্তৃক ইতিবাচক ছাড়পত্র আছে কি নাÑসে বিষয়টি দেখে। অর্থাৎ কোনো ভাটামালিক ভাটা স্থাপনের পূর্বশর্ত হিসেবে কৃষি বিভাগ এবং পরিবেশ অধিদফতর থেকে ছাড়পত্র নিয়ে চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য জেলা প্রশাসনে আবেদন করবে। কিন্তু কুষ্টিয়ার ছয়টি উপজেলার বিস্তীর্ণ অঞ্চলের কৃষি জমিতে গড়ে ওঠা কেবল তালিকাভুক্ত প্রায় ১৫২টি ইটভাটার মালিকদের কেউই উল্লিখিত নিয়ম মেনে ভাটা স্থাপন করেননি। এমন অভিন্ন চিত্রের সত্যতা নিশ্চিত করে কুষ্টিয়া সদর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা জোবায়ের হোসেন চৌধুরী জানালেন, ভূমি জোনিং অ্যাক্ট-২০১০, কৃষিজমি সুরক্ষা আইন-২০১৫, পরিবেশ সুরক্ষা আইন-১৯৯৫-সহ ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপনে আইনগত নীতিমালা-২০১৩ সবই লঙ্ঘিত হয়েছে উপজেলার সব ইটভাটা স্থাপনের ক্ষেত্রে। সরেজমিনে অভিযানে গিয়ে তাদের কাছে ইটভাটা স্থাপনে লাইসেন্স বা ছাড়পত্র কিছুই পাওয়া যায়নি।

কথিত ইটভাটা মালিক সমিতির বশির উদ্দিন, আবদুল হাকিম, মহিদুল, মনিরুল, খোকনসহ একাধিক সদস্যের সাথে আলাপকালে তারা জানান, আমরা ভ্যাট-ট্যাক্সসহ সংশ্লিষ্ট সব দফতরেই নিয়মিত টাকা দিচ্ছি। আমরা যদি অবৈধ হই, তাহলে আমাদের কাছ থেকে এসব টাকা নেওয়া হচ্ছে? আবার কেনইবা মাসে মাসে চাঁদে চাঁদে প্রশাসন অভিযানের নামে এসে জরিমানা আদায়, ভাটা ভাঙচুরসহ নানাভাবে আমাদের আর্থিক ক্ষতি করছে? আমরাও তো দেশ উন্নয়নে অবকাঠামো নির্মাণের গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ ইট তৈরি করছি। আমরাও চাই এর একটা সঠিক সমাধান হোক। যেহেতু অধিকাংশ ভাটামালিকই আইনকানুন সম্পর্কে খুব একটা সচেতন নয়। কোনো জমিতে ভাটা করলে কৃষি ও পরিবেশ ধ্বংস হবে না, সেটা সংশ্লিষ্ট প্রশাসনই ঠিক করে দিন। টাকা যখন দিচ্ছি; তাহলে আমাদের সুবিধা-অসুবিধাও দেখতে হবে প্রশাসনকে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর (খামারবাড়ি) কুষ্টিয়ার উপপরিচালক বিভূতি ভুষণ সরকার বলেন, কৃষিনির্ভর বাংলাদেশে কৃষি ধ্বংসের একমাত্র এবং অন্যতম প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে ইটভাটা। বিগত এক দশকে জেলার অতি উর্বর তিন ফসলি ৭৫ হাজার ৮৮০ হেক্টর কৃষিজমির মধ্যে ২৮৮ হেক্টর জমিতে গড়ে ওঠা দেড় শতাধিক ইটভাটা প্রত্যক্ষভাবে ধ্বংস করেছে। এ ছাড়া এসব ইটভাটার দূষণ ও বিরূপ প্রভাবে চতুর্দিকে আরো চার গুণ জমি ফসলহানির শিকার হচ্ছে। এত কিছু জানার পর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর কৃষিজমিতে কীভাবে ভাটা স্থাপনে ছাড়পত্র দেবে? কৃষি বিভাগ থেকে কোনোপ্রকার ছাড়পত্র ছাড়াই কৃষি জমিতে দেদার ইটভাটা গড়ে উঠলেও আমাদের হাতে ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা না থাকায় কিছুই করার নেই। ইটভাটা মালিকদের ‘সবাইকে ম্যানেজ’ প্রক্রিয়ার সঙ্গে কৃষি বিভাগ কোনোভাবেই জড়িত নয় বলে তিনি দাবি করে জানায়, এসব বিষয়ে সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসন ও পরিবেশ অধিদফতর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর কুষ্টিয়ার অতিরিক্ত উপ-পরিচালক (শস্য) ড. হায়াৎ মাহমুদ জেলার কৃষি উৎপাদনের চিত্র তুলে ধরে বলেন, দিনে প্রতি একজনের মাথাপিছু খাদ্যচাহিদা ৫০০ গ্রাম হিসেবে ধরে জেলার ২২ লাখ মানুষের এক দিনের খাদ্য জোগানে প্রয়োজন ১০৭১.৪ টন এবং বার্ষিক খাদ্যচাহিদা জোগানে প্রয়োজন ৩ লাখ ৯১ হাজার ৬১ টন খাদ্যশস্য। জেলার সর্বশেষ বার্ষিক খাদ্যশস্য উৎপাদনে অর্জিত লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৫ লাখ ৯২ হাজার টন (শুধু চাল, গম ও ভুট্টার হিসাব ধরে), যা বার্ষিক খাদ্যের জোগান দিয়েও ২ লাখ ১ হাজার টন খাদ্যশস্য উদ্বৃত্ত ছিল। এ ছাড়া অন্যান্য খাদ্যশস্য যেমন চিনি, সবজি, ডালবীজ, কলা প্রভৃতিও রয়েছে। উদ্বৃত্ত খাদ্যশস্য উৎপাদনে দেশের হাতেগোনা কয়েকটি জেলার মধ্যে কুষ্টিয়া অন্যতম। এই সফলতা অর্জনে জেলার কৃষি বিভাগ নিরলস কাজ করে যাচ্ছে। তবে এতদসত্ত্বেও নানাবিধ কারণে উদ্বৃত্ত খাদ্য উৎপাদনের এ ধারা অব্যাহত রাখাটা ক্রমান্বয়ে শঙ্কাগ্রস্ত হয়ে উঠছে। বিশেষ করে কৃষিজমিগুলো ক্রমবর্ধমান গতিতে যেভাবে নানামুখী অকৃষিজ খাতে চলে যাচ্ছে, তাতে কৃষি উৎপাদনের মূল আঁধার যে জমি তার সিংহভাগই ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। এসব কৃষিজমি রক্ষায় জরুরি ভিত্তিতে সরকার প্রয়োজনীয় কার্যকর পদক্ষেপ নেবেÑএটা এখন সময়ের দাবি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

কোনোপ্রকার অনুমোদন ছাড়াই ইটভাটার মালিকরা ‘সবাইকে ম্যানেজ’ করে, অতি উর্বর তিন ফসলি কৃষিজমিতে ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন নীতিমালা লঙ্ঘন করছে; দুদক সদর দফতরে প্রাপ্ত এমন অভিযোগের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট পরিবেশ অধিদফতর ও প্রশাসনকে সঙ্গে নিয়ে পরিচালিত অভিযানে ঘটনার সত্যতা পেয়েছেন বলে জানালেন দুদক কুষ্টিয়ার সহকারী পরিচালক হাফিজুল ইসলাম।

পরিবেশ অধিদফতর কুষ্টিয়ার সিনিয়র কেমিস্ট মিজানুর রহমান বলেন, জেলায় দেড় শতাধিক ইটভাটার মধ্যে মাত্র ২৬টি ইটভাটা স্থাপনে পরিবেশ অধিদফতরের ছাড়পত্র নেওয়া থাকলেও, অন্যদের কোনো ছাড়পত্র দেওয়া হয়নি। তবু কীভাবে এসব ভাটা চলছে, তা সংশ্লিষ্ট প্রশাসন বলতে পারবে। তবে এসব অবৈধ ভাটামালিকদের সঙ্গে পরিবেশ অধিদফতরের কোনো অনৈতিক সম্পর্ক নেই বলে দাবি করেন তিনি।

কুষ্টিয়ার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মুহাম্মদ ওবাইদুর রহমান জানান, জেলায় ভাটা স্থাপনের ক্ষেত্রে ভাটামালিকরা নীতিমালা লঙ্ঘন করেই এসব করছেন। তবে ব্যক্তিগতভাবে কেউ ইচ্ছে করলেই জমির শ্রেণি পরিবর্তন করতে পারবেন না। কৃষিজমিকে অকৃষিজ দেখিয়ে আইনের ব্যত্যয় ঘটেছে-এমন অভিযোগ পেলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানালেন তিনি।

"