হিন্দু-মুসলিম একই ব্যবসা করি এমন হবে কোনো দিন ভাবিনি

ছেলেহারা মায়ের আক্ষেপ

প্রকাশ : ০৩ ডিসেম্বর ২০১৮, ০০:০০

প্রতিদিনের সংবাদ ডেস্ক

চান্দেরি বেওয়া ২০১৭ সালের নভেম্বরে তার রোজগেরে ছেলেকে হারিয়েছেন। ওকে খুন করেছে হিন্দু মৌলবাদী ‘গো রক্ষকরা’। ছেলে ওমর খান গিয়েছিলেন আলওয়ার থেকে দুটি গাই গরু কিনে আনতে। সঙ্গে ছিলেন ওই গ্রামেরই বাসিন্দা জাভেদ এবং তাহির। গত বছরের নভেম্বর মাসের ১১ তারিখের রাতের কথা এখনো ভোলেননি পঁচাত্তর পেরোনো এই বৃদ্ধা, ‘ জাভেদ এসে খবর দিল রাস্তায় ওদের ওপর কিছু লোক গুলি চালিয়েছে। তাহিরের হাতে গুলি লেগেছে। কোনো মতে জাভেদ তাহিরকে নিয়ে পালিয়ে এসেছে। ওমরকে পাওয়া যাচ্ছে না।’ তিন দিন পরে রেললাইনে পাওয়া যায় ৩৭ বছরের ওমরের গুলিবিদ্ধ এবং গলার নলি কাটা দেহ। পরে কয়েকজন গ্রেফতারও হয়েছিল, যারা প্রত্যেকেই ভারতে সরকার সমর্থক বজরং দলের সদস্য। প্রাথমিক তদন্তে উঠে আসে রাজস্থানের কুখ্যাত এই ‘গো-রক্ষকদের’ নিষ্ঠুরতার কথা। খবর আনন্দবাজার পত্রিকার।

আলওয়ার থেকে ভরতপুর যাওয়ার রাস্তায় ভীমা। সেখান থেকে বাঁ দিকে নেমে ১০০ গজ এগোনোর পরই বোঝা গেল, এ রাস্তায় ট্রাক্টর দিব্বি চলতে পারলেও, সে ডানের চাকা গড়াবে না। প্রায় এক কিলোমিটার হেঁটে, গলি- তস্যগলি পেরিয়ে, ঘাটমিখা গ্রামের শেষ প্রান্তে পৌঁছলাম ওমরের বাড়ি। হরিয়ানা সীমানায় রাজস্থানের শেষ গ্রাম। ততক্ষণে খেয়াল হলো জুতা ছাড়িয়ে হাঁটুর নিচ পর্যন্ত ধুলোর পুরু আস্তরণ। এক টুকরো জমির এক কোণে খড়ে ছাওয়া একটেরে ঘুপচি দু কামরার বাড়ি। সামনের উঠানে খাটিয়ায় বসেছিলেন ওমরের মা চান্দেরি। ছেলের কথা বলতে গিয়েই বলে উঠলেন, ‘আমরা মেওয়াটি। গরু পুষে দুধ বিক্রি করাই গোটা মেওয়াটের মানুষের জীবিকা। কয়েক শ বছর ধরে এখানে আমরা হিন্দু-মুসলমান পাশাপাশি বাস করে একই ব্যবসা করছি। এমন হবে কোনো দিন ভাবতে পারিনি।’ বৃদ্ধার কথা শুনেই মনে পড়ল গ্রামের গলি দিয়ে হাঁটার সময় পোড়ো হাভেলির মধ্যে মসজিদের মিনার দেখেছি। আর তার ঠিক পাশ থেকেই ভেসে আসছিল ভজনের সুর। ইতোমধ্যে কাছে আসেন নিহত ওমরের বড় ছেলে মকসুদ। সে-ই এখন ঠাকুমা আর মা খুর্শিদাকে নিয়ে আটজনের পরিবারের কর্তা। টলোমলো পায়ে ততক্ষণে মকসুদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে মকসুদের ছয় ভাইবোনের মধ্যে ছোট জন। মকসুদের অভিযোগ, তার বাবার খুনিদের আড়াল করছে পুলিশ। খুনের মামলায় অভিযুক্তও দু মাসের মাথায় জামিন পেয়েছে। ক্ষোভ উগড়ে দিয়ে মকসুদ বলেন, ‘ক্ষতিপূরণ দেওয়া দূরের কথা, সরকার থেকে কেউ আমাদের দেখতেও আসেনি।’ মকসুদের মতোই গোটা পাড়ার বক্তব্য গ্রামের প্রতিটি বাড়িতে কমপক্ষে ১০-১৫টা করে গরু বা মোষ আছে। দুধ বিক্রি করাই পেশা গোটা গ্রামের মানুষের। মাংস বিক্রি তারা করেন না। মকসুদ বলেন, ‘মোদি ভালো করবে ভেবেছিলাম। তাই আমরা সবাই লোকসভায় মোদিকে ভোট দিয়েছি। এবার আর নয়। এবার কংগ্রেসকেই ভোট দেব।’ প্রায় পাঁচ হাজার মানুষের বাস ওই গ্রামে। তারা সবাই কামান বিধানসভা কেন্দ্রের কংগ্রেস প্রার্থী জবাইদা খানকে ভোট দেবেন বলে মনস্থির করেছেন। এলাকার সরপঞ্চ শৌকত খান বলেন, ‘শুধু এই গ্রাম নয়, আশপাশের সব গ্রামের মুসলমান ভোটাররা এবার বিজেপির বিরুদ্ধে ভোট দেবেন।’

সংখ্যালঘু জনসংখ্যা রাজস্থানে মাত্র ৯ শতাংশ হওয়ায়, এর আগে কোনো দিন এই মাত্রায় ধর্মীয় মেরূকরণ দেখা যায়নি। বরং ধর্মের আগে স্থানীয় রাজনৈতিক সমীকরণকে মাথায় রেখেই ভোট দিয়েছেন এখানকার মুসলমান ভোটাররা। কিন্তু উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের হাতে পহলু খান, ওমর খান বা রাকবর খানের খুন হওয়ার ঘটনা যে অনেকটাই ধর্মীয় মেরূকরণ তৈরি করেছে তা স্বীকার করলেন জবাইদা খান। ওমরের গ্রাম থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরে রাজস্থান সীমানায় হরিয়ানার কোলগাঁওতে বাড়ি রাকবরের। তার বিধবা স্ত্রী আশিয়ানা এবং বাবা সুলেমান এক সুরেই বললেন, ‘লোকসভা ভোটে বিজেপিকে এখান থেকে আর কেউ ভোট দেবে না।’ রাজস্থানের যে জেলাগুলোতে সংখ্যালঘু ভোট নির্ণায়ক ভূমিকা নিতে পারে, সেই আলওয়ার (১৫ শতাংশ), জয়শলমের (২৫ শতাংশ), ভারতপুর (১৪ শতাংশ), নাগৌর (১৪ শতাংশ) এবং শেখাওয়াটি এলাকার শিকর, চুরু এবং ঝুনঝুনির মত সাতটি জেলার বাইরেও এই ধর্মীয় মেরূকরণের প্রভাব পড়েছে হরিয়ানা-উত্তর প্রদেশের একটা বড় এলাকায়। যদিও তা নিয়ে একটুও ভাবিত নন তথাকথিত গো-রক্ষকরা। আলওয়ারের রামগড় বাজারে, যেখানে রাকবরকে খুন করা হয়েছিল, সেখানে দেখা হলো মোহন শর্মার সঙ্গে। নিজেকে বজরং দলের স্থানীয় নেতা হিসাবে পরিচয় দেওয়া মোহনের দাবি, ‘গো-হত্যা কোনোভাবেই বরদাশত করা যাবে না। যা হয়েছে তা জনগণের রোষে হয়েছে। তার আরো দাবি, ‘দুধের জন্য নয়, মাংসের জন্যই গরু পালন করে ওই মেওয়াটি সংখ্যালঘুরা।’

স্বঘোষিত এই গোরক্ষকদের কথা শুনে মনে পড়ল, দিল্লি এবং জাতীয় রাজধানী অঞ্চলে মেওয়াটিদের দুর্নাম রয়েছে গবাদি পশুর লুটেরা হিসাবে। ট্রাক নিয়ে গরু লুট করতে গিয়ে পুলিশের গুলিতে প্রাণও গেছে অনেক দুষ্কৃতের। তবে দিল্লি বা উত্তর প্রদেশের কোনো পুলিশ কর্তাই দাবি করেননি যে, ওই লুটেরাদের তালিকাতে কোনো হিন্দুর নাম নেই।

"