আ.লীগে সৈয়দ পরিবারের চার প্রার্থী, বিএনপিতে ছড়াছড়ি

প্রকাশ : ১৬ নভেম্বর ২০১৮, ০০:০০

আকিব হৃদয়, কিশোরগঞ্জ

নবম সংসদ নির্বাচনের আগে সীমানা পুনর্বিন্যাস কিশোরগঞ্জ সদরে সঙ্গে হোসেনপুর উপজেলাকে সংযুক্ত করে তৈরি হয়েছে কিশোরগঞ্জ-১ আসন। ফলে জেলার সাতটি সংসদীয় এলাকা থেকে কমিয়ে আসন সংখ্যা দাঁড়িয়ে ছয়টিতে। এই আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৪ লাখ ২৫ হাজার ৪ জন। জেলার ছয়টি আসনের মধ্যে কিশোরগঞ্জ-১ আসনটি গুরুত্বপূর্ণ। মুক্তিযুদ্ধকালীন সরকারের প্রথম অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম স্বাধীনতার পর প্রথম সংসদ নির্বাচনে সদর থেকে নির্বাচিত হন। গত তিনবারের ধারাবাহিকতা বর্তমানে তারই পুত্র জনপ্রশাসন মন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সাবেক সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম এই আসনের এমপি।

সংসদীয় নির্বাচনী ইতিহাস থেকে জানা যায়, স্বাধীনতার পর দশটি সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ছয়বার, বিএনপি তিনবার ও জাতীয় পার্টি একবার এই আসন থেকে বিজয়ী হয়। স্বাধীনতার পর দ্বিতীয় সংসদে ১৯৭৯ সালে বিএনপির ডা. ফজলুল করিম, ১৯৮৬ সালে আওয়ামী লীগের অ্যাডভোকেট ফজলুর রহমান, ১৯৮৮ সালে জাতীয় পার্টির আলমগীর হোসেন, ১৯৯১ সালে বিএনপির মাওলানা আতাউর রহমান খান, ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপির মাসুদ হিলালী, একই বছরের ১২ জুন অনুষ্ঠিত নির্বাচনে এবং ২০০১, ২০০৮ ও ২০১৪ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম পর পর নির্বাচিত হন।

গত কয়েকটি সংসদ নির্বাচনে এই আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী মনোনয়ন নিয়ে কোনো উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা দেখা যায়নি। বরাবরই সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের বিকল্প কোনো প্রার্থীর নাম কখনো সামনে আসেনি। নেতাকর্মীরা ধরেই নেন যে, সৈয়দ আশরাফই শেষ কথা। তবে সৈয়দ আশরাফের শারীরিক অসুস্থতা ও বিদেশে চিকিৎসাধীন থাকায় এবার হিসাব-নিকাশ বদলেছে। এ বছর কিশোরগঞ্জ-১ (সদর-হোসেনপুর) একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মোট ১১ জনের পক্ষে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন ফরম জমা দেওয়া কথা জানা গেছে। এর মধ্যে চারজনই সৈয়দ পরিবারের সদস্য।

সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম ছাড়াও তার দুই সহোদর মেজর জেনারেল (অব.) সৈয়দ সাফায়েতুল ইসলাম ও লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. সৈয়দ মঞ্জুরুল ইসলাম। এছাড়া চাচাতো ভাই অ্যাডভোকেট সৈয়দ আশফাকুল ইসলাম টিটু দলীয় মনোনয়ন ফরম জমা দিয়েছেন। সৈয়দ পরিবারের এই চার সদস্যের বাইরে আরো সাতজন। এর মধ্যে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের মেজো ছেলে রাসেল আহমেদ তুহিনও এই তালিকায় রয়েছেন।

এছাড়া আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশীরা হলেন কেন্দ্রীয় উপকমিটির সম্পাদক ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারী কৃষিবিদ মশিউর রহমান হুমায়ুন, কিশোরগঞ্জ পৌর মেয়র মাহমুদ পারভেজ, সদর উপজেলার আওয়ামী লীগের সম্পাদক ও বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারী অবসর সুবিধা বোর্ডে সদস্য সচিব অধ্যক্ষ শরীফ সাদী, স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদ (স্বাচিপ) জেলা সভাপতি ডা. দীন মোহাম্মদ, কৃষক লীগ ও কেন্দ্রীয় কমিটির মহিলা বিষয়ক সম্পাদক অধ্যক্ষ গোলশান আরা বেগম এবং আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক লীগ কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-পাঠাগার সম্পাদক অধ্যক্ষ এম এ হান্নান।

তবে স্থানীয় অনেক নেতাকর্মীই মনে করেন নির্বাচনের আগে সুস্থ হয়ে সৈয়দ আশরাফ দেশে ফিরে আসবেন এবং এই আসনের হাল ধরবেন। দলের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ছাড়াও এলাকায় তার ক্লিন ইমেজ ও কিশোরগঞ্জ লেকসিটির রূপকার খ্যাতিকেই অবলম্বন মনে করছে তারা।

গত ছয় মাসাধিককাল ধরে ‘নৌকার পক্ষে’ ভোট চেয়ে ইউনিয়ন পর্যায়ে কর্মী সমাবেশ ও গ্রাম পর্যায়ে উঠান বৈঠক করে চলেছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ মেডিকেল কলেজের পরিচালক রাষ্ট্রপতির মেঝো পুত্র রাসেল আহমেদ তুহিন। ইদানীং তিনি রাজনীতিতে সক্রিয় হলেও তার সঙ্গে রয়েছে বিশাল কর্মী বাহিনী। প্রতিটি সমাবেশকে ঘিরেই ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা ও ব্যাপক লোক সমাগম হচ্ছে। গত ২৮ অক্টোবর কিশোরগঞ্জ পুরনো স্টেডিয়ামে আয়োজিত বিশাল জনসভায় রাসেল আহমেদ তুহিন প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। এখন পর্যন্ত ছোট বড় সব মিলিয়ে ৯০টি কর্মী সমাবেশ ও সমাবেশ করেছে।

একান্ত সাক্ষাৎকারে প্রতিদিনের সংবাদকে রাসেল আহমেদ তুহিন বলেন, আমি বিভিন্ন সমাবেশে সরকারের উন্নয়নমূলক কর্মকা-ের প্রচারণা করি এবং ‘নৌকার পক্ষে’ ভোট চাই। নিজের প্রার্থিতা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, জনগণ যদি চায় এবং দল যদি তাকে মনোনয়ন দেয় তাহলে তিনি কিশোরগঞ্জ-১ আসন থেকে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে নিজেকে জনসেবায় নিয়োজিত করতে আগ্রহী।

এদিকে ১৪ দলীয় জোটের শরিক দল গণতন্ত্রী পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতিম-লীর সদস্য ও জেলা কমিটির সভাপতি অ্যাডভোকেট ভূপেন্দ্র চন্দ্র ভৌমিক এই আসন থেকে মনোনয়নপ্রত্যাশী। এলাকায় ব্যাপক পোস্টারিং করেছেন তিনি। তিনি বলেন, দলের সিদ্ধান্ত মোতাবেকই প্রচারণা চালাচ্ছি। এ বছর শরিক দল হিসেবে ৫টি সিট গণতন্ত্রী পার্টির জন্য ছেড়ে দেওয়া হবে বলে দলীয় হাইকমান্ডের ধারণা। তিনি নরসুন্দা নদী সংস্কারে ব্যাপক অনিয়ম ও লুটপাট হয়েছে দাবি করে যথাযথভাবে নদী খনন, সড়ক সংস্কার এবং জেলা শহরে ইজিবাইক চলাচলে নিয়ন্ত্রণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

এই আসন থেকে ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপি থেকে এমপি নির্বাচিত হয়েছিলেন জেলা কমিটির সাবেক সম্পাদক মাসুদ হিলালী। দলের সাংগঠনিক তৎপরতা থেকে তিনি এখন অনেকটা দূরে। তবে তৃণমূল কর্মীদের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রয়েছে। তিনি বর্তমানে দলের জেলা কমিটির সহ-সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন। দল মনোনয়ন দিলে তিনি এবারও নির্বাচন করতে আগ্রহী। এছাড়া গুরুদয়াল সরকারি কলেজ ছাত্র সংসদের সাবেক দুই ভিপি হাজী ইসরাইল মিঞা ও খালেদ সাইফুল্লাহ সোহেলও নির্বাচনে প্রার্থী হতে আগ্রহী। বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে আর যাদের নাম আলোচনায় রয়েছে তারা হলেন জেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ওয়ালিউল্লাহ রাব্বানী, জেলা বিএনপির সহ-সভাপতি রেজাউল করিম খান চুন্নু প্রমুখ।

"