আওয়ামী লীগের দুর্ভেদ্য ঘাঁটিতে বিএনপির হাফডজন প্রার্থী

প্রকাশ : ১৫ নভেম্বর ২০১৮, ০০:০০

সুমন কর্মকার, ফকিরহাট (বাগেরহাট)

মধুমতী পারের বাগেরহাট-১ আসনটি বরাবরই আওয়ামী লীগের দুর্ভেদ্য ঘাঁটি। বিগত সময়ে মুসলিম লীগ, জাতীয় পার্টি বা বিএনপি এই এলাকায় রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তার করতে গিয়ে হোঁচট খেয়েছে বারবার। এই আসন থেকে খোদ আওয়ামী লীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনা দুইবার নির্বাচিত হন। ফলে এই আসনের দিকে সব সময়ই বিশেষ দৃষ্টি দেওয়া হয়।

সপ্তম থেকে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন পর্যন্ত টানা চারটি মেয়াদে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভ্রাতুষ্পুত্র শেখ হেলাল উদ্দিন এই আসনে আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য। এদিক দিয়ে আগামী নির্বাচনেও আসনটি বিরোধীদের জন্য দুর্ভেদ্য হয়ে থাকবে। তবে জাতীয় রাজনীতির পেক্ষাপটে বিএনপি এই আসনটি নিজেদের দখলে নিতে মরিয়া। স্থানীয় বিএনপি নেতারা মনে করেন, আগামী নির্বাচনের ভালো পরিবেশ থাকলে আসনটি তাদের দখলে আসবে।

আওয়ামী লীগের একক প্রার্থীর বিপরীতে বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশী কমপক্ষে চারজন। প্রার্থীদের মধ্যে জেলা বিএনপির তিন সহ-সভাপতি হলেন শেখ মুজিবর রহমান, অ্যাডভোকেট ওয়াহিদুজ্জামান দিপু, মেরিন ইঞ্জিনিয়ার অ্যাডভোকেট মাসুদ রানা। এছাড়া বিএনপি জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য, ঢাকা মহানগর যুগ্ম সম্পাদক ও ধানমন্ডি থানার সম্পাদক মো. রবিউল আলম ও মঞ্জুর মোর্শেদ স্বপন। মনোনয়ন কিনেছেন ফকিরহাট উপজেলা বিএনপির সভাপতি উপজেলা চেয়ারম্যান

শেখ শরিফুল কামাল কারিম এবং বাগেরহাট জেলা বিএনপির যুগ্ম সম্পাদক ও চিতলমারী উপজেলার মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান রুনা গাজী।

তাছাড়া জাতীয় পার্টির প্রার্থী হতে চান জাতীয় ওলামা পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সম্পাদক মাওলানা এস এম আল জুবায়েদ, ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলনের ফকিরহাট উপজেলার সম্পাদক মাস্টার ইদ্রিস আলী মির্জা ও মুজাহিদ কমিটির সম্পাদক মো. লিয়াকাত আলীসহ বিভিন্ন ব্যক্তি দলীয় মনোনয়ন পাওয়ার জন্য উচ্চ পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছেন।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী দেখা যায়, স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সালের সংসদ নির্বাচনে বাগেরহাট-১ আসন থেকে আওয়ামী লীগের এম এ খায়ের নির্বাচিত হন ন্যাপ (ভাসানী) প্রার্থী মুজিবুর রহমানকে পরাজিত করে। ১৯৭৯ ও ১৯৮৬ সালের নির্বাচিত আ.লীগ প্রার্থী এস এম লায়েকুজ্জামান প্রথমবার বিএনপি প্রার্থী ও দ্বিতীয় বার জাতীয় পার্টির প্রার্থীকে পরাজিত করেন। ১৯৯১ সালের নির্বাচিত হন আ.লীগের ডা. মোজাম্মেল হোসেন।

১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিনাভোটে বিএনপির প্রার্থী মুজিবুর রহমান নির্বাচিত হলেও আসন টিকে মাত্র তিন মাস। একই বছরের ১২ জুন সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা ৩০ হাজার ভোট বেশি পেয়ে নির্বাচিত হন। পরে শেখ হাসিনা আসনটি ছেড়ে দিলে চাচাতো ভাই শেখ হেলাল উদ্দীন উপনির্বাচনে এমপি নির্বাচিত হন।

বাগেরহাট-১ আসনে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের ভোটে মূল বিভাজন এনে দেয় চিতলমারী উপজেলার ‘সংখ্যালঘু’ ভোট। তাই স্থানীয়রা চিতলমারী উপজেলাকে বলে থাকেন ‘আওয়ামী লীগের ভোটব্যাংক’। বিগত সংসদ নির্বাচনগুলোর ফল বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ফকিরহাট ও মোল্লারহাট উপজেলায় এই দুই দলের ভোটের ব্যবধান তেমন বেশি থাকে না। ফলে বরাবরই জয়ের নিয়ামক হয়ে ওঠেন চিতলমারীর ভোটাররা। তাই বিরোধীদের এবারের বিশেষ মনোযোগ চিতলমারী উপজেলার ভোটারদের দিকেই থাকবে তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

২০০৮ সালের নবম সংসদ নির্বাচনে আ.লীগের দুইবার নির্বাচিত এমপি শেখ হেলাল উদ্দীন মামলাসহ নানা জটিলতায় দেশের বাইরে থেকে অংশ নেননি। এ অবস্থায় পুনরায় এই আসনে দলীয় প্রধান শেখ হাসিনা প্রার্থী হয়ে প্রায় ১ লাখ ভোট বেশি পেয়ে নির্বাচিত হন। পরে দেশে ফিরে উপনির্বাচনে শেখ হেলাল উদ্দীন পুনরায় এমপি হন। ২০১৪ সালের শেখ হেলাল উদ্দীন পরিপক্ষহীনভাবে নির্বাচিত হন। তার মেয়াদকালে এলাকার অবকাঠামোগত বিপুল উন্নয়ন কর্মকান্ড ভোটারদের আস্থা তৈরি করেছে বলে সাধারণ মানুষ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন।

বাগেরহাট-১ আসনে বিএনপির প্রার্থীকে হচ্ছেন তা নিয়ে ভোটারদের মাঝে কৌতূহল রয়েছে। বিগত দিনে বিএনপির প্রার্থী শেখ মুজিবুর রহমান একাধিকবার পরাজিত হয়েছেন। তার পরিবর্তে ২০০৮ সালে জেলা বিএনপির সহ-সভাপতি অ্যাডভোকেট শেখ ওয়াহিদুজ্জামান দিপুকে প্রার্থী করলেও রক্ষা হয়নি। তবে তিনি এবারও তিনি মনোনয়ন পেতে জোর প্রচেষ্টা শুরু করেছেন বলে জানা গেছে। এরই অংশ হিসেবে এলাকায় যোগাযোগ বাড়িয়েছেন এই বিএনপি নেতা। জানতে চাইলে অ্যাডভোকেট দিপু প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, ‘২০০৮ সালে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী হিসেবে মাইলফলক স্থাপন করা ভোট পেয়েছি, যা ছিল ৭০ হাজারের কাছাকাছি। এখন বিদ্যমান অবস্থায় আমাকে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী করা হলে যেকোনো প্রার্থীকে পরাজিত করার ব্যাপারে আমি শতভাগ আত্মবিশ্বাসী।’

বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশীর তালিকায় থাকা আরেক প্রার্থী জেলা বিএনপি নেতা ও সাবেক জাসাস নেতা মঞ্জুর মোর্শেদ স্বপন। চিতলমারী এলাকার বাসিন্দা এই নেতা বলেন, ‘এই আসনে নির্বাচন করার জন্য আমাকে যদি দলীয় মনোনয়ন দেওয়া হয় আর নির্বাচন সুষ্ঠু, সুন্দর ও নিরপক্ষ হয় তবে যেকোনো প্রার্থীকে হারিয়ে আমি জয়লাভ করতে পারব বলে আশা করি।’

রাজধানীর ধানমন্ডি থানা বিএনপির সম্পাদক শেখ রবিউল আলম মোল্লারহাটের সন্তান। প্রতিদিনের সংবাদকে তিনি বলেন, ‘আগামী একাদশ সংসদ নির্বাচনে বাগেরহাট-১ আসনে নির্বাচন করার জন্য দলীয় উচ্চ পর্যায়ের নেতাদের কাছে মনোনয়ন চাইব। এই আসনে আমাকে দিয়ে নির্বাচন করার জন্য দল আমাকে মনোনয়ন দেয় তবে নিশ্চয় নির্বাচনে অংশগ্রহণ করব। নিরপক্ষ নির্বাচন হলে আমি শতভাগ জয়ী হব বলে আমার বিশ্বাস।’

জাতীয় ওলামা পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সম্পাদক মাওলানা এস এম আল জুবায়েদ বলেন, ‘বাগেরহাট-১ আসন থেকে তিনিই একমাত্র জাতীয় পার্টিও মনোনয়নপ্রত্যাশী। আমাকে এই আসন থেকে নির্বাচনের জন্য মনোনয়ন দিলে যেকোন প্রার্থীর সঙ্গে লড়াই করে জয় নিশ্চিত করার চেষ্টা করব।’

সোনার হরিণ নামক দলীয় মনোনয়নকে পাবেন তা নিয়েও অনেকের রাতের ঘুম হারাম হয়ে পড়েছে। একমাত্র আওয়ামী লীগের কোনো দলীয় কোন্দল বা মতবিভেদ নেই। আর অন্য সব দলে কিছুটা মতবিভেদ দেখা দিলেও তা নিয়ে রীতিমতো অনেক সম্ভাব্য প্রার্থী দিশাহারা হয়ে পড়েছেন। ভোটাররা অপেক্ষা করছেন কোন দল থেকে কে মনোনয়ন পাচ্ছেন তা দেখার জন্য।

"