তাণ্ডবের এক বছর

ঠাকুরপাড়ায় এখনো আতঙ্ক

প্রকাশ : ১১ নভেম্বর ২০১৮, ০০:০০

আবদুর রহমান রাসেল, রংপুর

রংপুরের গংগাচড়ার ঠাকুরপাড়া গ্রামে তাণ্ডবের এক বছর পূর্ণ হলো গতকাল শনিবার। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ধর্মীয় অবমাননাকর পোস্ট দেওয়া কেন্দ্র করে গত বছরের ১০ নভেম্বর ওই এলাকায় ঘরবাড়ি ও মন্দিরে হামলা, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ এবং লুটপাটের ঘটনা ঘটে। সে সময় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ ও স্থানীয়দের সংঘর্ষে স্থানীয় এক যুবক নিহত এবং পুলিশসহ অন্তত অর্ধশতাধিক মানুষ আহত হন। সংঘর্ষের ঘটনায় পুলিশ গঙ্গাচড়া ও কোতোয়ালি থানায় দুইটি মামলা করে। মামলার এক বছর পেরিয়ে গেলেও দুই মামলার একটিরও প্রতিবেদন জমা দিতে পারেনি পুলিশ। এদিকে টিটু রায় জামিনে বেরিয়ে এলেও দিন কাটছে বেকার অবস্থায়। বন্ধ হয়ে পড়েছে টিটুর ছেলে সঞ্জয় রায়ের পড়ালেখাও। এক বছর ধরে ওই এলাকায় অস্থায়ী পুলিশ ক্যাম্প থাকলেও সেখানকার লোকজনের মাঝে আতঙ্ক কাটেনি এখনো।

সরেজমিন ঠাকুরপাড়ায় গিয়ে দেখা যায়, হামলার এক বছর পর বদলে গেছে ওই এলাকার চিত্র। সবকিছু আগের মতোই স্বাভাবিক। ভাঙচুরের শিকার ঘরবাড়ি ও মন্দিরগুলো সরকারি-বেসরকারি অনুদানে সংস্কার করা হয়েছে। নিরাপত্তার জন্য রয়েছে অস্থায়ী পুলিশ ক্যাম্প। দিন-রাত পুলিশ সদস্যরা এলাকায় টহল দেন।

কথা হয় হামলার শিকার দিনেশ রায়ের স্ত্রী মিনতি রায়ের সঙ্গে। তিনি বলেন, গত বছরের ঠাকুরপাড়ার হামলার ঘটনায় আমরা সব হারিয়েছি। আমাদের বাড়িঘর পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। গরু, ছাগল, হাঁস-মুরগি, ধান, চালসহ বাড়ির বিভিন্ন মালামাল লুটপাট করা হয়েছে। সরকারি-বেসরকারি অনুদানে আমাদের ক্ষতি পুরোপুরি পূরণ না হলেও আমরা ঘুরে দাঁড়াতে চেষ্টা করছি।

ঠাকুরপাড়ায় তাণ্ডবের ৪ দিন পর ১৪ নভেম্বর নীলফামারীর জলঢাকা থেকে গ্রেফতার হন টিটু রায়। এরপর আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন তিনি। প্রায় ৯ মাস কারাগারে বন্দি থাকার পর গত ৫ আগস্ট জামিনে ছাড়া পেয়েছেন তিনি। টিটু রায় জানান, জামিনে মুক্ত হয়ে মা ও স্ত্রী-সন্তান নিয়ে বাড়িতেই থাকছেন।

হামলা ও ভাঙচুরের শিকার হরকলি ঠাকুরপাড়া শিব মন্দির কমিটির সাধারণ সম্পাদক নুপুর গোস্মামী বলেন, হামলা-ভাঙচুরের কারণে আমরা দুর্বল হয়ে পড়েছিলাম। সরকারি-বেসরকারি সহযোগিতায় আমরা আবার ঘুরে দাঁড়িয়েছি। মন্দিরেরও সংস্কার করা হয়েছে। তবে আমাদের মনের ভয় এখনো পুরোপুরি কাটেনি। অস্থায়ী পুলিশ ক্যাম্পটি স্থায়ীকরণেরও দাবি জানান তিনি।

এলাকার পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক রয়েছে দাবি করে পুলিশ ক্যাম্পের ইনচার্জ এ কে এম আবদুল মান্নান জানান, অস্থায়ী এই ক্যাম্পে দিন-রাতে ১৩ জন করে পুলিশ সদস্য দায়িত্ব পালন করছেন। আমরা সার্বক্ষণিক টহল অব্যাহত রেখেছি। এলাকায় কোনো ধরনের সমস্যা নেই। চলতি বছর এ এলাকায় মহা ধুমধামে দুর্গাপূজা হয়েছে। এদিকে, হামলার এক বছরেও দুই মামলার একটিরও প্রতিবেদন আদালতে জমা দিতে পারেনি পুলিশ। এসব মামলায় গ্রেফতার হওয়া বেশিরভাগ আসামিই জামিনে মুক্ত রয়েছেন। তবে পুলিশের দাবি, সঠিক বিচার কাজের স্বার্থে ঘটনার ব্যাপক তদন্ত করা হচ্ছে। এ কারণেই প্রতিবেদন জমা দিতে দেরি হচ্ছে।

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা গংগাচড়া মডেল থানা পুলিশের উপপরিদর্শক (এসআই) মিজানুর রহমান মিজান জানান, ঠাকুরপাড়া হামলার ঘটনায় ৭৬ জনের নাম উল্লেখপূর্বক অজ্ঞাতনামাদের আসামি করে মামলা করা হয়েছে। এর মধ্যে বিভিন্ন সময়ে ৫১ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। গ্রেফতারদের মধ্যে জেলা পরিষদের উপসহকারী প্রকৌশলী ফজলার রহমানসহ চারজন আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন। রংপুর সদর থানা পুলিশের উপপরিদর্শক (এসআই) জাবেদ আলী জানান, এ ঘটনায় ৮৩ জনের নাম উল্লেখপূর্বক অজ্ঞাতনামাদের আসামি করে মামলা করা হয়েছে। এর মধ্যে ৪২ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। মাসুদ রানা নামে এক আসামি ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন। মামলার তদন্ত কাজ শেষ পর্যায়ে। দ্রুত এই মামলার পুলিশ প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করা হবে।

এ ব্যাপারে রংপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (এ সার্কেল) সাইফুর রহমান সাইফ বলেন, মামলা আমরা নিবিড়ভাবে তদন্ত করছি। পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে সব সাক্ষ্য-প্রমাণ ও ভিডিও ফুটেজ আমরা তদন্ত করছি। সঠিক তদন্তের কারণে একটু সময় লাগছে। নির্দিষ্ট করে সময় বলা যাচ্ছে না, তবে দ্রুত মামলা দুইটির প্রতিবেদন আদালতে জমা দেওয়া হবে।

 

"