২ দলেই একাধিক প্রার্থী জাপাসহ বহু দল মাঠে

প্রকাশ : ০৯ নভেম্বর ২০১৮, ০০:০০

শামীম রেজা ডাফরুল, গোবিন্দগঞ্জ (গাইবান্ধা)

উত্তরাঞ্চলে হাল্কা শীতের আমেজে জমে উঠেছে গাইবান্ধা-৪ (গোবিন্দগঞ্জ) আসনে নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণা। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে দিন যতই ঘনিয়ে আসছে ততটাই তীব্র হচ্ছে মনোনয়নপ্রত্যাশীদের তৎপরতা। গ্রামে-গঞ্জে, হাটবাজারে শোডাউন, সভা-সমাবেশ করছেন তারা। গোবিন্দগঞ্জে আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টির নেতাকর্মীরা সরবে আর বিএনপি, জামায়াত কর্মীরা নীরবে প্রচার-প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছে।

রংপুর বিভাগের প্রবেশ দ্বার গাইবান্ধার বৃহৎ উপজেলা গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার ১টি পৌরসভা ও ১৭টি ইউনিয়ন নিয়ে গাইবান্ধা-৪ আসন। এ আসনে কোনো দলেরই একক প্রভাব নেই। স্বাধীনতার পর এ আসনে আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি, বিএনপি এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীরা সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। ১৯৭৩ সালে আওয়ামী লীগ প্রার্থী অ্যাডভোকেট শাহ জাহাঙ্গীর কবির, ১৯৭৯ সালে বিএনপির সিরাজুল ইসলাম, ১৯৮৬ সালে স্বতন্ত্র প্রার্থী লুৎফর রহমান চৌধুরী, ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালে জাতীয় পার্টির লুৎফর রহমান চৌধুরী, ২০০১ সালে বিএনপির আবদুল মোত্তালিব আকন্দ, ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ প্রার্থী প্রকৌশলী মনোয়ার হোসেন চৌধুরী এবং ২০১৪ সালে স্বতন্ত্র প্রার্থী (আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী) অধ্যক্ষ আবুল কালাম আজাদ সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এ ছাড়া স্বতন্ত্র প্রার্থী আতাউর রহমান বেলাল, উপনির্বাচনে শামীম কায়ছার লিংকন এবং ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপি প্রার্থী আবদুল মান্নান মন্ডল এমপি নির্বাচিত হয়েছিলেন। প্রায় সাত লাখ জন অধ্যুষিত এ আসনে বর্তমানে মোট ভোটার সংখ্যা তিন লাখ ৮৬ হাজার ২৬২ জন।

আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশী : আসন্ন নির্বাচনে এ আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশী পাঁচজন। তবে একাধিক প্রার্থী হওয়ায় চিন্তায় ভাঁজ পড়েছে সবার কপালে। মনোনয়ন প্রাপ্তির প্রতিযোগিতায় দ্বিধা-বিভক্ত ও কোন্দলে জড়িয়ে পড়ছে উপজেলা আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। দলীয় কর্মসূচিও পালিত হচ্ছে আলাদাভাবে।

মনোনয়নপ্রত্যাশীরা হলেন বর্তমান এমপি ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি অধ্যক্ষ আবুল কালাম আজাদ, সাবেক এমপি প্রকৌশলী মনোয়ার হোসেন চৌধুরী, পৌর মেয়র ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সম্পাদক মো. আতাউর রহমান সরকার, যুগ্ম সম্পাদক ও মহিমাগঞ্জ ইউপি চেয়ারম্যান আবদুুল লতিফ প্রধান এবং কেন্দ্রীয় স্বেচ্ছাসেবক লীগের পাট ও বস্ত্রবিষয়ক সম্পাদক নাজমুল ইসলাম লিটন।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালেই রাজনীতিতে যুক্ত হওয়া অধ্যক্ষ আবুল কালাম আজাদ প্রথমে জাসদ-বাসদের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত থাকলেও ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগে যোগদান করেন। পরে গুমানীগঞ্জ ইউপিতে দুইবার চেয়ারম্যান, বিআরডিবির চেয়ারম্যান, পৌর মেয়র ও উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে উপজেলা চেয়ারম্যান পদে ইস্তফা দিয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে অংশগ্রহণ করে আওয়ামী লীগ মনোনিত প্রার্থী প্রকৌশলী মনোয়ার হোসেন চৌধুরীকে পরাজিত করেন। ২০১৬ সালে আওয়ামী লীগের কাউন্সিলে তাকে উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত করা হয়।

গোবিন্দগঞ্জে দ্বিধা বিভক্ত আওয়ামী লীগের ভিত মজবুত করা কথা জানিয়ে অধ্যক্ষ আবুল কালাম আজাদ প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, ‘গোবিন্দগঞ্জ উপজেলাবাসীর সুখে-দুঃখে আগেও ছিলাম, এখনো আছি। জনগণকে সঙ্গে নিয়ে বিএনপি-জামায়াতের জ্বালাও-পোড়াও প্রতিহত করেছি। এখানে দলীয় কোনো চাঁদাবাজি নেই। ব্যবসায়ীসহ সাধারণ মানুষ এখানে শান্তিতে রয়েছে। উন্নয়নও হয়েছে প্রচুর। বঙ্গবন্ধুর আদর্শের সৈনিক ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি হিসেবে আগামী একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আমিই নৌকা মার্কার মনোনয়ন পাওয়ার দাবিদার।’

গাইবান্ধা-৪ আসনে মনোনয়ন পাওয়া ব্যাপারে শতভাগ আশা ব্যক্ত করে সাবেক এমপি প্রকৌশলী মনোয়ার হোসেন চৌধুরী বলেন, ‘স্বাধীনতার উত্তর অ্যাডভোকেট শাহ জাহাঙ্গীর কবিরের পর দীর্ঘ ৩৫ বছরে এ আসনে আওয়ামী লীগ থেকে কেউ নির্বাচিত হতে পারেনি। ৩৫ বছর পর আমিই আওয়ামী লীগ থেকে এমপি নির্বাচিত হয়ে আসনটি ছিনিয়ে এনেছি। নির্বাচিত হওয়ার আগে এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলী থাকাকালীন এবং নির্বাচিত হওয়ার পর এলাকায় ব্যাপক উন্নয়ন করেছি।’ আগামী নির্বাচনে তাকে মনোনয়ন দিলে তিনি ‘বিপুল ভোটে জয়লাভের আশা’ করেন।

গোবিন্দগঞ্জ পৌর মেয়র ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সম্পাদক আতাউর রহমান সরকার বলেন, ‘আমি গোবিন্দগঞ্জ পৌরসভা প্রতিষ্ঠার পর থেকে তিনবারের নির্বাচিত মেয়র। দীর্ঘ সময় পৌরসভার দায়িত্ব পালনকালে পৌর এলাকায় ব্যাপক উন্নয়ন করেছি। এখন আমি গোটা উপজেলায় উন্নয়ন করতেই নৌকা মার্কার মনোনয়ন পেতে আগ্রহী।’ মনোনয়ন পেলে জয়ী হওয়ার আশাবাদী তিনি।

উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক হিসেবে ব্যাপক পরিচিতি ও জনপ্রিয়তা আছে বলে দাবি করেন আবদুল লতিফ। এ ছাড়া মহিমাগঞ্জ ইউনিয়নের টানা তিনবারের চেয়াম্যান হওয়ার কথা উল্লেখ করেন প্রতিদিনের সংবাদকে তিনি বলেন, ‘এলাকার মানুষের সেবা এবং এলাকার উন্নয়নে নৌকা মার্কার প্রার্থী হতে চাই।’ মনোনয়ন দিলে জয়ী হবেন বলে তিনি জানান।

এ ছাড়া স্বেচ্ছাসেবক লীগের কেন্দ্রীয় নেতা আলহাজ নাজমুল ইসলাম লিটনও নৌকা মার্কার প্রার্থী হতে আগ্রহী। এ আসনে তাকে মনোনয়ন দিলে জয়ী হবেন বলে তিনি আশাবাদী।

বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশী

এদিকে, উপজেলা বিএনপির দীর্ঘদিনের সভাপতি ও ১৯৯৬ সালের প্রশ্নবিদ্ধ ১৫ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনে নির্বাচিত এমপি অধ্যক্ষ আবদুল মান্নান মন্ডলের গত জুন মাসে মারা গেলে এ আসনে বিএনপি এক জনপ্রিয় নেতাকে হারায়। এ ছাড়া ২০০১ সালের সংসদ নির্বাচনে বিএনপি প্রার্থী আবদুল মোত্তালিব আকন্দ এমপি নির্বাচিত হয়ে দলকে শক্ত ভিতের উপর দাঁড় করান। এমপি নির্বাচিত হওয়ার আগেই এলাকায় অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপন, চাকরিতে নিয়োগসহ স্থানীয় উন্নয়নে যুক্ত থাকায় তার জনপ্রিয়তা ছিল। কিন্তু ২০০৬ সালে তার মৃত্যুর পর তার জনপ্রিয়তার সূত্র ধরেই ছেলে শামীম কায়ছার লিংকন উপনির্বাচনে এমপি নির্বাচিত হন। তিনি একাদশ নির্বাচনেও বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশী।

বিএনপি থেকে আরো মনোনয়নপ্রত্যাশীরা হলেন উপজেলা বিএনপির সম্পাদক ও উপজেলা চেয়ারম্যান ফারুক কবির আহমেদ, বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্র্বাহী কমিটির সদস্য ও উপজেলা বিএনপির সহসভাপতি অধ্যাপক আমিনুল ইসলাম ও পৌর বিএনপির সভাপতি ফারুক আহমেদ।

পিতার উন্নয়ন ও জনপ্রিয়তার কথা উল্লেখ করে শামীম কায়ছার লিংকন প্রতিদিনের সংবাদকে জানান, আসন্ন নির্বাচনে যদি বিএনপি অংশগ্রহণ করে এবং বিএনপির চেয়ারপারসন যদি তাকে মনোনয়ন দেন, তবে তিনি এ আসনটি দলীয় প্রধানকে উপহার দিতে পারবেন। সেই লক্ষ্যে তার কর্মী-সমর্থকরা নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন বলে জানান।

টানা তিনবার ইউপি চেয়ারম্যান ও উপজেলা চেয়ারম্যান হওয়ায় জনপ্রিয়তা কথা উল্লেখ করে ফারুক কবির আহমেদ বলেন, ‘উপজেলা বিএনপির সভাপতি অধ্যক্ষ আবদুল মান্নান মন্ডলের মৃত্যুর পর আমি শক্ত হাতে দলের হাল ধরেছি। নেতাকর্মীদের মামলা-মোকদ্দমাসহ বিভিন্ন কাজে যথাসাধ্য সহযোগিতা করে যাচ্ছেন। আগামী নির্বাচনে দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া তাকে মনোনয়ন দিলে তিনি এ আসনটি খালেদা জিয়াকে উপহার দিতে পারবেন বলে আশাবাদী।’ তবে সবকিছুই নির্ভর করছে নির্বাচনের ব্যাপারে কেন্দ্রীয় নেতাদের সিন্ধান্তের ওপর।

মনোনয়নের আশায় দীর্ঘদিন থেকে দলীয় বিভিন্ন কর্মকান্ডসহ এলাকায় প্রচারণা চালানো কথা উল্লেখ করে বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশী অধ্যাপক আমিনুল ইসলাম প্রতিদিনের সংবাদকে জানান, রাজনৈতিক কারণে অনেকবার তিনি জেল জুলুম, নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এলাকায় তার ব্যাপক পরিচিতি রয়েছে। এ আসনে তাকে মনোনয়ন দিলে জয়ী হবেন বলে তিনি আশাবাদী।

জাতীয় পার্টির মনোনয়নপ্রত্যাশী

একসময়ে জাতীয় পার্টির ঘাঁটি হিসেবে খ্যাত গোবিন্দগঞ্জে টানা তিনবারের এমপি লুৎফর রহমান চৌধুরী দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মনোনয়নপত্র দাখিল করেও দলীয় চেয়ারম্যান এরশাদের নির্দেশে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করেন। পরে তিনি আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর জাতীয় পার্টিতে (জেপি) যোগদান করলে নেতৃত্বের শূন্যতায় পড়ে দলটি। বর্তমানে জাতীয় পার্টির (এরশাদ) কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ও উপজেলা শাখার সভাপতি কাজী মশিউর রহমান দলের হাল ধরেছেন। ইতোমধ্যে তিনি ওয়ার্ড, ইউনিয়ন কমিটি গঠন করে দলীয় সমর্থকদের উজ্জীবিত ও বিশাল কর্মী বাহিনী নিয়ে প্রচারণায় অংশ নিচ্ছেন। নিজেকে জাতীয় পার্টির চূড়ান্ত একক প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা দিয়ে প্রতিদিনের সংবাদকে জানান, এখনো হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের ব্যাপক জনপ্রিয়তা রয়েছে। আমার নেতৃত্বে এরশাদ সমর্থকরা উজ্জীবিত হয়ে উঠেছে। আগামী নির্বাচনে হারানো আসন ফিরে পেতে আমি চ্যালেঞ্জে নেমেছি।’

অন্যান্য দলের মনোনয়নপ্রত্যাশী

জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জাসদ (ইনু) প্রার্থী উপজেলা জাসদের সভাপতি সেকেন্দার আলী, ইসলামী শাসনতন্ত্র যুব আন্দোলনের জেলা শাখার সভাপতি ও কেন্দ্রীয় পরামর্শ প্রতিষ্ঠানের সদস্য হাফেজ মাওলানা মুফতি সৈয়দ তৌহিদুল ইসলাম তুহিন আগামী একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চূড়ান্ত প্রার্থী হিসেবে প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন। এদিকে কোণঠাসা জামায়াত ইসলামীর প্রকাশ্য তৎপরতা নেই। তবে দলীয় সূত্র জানায়, জোটবদ্ধ নির্বাচন হলে এই আসনে তাদের প্রার্থী ডা. আবদুর রহিম চূড়ান্ত মনোনিত প্রার্থী। অন্যথায় স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবেও নির্বাচন করতে আগ্রহী। এ লক্ষ্যে কিছু এলাকায় তার পক্ষে ব্যানার, পোস্টার লাগিয়ে প্রচার-প্রচারণা চালাতে দেখা যায়।

"