জোটের প্রার্থী অনেক বিএনপিতে দুই

প্রকাশ : ০৭ নভেম্বর ২০১৮, ০০:০০

কাজী আবুল মনসুর, চট্টগ্রাম ব্যুরো

চট্টগ্রাম-৮ (বোয়ালখালী-চান্দগাঁও, পাঁচলাইশ আংশিক) আসনের বর্তমান সংসদ সদস্য মাঈন উদ্দিন খান বাদল। জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ)-এর একাংশের সভাপতি তিনি। ১৪ দলীয় মহাজোটের হয়ে নবম ও দশম জাতীয় সংসদে তিনি নৌকা প্রতীক নিয়ে পরপর দুবার এমপি হয়েছেন। কিন্তু মহাজোটের শরিক দল জাসদ এখন বিভাজিত ও দ্বিখন্ডিত রাজনৈতিক দল। ফলে এই রাজনৈতিক দলকে মোর্চায় ভিড়িয়ে কতটুকু লাভ হবে, সেই কথা এবার ভাবতেও পারে জোটের নেতৃত্বে থাকা ক্ষমতাশীন আওয়ামী লীগ।

এ প্রসঙ্গে জাসদ কার্যকরী কমিটির সভাপতি মঈন উদ্দিন খান বাদল বলেন, ‘আমি ও ইনু সাহেব দুজনই ১৪ দলের সূচনাকারী। দল ভেঙে গেলেও দুজন এখনো ১৪ দলে। এর মধ্যেও মহাজোটে সাধ্যমতো ভূমিকা রাখার চেষ্টা করছি। আওয়ামী লীগ যদি বাংলাদেশের বাস্তবতায় জোট নিয়ে নির্বাচন করে আমি সেখানে আছি। আমি বলেছি, আমি মঈন উদ্দিন প্রার্থী হাজির। আওয়ামী লীগ নেত্রী যদি সিদ্ধান্ত নেন তিনি মহাজোট রাখবেন না, এককভাবে নির্বাচন করবেন। তা তিনি নিতেই পারেন এমন সিদ্ধান্ত। যদি তাই হয়, আমি প্রার্থী নই। আমি আওয়ামী লীগ কিংবা নৌকার প্রার্থী হব না।’

এদিকে মহাজোটের শরিক দল জাসদ থেকে এই আসনে বাদলকে প্রার্থী না করলে মনোনয়ন দৌড়ে থাকবেন চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মোসলেম উদ্দিন আহমদ, নগর আওয়ামী লীগের সিনিয়র যুগ্ম সম্পাদক এম রেজাউল করিম চৌধুরী, কোষাধ্যক্ষ সিডিএ চেয়ারম্যান আব্দুচ ছালাম, কুয়েতে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত এস এম আবুল কালাম এবং প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী নুরুল ইসলাম বিএসসির ছেলে মুজিবুর রহমান।

আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশী চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মোসলেম উদ্দিন আহমদ বলেন, ‘এমপি বাদল এলাকার তেমন কোনো উন্নয়ন করতে পারেননি। তিনি আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের মধ্যে বিভক্তি ছড়িয়ে ফায়দা নিচ্ছেন।

আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে নেতাকর্মীরা ও এলাকাবাসী আমাকে জনপ্রতিনিধি হিসেবে চাইছে। তবে কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত।’

এদিকে ২০০৮ সালের ৯ম সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন চেয়েছিলেন আব্দুচ ছালাম। মহাজোটের স্বার্থ বিবেচনায় এই আসনে মনোনয়নবঞ্চিত হলে পরবর্তীতে তাকে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) চেয়ারম্যান করে সরকার। ২০০৯ সালের এপ্রিল থেকে অদ্যাবধি তিনি সিডিএর চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এ সময়ের মধ্যে তার দায়িত্বের মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে ছয়বার।

ছালামের সর্বশেষ মেয়াদ শেষে একসময়ের তুখোড় ছাত্রনেতা আওয়ামী পরিবারের ত্যাগী ও পরীক্ষিত মানুষ রেজাউল করিম চৌধুরীকে সিডিএর নতুন চেয়ারম্যান করার বিষয়টি প্রায় চূড়ান্ত। শেষ পর্যন্ত পাল্টে যায় সব হিসাব-নিকাশ। গত বছরের এপ্রিলে আবারও দুই বছরের জন্য চেয়ারম্যান নিয়োগ পান আব্দুচ ছালাম। সিডিএর ব্যানারে চট্টগ্রামে উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখতে আব্দুচ ছালামকেই বরাবর উপযুক্ত মনে করছে আওয়ামী লীগ সরকার। অন্যদিকে সিডিএর চেয়ারম্যান পদ হাতছাড়া করা রেজাউল করিমকে ভবিষ্যতে বড় পরিসরে মূল্যায়ন করা হবে বলে আশ্বস্ত করা হয় ওপরের মহল থেকে। সেই হিসেবে আশা করা হচ্ছে রেজাউল করিম চৌধুরীই জীবনের পড়ন্তবেলায় মূল্যায়িত হতে পারেন আসন্ন সংসদ নির্বাচনে।

এদিকে এই আসনে বিএনপির মনোনয়ন দৌড়ে এগিয়ে আছেন সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান এম মোর্শেদ খান। মামলার কারণে তিনি কিছুটা বেকায়দায় আছেন। নিয়মিত এলাকায় যেতে না পারলেও নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন নিয়মিত। তবে ‘বয়স্ক, অসুস্থ’ নেতাদের মনোনয়ন দেওয়া থেকে দলীয় হাইকমান্ড বিরত থাকলে এই আসনে মনোনয়ন পেতে পারেন চট্টগ্রাম নগর বিএনপির সিনিয়র সহসভাপতি আবু সুফিয়ান। রাজনীতির মাঠে ‘গুরু-শিষ্য’ হিসেবে পরিচিত এম মোরশেদ খান ও আবু সুফিয়ান।

এই আসনে মোর্শেদ খান নির্বাচন না করলে আবু সুফিয়ান যে কারণে মনোনয়ন পাবেন তা হচ্ছে, আবু সুফিয়ান যখন চট্টগ্রাম মহানগর ছাত্রদলের সভাপতি তখন চট্টগ্রাম নগর বিএনপির বর্তমান সভাপতি ডা. শাহাদাত হোসেন ছাত্রদল মহানগরের ক্ষুদ্র ইউনিট চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ ছাত্রদলের সভাপতি। আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীকে সভাপতি ও ডা. শাহাদাত হোসেনকে সম্পাদক করে ৬ বছর আগে ঘোষিত চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির কমিটিতে আবু সুফিয়ানকে সিনিয়র সহসভাপতি করা হয়। পরবর্তীতে দেখা গেল নতুন কমিটিতে ডা. শাহাদাত হোসেনকে সভাপতি, আর সম্পাদক চট্টগ্রাম নগর যুবদলের প্রাক্তন সভাপতি আবুল হাশেম বক্কর। এই কমিটিতেও বরাবর সিনিয়র সহসভাপতি আবু সুফিয়ান।

দলীয় সূত্র জানিয়েছে, ডা. শাহাদাত হোসেনের কমিটিতে আবু সুফিয়ানকে সম্পাদক করার প্রস্তাব এসেছিল। কিন্তু রাজনীতিতে অপেক্ষাকৃত জুনিয়র শাহাদাতের সঙ্গে সম্পাদক হওয়ার প্রস্তাবটি কষ্ট নিয়ে ফিরিয়ে দেন আবু সুফিয়ান। রাজনীতি সচেতনদের মতে, বারবার বঞ্চনার শিকার আবু সুফিয়ানকে আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে মনোনয়ন দিয়ে তার ত্যাগ ও ধৈর্যের মূল্যায়ন করতে পারে হাইকমান্ড।

চট্টগ্রাম নগর বিএনপির সিনিয়র সহসভাপতি আবু সুফিয়ান বলেন, ‘চট্টগ্রাম-৮ আসনে এম মোর্শেদ খান কোনো কারণে নির্বাচন করতে না পারলে আমি দলের মনোনয়ন চাইব। এজন্য আমি প্রাথমিক প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছি।’

চট্টগ্রাম নগর বিএনপির সভাপতি ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, ‘কোন আসনে কে প্রার্থী হচ্ছেনসহ নির্বাচনের পুরো বিষয়ে কেন্দ্রের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় আছি আমরা। তবে আমাদের দাবি নিরপেক্ষ নির্বাচনের ব্যবস্থা করতে হবে। এর মাধ্যমে দেশ আবার গণতান্ত্রিক ধারায় ফিরে আসবে বলে আমরা আশাবাদী।’

এদিকে বিএনপি থেকে বহিষ্কৃৃত মহানগর বিএনপির সাবেক যুগ্ম সম্পাদক এরশাদ উল্লাহ চট্টগ্রাম-৮ আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করতে পারেন। তিনি নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করেন মঈন উদ্দিন খান বাদলের কাছে পরাজিত হন। ২০১২ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারিতে বোয়ালখালীতে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য এম কে আনোয়ার ও এম মোর্শেদ খানকে বহনকারী গাড়ি ভাঙচুর করার অভিযোগে দল থেকে বহিষ্কৃৃৃত হয়েছিলেন এরশাদ উল্লাহ।

কর্ণফুলী নদীর কালুরঘাট সেতুর পশ্চিমে চান্দগাঁও ও পাঁচলাইশ আর পূর্বে বোয়ালখালীর ৭টি ইউনিয়ন ও ১টি পৌরসভা নিয়ে চট্টগ্রাম সংসদীয় আসন-৮। ১০টি সংসদ নির্বাচনে পাঁচবার বিএনপি, আওয়ামী লীগ তিন ও দুবার জাতীয় পাটির প্রার্থী নির্বাচিত হন। এ আসনে ভোটার ৪ লাখ ৭০ হাজার ৭২ জন। এর মধ্যে নারী ২ লাখ ৩০ হাজার।

 

"