আ.লীগের দুর্গে ভাগ চায় জাপা পুনরুদ্ধারে মরিয়া বিএনপি

প্রকাশ : ২৩ অক্টোবর ২০১৮, ০০:০০

মুহাজিরুল ইসলাম রাহাত, সিলেট

পর্যটন ও পাথর বাণিজ্যসমৃদ্ধ নির্বাচনী এলাকা সিলেট-৪ আসন। স্থানীয় রাজনীতিতে আসনটি আওয়ামী লীগের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। আওয়ামী লীগের ইমরান আহমদ পাঁচবারের সংসদ সদস্য হওয়ার মধ্য দিয়ে এ অবস্থা তৈরি হয়েছে। একাদশ সংসদ নির্বাচনে তারই ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে চায় দলটি। তবে ‘সুষ্ঠু’ ভোট হলে আসনটি পুনরুদ্ধার করতে পারবে মনে করে বিএনপি। অন্যদিকে দশম সংসদ নির্বাচনে মহাজোটের স্বার্থে ছাড় দিলেও এবার আসনটি নিজেদের দখলে আনতে চায় জাতীয় পার্টি। বড় দুই দলের পাশাপাশি জাতীয় পার্টিসহ বিভিন্ন দলের সম্ভাব্য প্রার্থীরা জনসংযোগ শুরু করায় এর মধ্যেই বইছে নির্বাচনী হাওয়া।

দেশের সবচেয়ে বড় পাথর কোয়ারিসহ একাধিক কোয়ারিসমৃদ্ধ নির্বাচনী এলাকা সিলেট-৪ আসন। স্থানীয় রাজনীতিতে পাথর বাণিজ্যের একটা প্রভাব আছে। ফলে এ আসনের গুরুত্ব সিলেটের অন্য আসনগুলোর থেকে একটু বেশিই বলা চলে। জেলার গোয়াইনঘাট, জৈন্তাপুর ও কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা নিয়ে গঠিত এ আসনে রয়েছে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যেঘেরা জাফলং, পান্তুমাই, রাতারগুল, লালাখাল, খাসিয়াপুঞ্জিসহ দৃষ্টিনন্দন সব পর্যটন স্পট।

১৯৮৬, ১৯৯১, ১৯৯৬, ২০০৮ এবং সর্বশেষ ২০১৪ সালে সিলেট-৪ আসনে আওয়ামী লীগে থেকে এমপি নির্বাচিত হন ইমরান আহমদ। গত নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ‘বিদ্রোহী প্রার্থী’ যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী ফারুক আহমদকে পরাজিত করে পঞ্চমবারের মতো নির্বাচিত হন তিনি। তার আগের নির্বাচনে নৌকা প্রতীকে ১ লাখ ৪৪ হাজার ১৯৮ ভোট পেয়ে বিজয়ী হন ইমরান। সে সময় তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির দিলদার হোসেন সেলিম পেয়েছিলেন ৯৮ হাজার ৫৪৫ ভোট। ২০০১ সালের সংসদ নির্বাচনে বিএনপির দিলদার হোসেন সেলিম প্রথমবারের মতো এমপি নির্বাচিত হন।

হিসাব অনুযায়ী, একাদশ সংসদ নির্বাচনে বর্তমান এমপি ইমরান আহমদ আওয়ামী লীগের এবং সাবেক এমপি দিলদার হোসেন সেলিম বিএনপির হেভিওয়েট প্রার্থী। তবে দুজনের বিরুদ্ধেই পাথররাজ্যে লুটপাটকারীদের মূল হোতা লিয়াকত ও শামীম বাহিনীকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। ভোটের মাঠে এসব বিষয় নিয়ে প্রশ্নের মুখে পড়তে পারেন তারা। তবে দুজনই অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, তারা কখনো কোনো পাথরখেকোকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দেননি।

স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পাঁচবারের এমপি ইমরান আহমদ আগামী নির্বাচনেও নৌকা প্রতীকে লড়বেন, তা প্রায় নিশ্চিত। ইমরান ছাড়াও এ আসনে নৌকা প্রতীকে নির্বাচন করতে চান সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক অ্যাডভোকেট মাহফুজুর রহমান, স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা অধ্যক্ষ ফজলুল হক ও যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী ফারুক আহমদ।

২০১৪ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী হিসেবে লড়াই করে হেরে যান যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী ফারুক আহমদ। এরপর তিনি আবার প্রবাসে চলে যান। বর্তমানে স্থানীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে তার তেমন যোগাযোগ নেই বলে জানা গেছে।

১৯৯৬ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন চেয়েছিলেন তৎকালীন আওয়ামী লীগ নেতা গোয়াইনঘাট উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান দিলদার হোসেন সেলিম। কিন্তু সেবারও দলের মনোনয়ন বাগিয়ে নেন ইমরান আহমদ। মনোনয়নবঞ্চিত হয়ে সেলিম বিদ্রোহী প্রার্থী হয়ে ইমরান আহমদের কাছে হেরে যান। পরে বিএনপিতে যোগ দেন তিনি। ২০০১ সালের নির্বাচনে ধানের শীষ নিয়ে বাজিমাত করেন দিলদার হোসেন সেলিম। ২০০৮ সালের নির্বাচনে দিলদার হোসেন ফের ইমরান আহমদের কাছে পরাজিত হন। একাদশ সংসদ নির্বাচনে এ আসনে দিলদার হোসেন সেলিম বিএনপির হেভিওয়েট প্রার্থী।

দিলদার হোসেন ছাড়াও বিএনপির প্রার্থী হিসেবে মাঠে রয়েছেন গোয়াইনঘাট উপজেলা চেয়ারম্যান আবদুল হাকিম চৌধুরী, সিলেট জেলা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট নুরুল হক ও বিএনপির কেন্দ্রীয় সহ-স্বেচ্ছাসেবক সম্পাদক অ্যাডভোকেট শামসুজ্জামান জামান। অন্যদিকে সিলেট-৪ আসনে মনোনয়ন চাওয়ার ব্যাপারে সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছেন জাপার প্রার্থী দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও সিলেট জেলা কমিটির আহ্বায়ক এটিইউ তাজ রহমান। এ আসন থেকে এককভাবে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে জাতীয় পার্টি (জাপা)। জোটবদ্ধ নির্বাচন হলে শরিকদের কাছে এ আসন চাইবে দলটি। এ ছাড়া বিএনপি জোটের শরিক জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের প্রার্থী মাওলানা আতাউর রহমান এ আসনে নির্বাচন করবেন বলে জানা গেছে।

নির্বাচন প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের এমপি ইমরান আহমদ প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, ‘দল আমাকে মূল্যায়ন করে বারবার মনোনয়ন দিয়েছে। এলাকার জনগণের সঙ্গে আমার দীর্ঘদিনের সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। তারা আমাকে ভালোবেসে বলে পাঁচবার এমিপি নির্বাচিত করেছে।’ রাস্তাঘাটের উন্নয়ন, আইটি পার্ক নির্মাণ, সড়ক সংস্কারের কথা উল্লেখ করে তিনি আরো বলেন, ‘আগামী নির্বাচনে তৃণমূল এবং কেন্দ্রীয় নীতিনির্ধারণী ফোরাম আমাকে মূল্যায়ন করলে অবশ্যই জনগণের সেবক হতে নির্বাচন করব।’

গোয়াইনঘাট ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ আওয়ামী লীগ নেতা মো. ফজলুল হক জানান, ‘জনগণের স্বার্থে আমি মনোনয়ন চাইব। কারণ রাজনীতির মূলমন্ত্র হচ্ছে জনসেবা। গত নির্বাচনেও আমি মনোনয়ন চেয়েছি, পাইনি। দলীয় প্রার্থীর পক্ষে কাজ করেছি। দেশরতœ প্রধামন্ত্রী শেখ হাসিনা যদি আমাকে যোগ্য মনে করে মনোনয়ন দেন, তাহলে আমি নির্বাচন করব।’

বিএনপির প্রার্থী দিলদার হোসেন সেলিম প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, ‘দলের জন্য কাজ করে যাচ্ছি। নির্বাচনী এলাকায় সব সময় ছিলাম, আছি এবং থাকব।’ তিনি বলেন, ‘আমি এমপি থাকাকালে এ আসনে ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে। শুধু দল নয়; এ আসনের আপামর জনগণ চায় আমি নির্বাচন করি।’ দলে একাধিক মনোনয়নপ্রত্যাশীর ব্যাপারে তিনি বলেন, ‘বিএনপি একটি বড় রাজনৈতিক দল; দলের অন্য নেতাকর্মীরা মনোনয়ন চাইতে পারেন। দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান এ ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন।’

বিএনপির আরেক প্রার্থী গোয়াইনঘাট উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আবদুল হাকিম চৌধুরী বলেন, ‘পরপর দুবার আওয়ামী লীগের প্রার্থীকে পরাজিত করে দলীয় সমর্থন নিয়ে উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছি। বিএনপির প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে কাজ করে যাচ্ছি। দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নির্দেশ, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আদর্শ ধারণ ও লালন করে রাজনীতি করে যাচ্ছি।’ তিনি বলেন, ‘সিলেট-৪ আসনের মানুষ তাদের সেবা করতে আমাকে দলীয় মনোননয় চাওয়ার প্রেরণা জুগিয়েছে। কেন্দ্র থেকেও আমাকে নির্বাচনী আসনে কাজ করার কথা জানানো হয়েছে। জনগণের প্রত্যাশা পূরণে মনোনয়ন চাইব। দল যদি আমাকে মনোনয়ন দেয়, তাহলে আসনটি ফের বিএনপিকে উপহার দিতে পারব।’

জাপার একক প্রার্থী তাজ রহমান প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, ‘পল্লীবন্ধু সাবেক রাষ্ট্রপতি জাপা চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের হাতকে শক্তিশালী করতে দীর্ঘদিন ধরে দলকে সংগঠিত করছি। চেয়ারম্যানের নির্দেশেই আমি এলাকায় কাজ করে যাচ্ছি। গত সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী ছিলাম। কিন্তু মহাজোটের স্বার্থে চেয়ারম্যানের নির্দেশে প্রার্থিতা প্রত্যাহার করি। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে লাঙ্গল প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করার ব্যাপারে আশাবাদী।’

"