দলীয় প্রার্থী চায় আওয়ামী লীগ পুনরুদ্ধারে তৎপর বিএনপি

প্রকাশ : ২০ অক্টোবর ২০১৮, ০০:০০

কাজী আবুল মনসুর, চট্টগ্রাম ব্যুরো

চট্টগ্রাম-৫ আসন হাটহাজারীতে এবার আওয়ামী লীগ ও বিএনপি দুই দলেই রয়েছে হেভিওয়েট প্রার্থী। সম্ভাব্য এসব প্রার্থীরা এলাকায় তৎপরতাও শুরু করে দিয়েছে। তবে গত দুইবার মহাজোটের পক্ষ থেকে জাতীয় পার্টির প্রার্থী নির্বাচিত ও মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করায় তৈরি হয়েছে ভোটের সমীকরণ। এক্ষেত্রে স্থানীয় রাজনীতিতে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির ভেতর বিরাজমান আন্তকোন্দল নির্বাচনের হিসাবকে জটিল করে তুলেছে। প্রতিটি দল থেকে একাধিক নেতা প্রার্থী হওয়ার জন্য জোর প্রচারণা ও তদ্বির করে যাচ্ছেন। এ ছাড়া কল্যাণ পার্টির খোদ চেয়ারম্যানের পক্ষেও আছে প্রার্থী হওয়ার সম্ভাবনা। তবে স্থানীয় রাজনীতিতে হেফাজতে ইসলামের প্রভাব যেকোনো জয়-পরাজয়ে বড় ভূমিকা রাখবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

চট্টগ্রামের হাটহাজারী উপজেলা এবং চট্টগ্রাম নগরের দক্ষিণ পাহাড়তলী ও জালালাবাদ ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত চট্টগ্রাম-৫ আসন। বর্তমানে এই আসনের সংসদ সদস্য (এমপি) জাতীয় পার্টির ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ। তিনি পরিবেশ, বন ও জলবাযু পরিবর্তন বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী। আগামী সংসদ নির্বাচনে মহাজোট থেকে তিনি আবারও মনোনয়ন চাইবেন। এবার মহাজোটের প্রার্থী না থাকলে মনোনয়ন চাইবেন চট্টগ্রাম উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সম্পাদক ও চট্টগ্রাম জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান এম এ সালাম। তিনি ছাড়াও ক্ষমতাসীন দলের মনোনয়ন প্রত্যাশী হিসেবে আছেন চট্টগ্রাম উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক ইউনুচ গণি চৌধুরী, প্রচার-প্রকাশনা সম্পাদক ও চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের সদস্য জসিম উদ্দিন শাহ, সদস্য মঞ্জুর আলম মঞ্জু এবং হাটহাজারী উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সোহরাব হোসেন নোমান। অন্যদিকে, বিএনপির মনোনয়ন চান দলটির কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান মীর মোহাম্মদ নাছির উদ্দিন, তার ছেলে বিএনপির কেন্দ্রীয় সদস্য মীর হেলাল, সাবেক হুইপ সৈয়দ ওয়াহিদুল আলমের মেয়ে ব্যারিস্টার শাকিলা ফারজানা, বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা এস এম ফজলুল হক, হাটহাজারী উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মাহবুব আলম ও উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক নুর মোহাম্মদ। তবে বিএনপি মহাজোটগত নির্বাচন করলে ২০ দলীয় জোটের প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন পেতে পারেন কল্যাণ পার্টির চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) সৈয়দ মো. ইব্রাহিম।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আওয়ামী লীগ মহাজোটগত নির্বাচন করলে এবারও মনোনয়ন পাবেন ব্যারিস্টার আনিস। তবে আগামী নির্বাচনে প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে এলাকায় গ্রহণযোগ্যতা, দলীয় ভিত্তি এবং মাঠের অবস্থান যাচাই করতে পারেন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা। সেক্ষেত্রে পরিচ্ছন্ন ব্যক্তিত্ব ও তৃণমূলের গ্রহণযোগ্যতার বিষয়টিও বিবেচনায় আসতে পারে। এরকম হলে জোট থাকলেও কোনো কোনো আসনে ব্যতিক্রম হতে পারে।

দুই দফায় শরিক দল জাতীয় পার্টিকে আসন ছেড়ে দেওয়ার পর এবার আসনটিতে দলের প্রার্থীকে মনোনয়নের জোরালো দাবি রয়েছে স্থানীয় আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে। তারা বলছেন, ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ এলাকার উন্নয়নে তেমন কোনো কাজ করেননি। আওয়ামী লীগের ওপর ভর করে এমপি হলেও জাতীয় পার্টির কোনো প্রভাব নেই হাটহাজারীতে। এক্ষেত্রে দলের মনোনয়ন পাওয়ার ক্ষেত্রে কিছুটা এগিয়ে আছেন চট্টগ্রাম জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এম এ সালাম। তবে মনোনয়ন দৌড়ে পিছিয়ে নেই অপর আওয়ামী লীগ নেতা ইউনুচ গণি চৌধুরী।

১৯৯১ সাল থেকে পাঁচ দফা নির্বাচনে হাটহাজারী আসনে পরপর তিনবার বিএনপি এবং পরের দুইবার মহাজোটের টিকিটে জাতীয় পার্টি জয়লাভ করে। ১৯৯১, ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে বিএনপির প্রার্থী সৈয়দ ওয়াহিদুল আলম জয় পান। ২০০৮ সালে ওয়াহিদুল আলমকে পরাজিত করে নির্বাচিত হন ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ। ২০১৪ সালের নির্বাচনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আনিসুল ইসলাম মাহমুদ পুনরায় এমপি নির্বাচিত হয়েছিলেন।

মহাজোটের প্রার্থিতার বিষয়ে ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ বলেন, দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় কাজ করে আসছি। বিগত সময়ে এখানে জাতীয় পার্টির অবস্থান অনেক পাল্টেছে। দল এখানে সংগঠিত। জনপ্রতিনিধি হয়ে এলাকায় ব্যাপক উন্নয়ন কাজ করেছি। আমার বিশ্বাস, এবারও ভোটাররা তা মূল্যায়ন করবেন।

অন্যদিকে, আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশী এম এ সালাম বলেন, এবারও হাটহাজারী থেকে মনোনয়ন চাইব। আমি দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় কাজ করে আসছি। দলকে সংগঠিত করেছি। দল মনোনয়ন দিলে নির্বাচন করব। সবকিছুই নির্ভর করছে নেত্রীর ওপর। তবে জোট থেকে নির্বাচন করলে ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ মনোনয়ন পাবেন।

অপর মনোনয়ন প্রত্যাশী ইউনুস গণি চৌধুরী বলেন, ২০১৪ সালে আমাকে মনোনয়ন দিয়ে কাজ করতে বলেছিলেন নেত্রী। আমি কাজও করেছিলাম। দলের সিদ্ধান্তে শেষ মুহূর্তে সরে দাঁড়াই। জোটের প্রার্থী না থাকলে এবারও আমি মনোনয়ন চাইব। যদিও মনোনয়ন দলের হাতে, তারপরও আমি আশাবাদী। আর মনোনয়ন পেলে হাটহাজারীর মানুষের প্রত্যাশা পূরণে কাজ করব।

আগামী নির্বাচনে হেফাজতে ইসলাম হাটহাজারীতে জয়-পরাজয়ে বড় ভূমিকা রাখবে বলে স্থানীয়দের ধারণা। সম্প্রতি কওমি মাদরাসার দাওরা হাদিসকে মাস্টার্সের সমমর্যাদা দেওয়ায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে অভিনন্দন জানিয়েছিলেন হেফাজত আমির আল্লামা শাহ আহমদ শফী। অপরদিকে, সম্প্রতি হেফাজত আমির বৈঠক করেন বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ও দলটির সম্ভাব্যপ্রার্থী মীর মোহাম্মদ নাছির উদ্দিনের সঙ্গে। এসব বিষয় নির্বাচনে প্রভাব পড়তে পারে। এ ছাড়া ইসলামী ঐক্যজোট থেকে হেফাজত নেতা মঈনুদ্দিন রুহী ও সমমনা ইসলামী দল থেকে হেফাজত নেতা মাওলানা নাছির উদ্দিন মুনির মনোনয়ন পেতে পারেন।

হাটহাজারী আসনে একসময় বিএনপির শক্ত অবস্থান ছিল। এখন এই আসন পুনরুদ্ধারে মরিয়া বিএনপির নেতাকর্মীরা। বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশীরা বলছেন, স্বাধীনতার পর থেকে এ আসনে আওয়ামী লীগের কোনো প্রার্থী জয়ী হতে পারেননি। তারা আশা করছেন, এখানে জোটের কাউকে মনোনয়ন দেবে না বিএনপি। আগামী নির্বাচনে বিএনপি এককভাবেই এ আসনে প্রার্থী দেবে।

জানা গেছে, হাটহাজারী সদর, মেখল, মির্জাপুর, ফতেপুর ইউনিয়ন, ১ নম্বর দক্ষিণ পাহাড়তলী ও জালালাবাদ ওয়ার্ড এলাকায় মীর নাছিরের প্রভাব বেশি। অপরদিকে, উত্তর হাটহাজারী, দেওয়ান নগর, আলমপুর, ফতেয়াবাদ, মাদার্শা, চিকনদ-ী ইউনিয়ন এলাকায় এস এম ফজলুল হকের জনপ্রিয়তা বেশি। এ ছাড়া এস এম ফজলুল হকের প্রতি বর্তমান উপজেলা চেয়ারম্যান মাহবুবুল আলম চৌধুরীর সমর্থনও রয়েছে। এ আসন থেকে একাধিকবার এমপি নির্বাচিত হওয়ায় হাটহাজারীতে সৈয়দ ওয়াহিদুল আলমের পরিবার এখনো জনপ্রিয়। সেই সুবিধাকে কাজে লাগাতে চাইছেন ব্যারিস্টার শাকিলা ফারজানা। সাবেক এমপি কন্যা শাকিলা ফারজানা প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, এর আগে চার দফায় নির্বাচন করে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন আমার বাবা সৈয়দ ওয়াহিদুল আলম। তিনি বেঁচে থাকলে বিএনপি থেকে প্রথমে তাকেই মনোনয়ন দেওয়া হতো। তাই এলাকায় তার অবস্থান ধরে রাখতে আমি কাজ করছি।

তবে দলের শক্তিশালী প্রার্থী বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা মীর মোহাম্মদ নাছির উদ্দিন। তিনি বলেন, নির্বাচন অবাধ ও নিরপেক্ষ হলে হাটহাজারীতে বিজয়ী হবে বিএনপি। আমি মনোনয়ন পেলে দলের আস্থার প্রতিদান দিতে পারব।

এদিকে, কল্যাণ পার্টির চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) সৈয়দ মুহাম্মদ ইব্রাহিমের ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র জানায়, আগামী সংসদ নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট থেকে নির্বাচন করতে প্রস্তুতি নিচ্ছেন সৈয়দ মুহাম্মদ ইব্রাহিম। ইতোমধ্যে তিনি জোট থেকে সবুজ সংকেতও পেয়েছেন। মেজর জেনারেল (অব.) সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম বলেন, বেগম খালেদা জিয়ার সম্মতিতে হাটহাজারীতে সময় ও শ্রম বিনিয়োগ করছি। আমি হাটহাজারী আসনে জোট থেকে প্রার্থী হতে চাই।

"