মহাবিপন্ন ‘বাটাগুর বাসকা’ কচ্ছপ ফিরছে প্রকৃতিতে

প্রকাশ : ১৪ অক্টোবর ২০১৮, ০০:০০

রাজীবুল হাসান শ্রীপুর (গাজীপুর)

জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বিপর্যস্ত পরিবেশে বিলুপ্তি হতে চলেছে মান্দারী কচ্ছপ বা বাটাগুর বাসকার (স্থানীয় নাম কাইট্টা কচ্ছপ, শালগম)। পৃথিবীর মধ্যে বাংলাদেশ, ভারত ও মিয়ানমারের উপকূলীয় এলাকায় পাওয়া যেত। পরিবেশ-বিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থা আইইউসিএন (আন্তর্জাতিক প্রকৃতি ও প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ সংঘ) এই প্রজাতির কচ্ছপকে মহাসংকটাপন্ন প্রাণীর তালিকায় স্থান দিয়েছে। এই প্রজাতিকে প্রকৃতিতে ফিরিয়ে দিতে চলছে ‘প্রজেক্ট বাটাগুর বাসকা’ নামের একটি প্রকল্প। অস্ট্রিয়ার জুভিয়ানার অর্থায়নে, টার্টাল সারভাইভাল অ্যালয়েন্সের প্রযুক্তিগত সহায়তায় গাজীপুরের ভাওয়াল জাতীয় উদ্যানে নিবিড় অঞ্চলে চলছে এর প্রজনন ও গবেষণা কার্যক্রম। এতে সহযোগী হিসেবে কাজ করছে বাংলাদেশের বন বিভাগ এবং প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশন। বন বিভাগে ওয়াইল্ডলাইফ সেন্টারের সরীসৃপবিদ সোহেল রানা ন্যাশনাল পার্কের বাটাগুর বাসকা প্রকল্প পরিদর্শন করে বলেন, মহাসংকটাপন্ন বাটাগুর বাসকা এই প্রকল্পের মাধ্যমে আশার আলো দেখছে। পৃথিবীতে এই প্রজাতির নারী কচ্ছপ আছে মাত্র ১৬টি। এর মধ্যে বাংলাদেশেই ৮টি আছে। নিকট ভবিষ্যতে প্রকৃতি আবারও বাটাগুর বাসকার উপস্থিতি টের পাবে বলে আশা করছি।

সম্প্রতি ভাওয়াল উদ্যান প্রকল্প পরিদর্শনে গিয়ে দেখা যায়, কচ্ছপের ডিম থেকে সদ্যজাত বাচ্চাগুলো নিয়ে কার্যক্রমে ব্যস্ত সময় পার করছেন প্রকল্পের গবেষক ও স্টেশন ব্যবস্থাপক এ জি জে মোরশেদ। তিনি জানান, উদ্যানে মোট ৪টি নারী বাটাগুর বাসকা প্রজাতির কচ্ছপ আছে। এগুলো থেকে গত ২০ মার্চ কচ্ছপের একটি বাসা থেকে ২৩টি, ২৫ মার্চ ২৬টি ও ২৭ মার্চ ১৪টি এবং সর্বশেষ গত ৩ এপ্রিল একটি বাসা থেকে ১৪টি ডিম পাওয়া গেছে। সব মিলিয়ে এ বছর এখন পর্যন্ত মোট ৬৩টি ডিম পাওয়া গেছে। এ ছাড়া ২০১২ সালে ২৬টি, ২০১৩ সালে ৬১টি, ২০১৪ সালে ৪৮টি, ২০১৫ সালে ১১টি বাচ্চা পাওয়া যায়। ২০১৬ সালে ডিম পাওয়া গেলেও পিপড়ার আক্রমণে সব ডিম নষ্ট হয়ে যাওয়ায় তখন কোনো বাচ্চা পাওয়া যায়নি। পরে ২০১৭ সালে প্রথমবারের মতো পিপড়া আক্রমণ থেকে রক্ষা করার জন্য ভিয়েনা থেকে বিশেষ ধরনের বাক্স আনা হয়। ফলে ২০১৭ সালে ৬১টি বাচ্চা পাওয়া যায়। ২০১৮ সালের ২০ মার্চ থেকে ২৭ মার্চ পর্যন্ত প্রাপ্ত মোট ৬৩টি ডিমের মধ্যে ২৫ মে ৩টি, ২৬ মে ৪টি ও সর্বশেষ ২৭ মে ৫টি বাচ্চা পাওয়া গেছে। এগুলোর মধ্যে কোনটি নারী বা কোনটি পুরুষ তা শনাক্ত করতে ১৫ বছর সময় লাগবে।

এ জি জে মোরশেদ আরো জানান, এই প্রজাতির নারী কচ্ছপ পৃথিবীতে আছে মাত্র ১৬টি। এর মধ্যে বাংলাদেশে ৮টি। ২টি আছে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের মাদ্রাজে ও ৫টি দেশের সুন্দরবন এলাকায় । এ ছাড়া অস্ট্রিয়ার গ্রাদ এ আছে ১টি। সম্প্রতি ভাওয়াল জাতীয় উদ্যান থেকে ৪টি ফিমেল বাটাগুর বাসকা কচ্ছপ সুন্দরবনের করমজলে একই প্রজেক্টের আওতায় অপর গবেষণা কেন্দ্রে পাঠানো হয়েছে। সেখানে ২০১৭ সাল থেকে প্রজনন কার্যক্রম শুরু হয়। এখন পর্যন্ত সেখান থেকে ৫৮টি বাচ্চা পাওয়া গেছে।

প্রকল্প কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, প্রকৃতিতে মহাসংকটাপন্ন এ জাতের কচ্ছপকে পুনরায় ফিরিয়ে আনতে বাংলাদেশে দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প হিসাবে ‘প্রজেক্ট বাটাগুর’ ২০১০ সাল থেকে কাজ করে। এটি দেখভাল করছেন প্রকল্পের প্রধান বিজ্ঞানী ড. পিটার প্রাসাগ। ২০১৬ সালে ২টি কচ্ছপের পিঠে স্যাটেলাইট ট্রান্সমিটার বসিয়ে এদের আচরণ ও চলাচলের গতিপথ পর্যবেক্ষণ শুরু হয়। তবে নানা কারণে তখন পদ্ধতিটি সফল হয়নি। এ বছর আবারও ৫টি কচ্ছপের শরীরে স্যাটেলাইট ট্রান্সমিটার বসানো হবে। এ ছাড়া ভাওয়াল জাতীয় উদ্যানে থাকা কচ্ছপগুলোর প্রত্যেকটিকে আলাদাভাবে শনাক্ত করতে তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তা নেওয়া হচ্ছে। জন্মের কিছু দিন পর এদের শরীরে ইলেকট্রনিক ডিভাইস বসানো হয়। পরে বিভিন্ন প্রয়োজনে ট্যাগ রিডার দিয়ে এদের শনাক্ত করা হয়। গবেষণা কেন্দ্রে থাকা কচ্ছপগুলোর ডিম দেওয়া ও আচরণ পর্যবেক্ষণের জন্য বিশেষ ধরনের ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে।

প্রকল্প কার্যালয় সূত্রে আরো জানা যায়, এ প্রজাতির কচ্ছপগুলোর মধ্যে নারীদের দেহের আকার পুরুষের আকারের চেয়ে বড় হয়ে থাকে। এরা মূলত তৃণভোজী, তবে গবেষণা কেন্দ্রে এদের শাক-সবজির পাশাপাশি তাজা চিংড়ি, শুকনা চিংড়ি, ছোট শামুক দেওয়া হয়। সবজির মধ্যে এরা মিষ্টিকুমড়া, টমাটো, কচু শাক ও বাঁধাকপি খায়। তবে কলমি শাক এদের সবচেয়ে পছন্দের খাবার।

 

"