অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব না মিটলে একাধিক প্রার্থীর সম্ভাবনা

প্রকাশ : ১৪ অক্টোবর ২০১৮, ০০:০০

রিমন পালিত, বান্দরবান

জাতীয় ও স্থানীয় রাজনৈতিক দলের ভোট লড়াইয়ের ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে বান্দরবান-৩০০ আসন। দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে আসনটি আওয়ামী লীগের দখলে। এই সময়ে দল থেকে বেরিয়ে যাওয়া নেতাদের সংখ্যাও কম নয়। আগামী নির্বাচনের তারা দলীয় প্রার্থীর বিপরীতে বিকল্প প্রার্থীকে সমর্থন দিতে পারেন। এদিকে, পাহাড়ের রাজপরিবারের দুই সদস্যের বিরোধের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে বিএনপির রাজনীতি। দলীয় বিপর্যের জন্য একেই দায়ী করছেন স্থানীয় নেতারা। এই দুই দলে আন্তবিরোধ এড়াতে না পারলে পাহাড়ের রাজনীতির হাল ধরবে আঞ্চলিক ও স্থানীয় সংগঠনগুলো। এই পরিস্থিতে সরগরম হয়ে উঠেছে বান্দরবানের রাজনীতি।

১৯৯১ সালের পর থেকে আসনটি আওয়ামী লীগের হাতছাড়া হয়নি। টানা পাঁচ বার বীর বাহাদুর উশৈসিং এই আসন থেকে এমপি নির্বাচিত হয়েছেন। আগামী সংসদ নির্বাচনেও দলটি বীর বাহাদুরকেই সংসদ সদস্য হিসেবে দেখতে চায়। অন্যদিকে, দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে চলে আসা দুই রাজপরিবারের দ্বন্দ্বের কারণে বিএনপি এখনো ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। সম্পর্কে মামি-ভাগিনা হলেও রাজপুত্র সাচিং প্রু জেরী ও রাজ পুত্রবধূ মাম্যাচিং-এর মধ্যে সাপে-নেউলে অবস্থা। ৯৬ সাল থেকে আ.লীগ প্রার্থী বীর বাহাদুরের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে সাচিং প্রু জেরী ৩ বার ও মাম্যাচিং ১ বার হেরে যান। দলটির কেন্দ্র বেশ কয়েকবারই উদ্যোগ নিলেও এখনো থামেনি এই দ্বন্দ্ব। প্রতিবারই এই সুযোগটি নিচ্ছে আওয়ামী লীগ। তবে নির্বাচনে আওয়ামী লীগ, বিএনপি ছাড়াও আঞ্চলিক রাজনৈতিক দল জনসংহতি সমিতিরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।

সাম্প্রতিক সময়ে আওয়ামী লীগের ভেতর বহিষ্কৃত নেতাদের একটি গ্রুপ মাথাচাড়া দিয়ে উঠায় নির্বাচনের আগে দলটিও অস্বস্তিতে রয়েছে। দলটির সাবেক সভাপতি প্রসন্ন কান্তি তঞ্চঙ্গ্যা ও সাধারণ সম্পাদক কাজি মুজিবুর রহমান বহিষ্কৃত হওয়ার পর বীর বাহাদুরের বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে প্রচার প্রচারণা শুরু করেছে। দলের সুবিধা বঞ্চিত ও সংস্কার পন্থিরা এই গ্রুপটির সঙ্গে সক্ষ্য গড়ে তোলায় কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়েছে অভিজ্ঞ নেতা বীর বাহাদুরের।

এদিকে, স্থানীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক রাজনৈতিক দল জনসংহতি সমিতি ২০০৮ সালে একবারই প্রার্থী দেয় এই আসনে। এ সময় অপর আঞ্চলিক রাজনৈতিক দল ইউপিডিএফও নির্বাচনে অংশ নেয়। এই দুই দল এবার নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে কি না তা এখনো সঠিক বলা না গেলেও, এই আসনে প্রার্থীর বিজয়ে বড় ধরনের ভূমিকা রাখবে তারা। স্থানীয় রাজনীতাজ্ঞরা মনে করছেন, আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান যাই হোক না কেন, নির্বাচনের আগে বড় দুটি দল অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব মেটাতে না পারলে নির্বাচনে একাধিক প্রার্থী অংশ নিতে পারে।

বহিষ্কৃত নেতাদের জোট নিয়ে চিন্তিত আওয়ামী লীগ

জাতীয় পার্টির সঙ্গে সম্পৃক্ত থেকে ১৯৭৯ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম স্থানীয় সরকার পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন বীর বাহাদুর উশৈসিং। পরবর্তীতে আ.লীগে যোগদান ও ’৯১ সালে প্রথম সংসদ নির্বাচনে জয়ী হয়ে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে। সর্বশেষ ২০১৪ সালে পঞ্চমবারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন তিনি। ১৯৯৭ সালের ঐতিহাসিক ‘পার্বত্য শান্তি চুক্তি’ স্বাক্ষরেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে। পরবর্তীতে দুইবার উপমন্ত্রীর মর্যাদায় পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডর চেয়ারম্যন ছিলেন বীর বাহাদুর। ২০০২ সালে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ও জাতীয় সংসদে আওয়ামী লীগের সংসদীয় দলের হুইপ নির্বাচিত হন। বর্তমানে তিনি পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন।

ক্লিন ইমেজের কারণে সর্বত্রই সুনাম রয়েছে উশৈসিংয়ের। বান্দরবানের শিক্ষা, স্বাস্থ্য যোগাযোগ, অবকাঠামোসহ প্রতিটি সেক্টরে তার অবদান নির্বাচনে জয়ের ব্যাপারে ভূমিকা রাখছে। দলের নেতা কর্মীরাও বীর বাহাদুরের একক নেতৃত্বের ওপর নির্ভরশীল। ফলে দল থেকে সরে গিয়ে কিছু নেতাকর্মী বিদ্রোহ করার চেষ্টা করলেও তারা তেমন সুবিধা করতে পারেনি। ২০০১ সালে দলের নেতা রাংলাই ম্রো, থোয়াইং চ প্রু মাস্টার, আইয়ুব চৌধুরী ও ২০১৫ সালে দলের সভাপতি প্রসন্ন কান্তি তঞ্চঙ্গ্যা বীর বাহাদুরের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। ২০০৭ সালে দলে বিদ্রোহ করেন পৌর মেয়র মিজানুর রহমান বিপ্লব। শৃঙ্খলা ভঙ্গের দায়ে দল থেকে বহিষ্কৃত সভাপতি প্রসন্ন কান্তি তঞ্চঙ্গ্যা ও সাধারণ সম্পাদক কাজি মুজিবুর রহমান একই সঙ্গে জোট বেঁধে বীর বাহাদুরের বিপক্ষে মাঠে নেমেছেন। এদিকে, জয়ের পথ সুগম করতে বহিষ্কৃত ও বিদ্রোহী অনেক নেতাকেই আবারো দলে টানা এনেছেন বীর বাহাদুর। তবে নেতা কর্মীদের একে অপরের প্রতি অনাস্থা তৈরি হওয়ায় শৃঙ্খলা বজায় রাখতে তৃণমূল কমিটিগুলো বীর বাহাদুরকেই করতে হচ্ছে।

এদিকে, দীর্ঘদিন দলের সভাপতির দায়িত্বে ছিলেন শান্তি বাহিনীর সাবেক গেরিলা নেতা প্রসন্ন কান্তি তঞ্চঙ্গ্যা। জেলা পরিষদের সদস্য থাকা কালে নানা সমস্যা নিয়ে পদত্যাগ করেন তিনি। পরে ২০১৫ সালে আ.লীগের ‘বিদ্রোহী প্রার্থী’ হিসেবে বীর বাহাদুরের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে হেরে যান তিনি। দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের দায়ে তাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়। অন্যদিকে, এক সময়ের নির্মাণশ্রমিক কাজি মুজিবুর রহমান শ্রমিক লীগের সভাপতি থেকে শুরু করে দলের সাধারণ সম্পাদক ও জেলা পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। দলে প্রভাব বিস্তার ও শৃঙ্খলা ভঙ্গের কারণে তাকেও জেলা কমিটি বহিষ্কার করে। বহিষ্কৃত এই দুই নেতা এখন জোট বেঁধে বীর বাহাদুরের বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে প্রচারণা চালাচ্ছেন। ফেসবুকে নৌকার পক্ষে ভোট চেয়ে ইতোমধ্যে তারা প্রচারণাও শুরু করে দিয়েছেন। নৌকায় ভোট চাইলেও এই জোটটি বীর বাহাদুরকে পাশ কাটিয়ে যাচ্ছেন। প্রতিদিনের সংবাদকে তারা জানান, আওয়ামী লীগে সাংগঠনিক কাঠামো ধসে পড়েছে। সুবিধাবাদী লুটেরারা সক্রিয় হয়ে উঠায় আগামী নির্বাচনে এর বিরূপ প্রভাব পড়বে। অস্তিত্ব বাঁচাতে আগামী নির্বাচনে দুজনই দলের কাছে মনোনয়ন চাইবেন বলে তারা জানান।

তবে বীর বাহাদুর বলেন, দল যাকে মনোনয়ন দেবে তার পক্ষেই নেতা কর্মীরা তার পক্ষেই কাজ করবে। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সবচেয়ে বেশি উন্নয়ন হয়েছে পাহাড়ে। এ কারণে আগামীতেও এই দলের প্রার্থীকেই জনগণ বিপুল ভোটে নির্বাচিত করবে। বহিষ্কৃত নেতার দৌড়ঝাঁপ প্রসঙ্গে বীর বাহাদুর বলেন, ‘প্রসন্ন কান্তি তঞ্চঙ্গ্যা, কাজি মুজিবুর রহমান তারা দল থেকে সবচেয়ে বেশি সুবিধা নিয়েছে। তাদের দুঃসময়ে সঙ্গে ছিলাম। কিন্তু তারা নিজেদের কারণেই নেতাকর্মী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। আর বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারীরা দলের জন্য কখনোই মঙ্গল বয়ে আনতে পারে না।

মামি ভাগিনার পুরনো দ্বন্দ্ব বিএনপিতে

প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সময়ে সংসদ সদস্য ও ১৫তম বোমাং রাজা অংশৈ প্রু চৌধুরীর বড় ছেলে সাচিং প্রু জেরী। ’৮৯ সালে উপমন্ত্রী মর্যাদার স্থানীয় সরকার পরিষদের চেয়ারম্যান প্রু জেরী দীর্ঘদিন জেলা বিএনপির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। জনপ্রিয়তার ধারাবাহিকতায় ১৯৯৬ সালে বিএনপির মনোনয়নে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন তিনি। পরে ২০০১ সালে বিএনপির বিদ্রোহী ও ২০০৮ সালে দলীয় মনোনয়নে নির্বাচনে অংশ নিয়ে হেরে যান তিনি। ১৩তম বোমাং রাজা ক্যাজসাইনের পুত্রবধূ মাম্যাচিং-এর সঙ্গে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েন তিনি। বিএনপির মাম্যাচিং গ্রুপের একটি বড় অংশই তার বিরোধিতা করে আসছে। রাজপরিবারের সূত্র ধরে সম্পর্কে জেরী ও মাম্যাচিং মামি ভাগিনা। রাজপরিবারের প্রভাবের কারণে বিএনপি ও সাধারণ মানুষের আশীর্বাদপুষ্ট সাচিং প্রু জেরী আ.লীগ প্রার্থী বীর বাহাদুরের সঙ্গে তিনবারই প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে হেরে যান। এবারও তিনি বিএনপি থেকে মনোনয়ন চাইবেন বলে তার ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলো জানিয়েছে। ইতোমধ্যে নির্বাচনী প্রচারণাও শুরু করে দিয়েছেন এই নেতা।

অন্যদিকে, ১৩ তম বোমাং রাজা ক্যাজসাইন এর পুত্রবধূ মাম্যাচিং ১৯৭৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পড়া কালে ছাত্র ইউনিয়নের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। বিএনপির সাবেক মহাসচিব আবদুস সালাম তালুকদারের হাত ধরে বিএনপির রাজনীতিতে নাম লিখিয়ে ৯১ ও ৯৬ সালে মহিলা এমনি নির্বাচিত হন তিনি। ২০০১ সালে জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়া ছাড়াও জেলা বিএনপির সভানেত্রী ছিলেন। ২০০১ সালে দলীয় মনোনয়নে নির্বাচনে অংশ নিয়ে আ.লীগ প্রার্থী বীর বাহাদুরের সঙ্গে মাত্র ৮০০ ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হন মাম্যাচিং। সেই সময় বিএনপিতে বিদ্রোহী প্রার্থী ছিলেন সাচিং প্রু জেরী। বিদ্রোহী প্রার্থী থাকা সত্ত্বেও অল্প ভোটের ব্যবধানে হেরে যাওয়ায় দলের কাছে গ্রহণযোগ্যতা বেড়ে যাওয়ায় আবারো জেলা কমিটির সভানেত্রী নির্বাচিত হন তিনি। তার সঙ্গে আছেন সাবেক পৌর মেয়র ও দলের সাধারণ সম্পাদক জাবেদ রেজা। নেতা কর্মীদের একটি বড় অংশ তাদের সঙ্গে থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে অনেকেই এই গ্রুপটি থেকে বের হয়ে সাচিং প্রু জেরীর গ্রুপে যোগ দিয়েছেন। নির্বাচনে জেরী মাম্যাচিং দুজনই মনোনয়ন চাইবেন বলে তারা জানিয়েছেন। তবে বিএনপিতে মামি ভাগিনার একই সঙ্গে মনোনয়ন চাওয়ার আশা নেতাকর্মীদের উৎকণ্ঠায় ফেলেছে বলে জানান দলের সমর্থকরা।

 

সরব অন্যান্য দলের প্রার্থীরাও

শান্তি চুক্তি বাস্তবায়ন নিয়ে দীর্ঘসূত্রিতা, আওয়ামী লীগ নেতা অপহরণ, চাঁদাবাজিসহ নানা কারণে আওয়ামী লীগের সঙ্গে আঞ্চলিক রাজনৈতিক দল জনসংহতি সমিতির মধ্যে বৈরীভাব চলছে দীর্ঘদিন থেকে। একাধিক মামলার কারণে জনসংহতি সমিতির অনেক নেতাকর্মীরা ক্ষুব্ধ আওয়ামী লীগের ওপর। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বিরোধের জের ধরে আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিপক্ষে অবস্থান নেবে জনসংহতি সমিতি। ২০০৮ সালে প্রথম জনসংহতি সমিতি থেকে বান্দরবানে প্রার্থী হন সংগঠনটির আঞ্চলিক পরিষদের সদস্য ও দলের কেন্দ্রীয় নেতা কে এস মং মারমা। এবার দলটি থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে কে এস মং মারমা ও রুমা উপজেলা চেয়ারম্যান জেলা কমিটির সহসভাপতি অংথোয়াই চিং মারমা নির্বাচনে অংশ নিতে পারেন বলে জানা গেছে। দলটির বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছেন নির্বাচনে অংশ না নিলে দলটি তাদের মতালম্বী যেকোনো প্রার্থীর পক্ষে অবস্থান নিতে পারে। জেলায় জনসংহতি সমিতির ভোট কম থাকলেও এই আসনে প্রার্থী জয়ের ব্যাপারে দলটির ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন অভিজ্ঞরা। এ ছাড়া ইউপিডিএফ নির্বাচনে অংশ নিলে স্বতন্ত্র হিনেবে তারা ছোটন কান্তি তঞ্চঙ্গ্যাকে প্রার্থী দিতে পারেন। এদিকে জাতীয় পার্টি ও জামায়াত ইসলামীর সাংগঠনিক তৎপরতা অত্যন্ত কম হলেও তারা কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বড় দুই দলের প্রার্থীর পক্ষে অবস্থান নিয়ে প্রচারণা চালায়।

 

"