সাংবাদিক নিখোঁজ

সৌদি ও পশ্চিমাদের সম্পর্কে টানাপড়েন

প্রকাশ : ১৩ অক্টোবর ২০১৮, ০০:০০

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

সিসি টিভি ফুটেজে দেখা একটি ছবি, সেখানে কালো জ্যাকেট এবং ধূসর রঙের ট্রাউজার পরা একজন ব্যক্তি ইস্তাম্বুলে সৌদি কনস্যুলেটে প্রবেশ করছেন। সেখানে সৌদি কনস্যুলেটের গেটের বাইরেই নীল রঙের জ্যাকেট পরা একজন দাঁড়িয়ে আছেন।

যিনি সৌদি কনস্যুলেটে প্রবেশ করছেন, তিনিই নিখোঁজ সাংবাদিক জামাল খাসোগজি। এই তার জীবিত থাকাবস্থায় শেষ ছবি। গত ২ অক্টোবর ইস্তাম্বুলের সময় দুপুর সোয়া ১টার দিকে এই দৃশ্য সিসি টিভি ক্যামেরায় ধরা পড়ে।

পরবর্তীকালে যা ঘটেছে, তা এক রহস্যের বিষয়। এই ঘটনা শুধু সৌদি আরব এবং তুরস্কের সম্পর্কে তিক্ততা আরো বাড়িয়েছে, তা নয়। পশ্চিমাদের সঙেও সৌদি আরবের সম্পর্ক হুমকির মুখে পড়েছে। এমনকি সৌদি যুবরাজ মোহামেদ বিন সালমান পশ্চিমা বিশ্বে যে একটি ইতিবাচক ভাবমূর্তি গড়ার চেষ্টায় ছিলেন, সেই চেষ্টাও ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রে স্বেচ্ছায় নির্বাসিত এবং সৌদি সরকারের সমালোচক জামাল খাসোগজি ২ অক্টোবর দুপুরে ইস্তাম্বুলে সৌদি কনস্যুলেটে প্রবেশের পর আর তাকে যে পাওয়া যায়নি, সেদিনই ভোরে সৌদি থেকে একটি প্রাইভেট জেট বিমান নামে ইস্তাম্বুল বিমানবন্দরে।

সিসি টিভিতে এই জেট বিমান অবতরণের দৃশ্যও ধরা পড়ে। তুরস্কের টেলিভিশনে প্রচারিত এই সিসি টিভি ফুটেজে দেখা যায়, বিমান থেকে নয়জন ব্যক্তি নেমে আসে। পরে আরেকটি বিমানে করে আরো ছয়জন আসে। তারা ইস্তাম্বুলে সৌদি কনস্যুলেটের কাছে দুটি হোটেলে ওঠে।

সাংবাদিক খাসোগজির ইস্তাম্বুলে সৌদি কনস্যুলেটের প্রবেশের সিসি টিভি ফুটেজ আছে। কিন্তু তার বেরিয়ে আসার কোনো ফুটেজ সৌদি কনস্যুলেট দিতে পারেনি।

তুরস্কে সরকার সমর্থক সংবাদপত্র সাবাহ বলেছে, সন্দেহভাজন ওই ১৫ জনকে সৌদি এজেন্ট হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে। তাদের নাম এবং ছবি প্রকাশ করা হয়েছে। পরে তারা সৌদি ফিরে গেছে বলে প্রাথমিক তদন্তে বলা হয়েছে।

তুর্কি পত্রিকায় আরো বলা হয়েছে, ১৫ জনের মধ্যে রয়েছেন কর্নেল মাহের মুত্রেব নামের একজন সৌদি গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তা। মোহাম্মদ আলমাদানি নামের আরেকজন ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ ছিলেন সেখানে। তারা সকলেই ইস্তাম্বুল বিমানবন্দরে নিজেদেরকে সৌদি সরকারের কর্মকর্তা-কর্মচারী হিসেবে পরিচয় দিয়েছে।

তাদের হোটেল বুকিং দেওয়া হয়েছিল কয়েকদিনের জন্য। কিন্তু তারা ছিলেন অল্প কয়েকঘণ্টা।

সাংবাদিক খাসোগজির ইস্তাম্বুলে সৌদি কনস্যুলেটে গিয়েছিলেন তার প্রাক্তন স্ত্রীর তালাক সম্পর্কিত কাগজপত্র নিতে। কারণ তিনি তার তুর্কি বান্ধবী হাতিস চেঙ্গিসকে বিয়ে করতে চেয়েছিলেন। তিনি সৌদি কনস্যুলেটে প্রবেশের আগমুহূর্তে সেখানে তার বান্ধবীর কাছে দুটি মোবাইল ফোন রেখেছিলেন।

সেই থেকে তার বান্ধবী হেতিস চেঙ্গিস সৌদি কনস্যুলেটের সামনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেছেন। কিন্তু খাসোগজি সৌদি কনস্যুলেট থেকে বেরিয়ে আসেননি।

ওয়াশিংটনে এক প্রতিবাদ বিক্ষোভ থেকে সাংবাদিক খাসোগজির গুমের ঘটনার জন্য সৌদি যুবরাজ মোহামেদ বিন সালমানের বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হয়।

তুরস্কের তদন্তকারিরা সৌদি কনস্যুলেটে অফিসে তল্লাশি শুরু করেছে।

তারা কনস্যুলেট জেনারেলের বাসভবন এবং বাগান এলাকায় তল্লাশির অনুমতি চেয়েছে। এখনো অনুমতি মেলেনি।

তদন্তকারীরা সিসি টিভি ফুটেজে পর্যালোচনা করে দেখেছে, সাংবাদিক খাসোগজি কনস্যুলেটে ঢোকার দুই ঘণ্টার মধ্যে একটা কালো গাড়ি কনস্যুলেটের ভেতরে দফতর থেকে কনস্যুলেট জেনারেলের বাসভবন পর্যন্ত গেছে। সৌদি কনস্যুলেটে প্রবেশের দুই ঘণ্টার মধ্যেই জামাল খাসোগজিকে হত্যা করা হয়েছে বলে তদন্তকারীরা ধারণা করছেন।

ঘটনাটি ইতোমধ্যেই সৌদি আরব এবং তুরস্কের মধ্যে তিক্ততা বাড়িয়েছে। তুরস্ক বিশ্বাস করছে, সৌদি কনস্যুলেটের ভেতরে সাংবাদিক জামাল খাসোগজিকে খুন করার পর তার লাশ গুম করা হয়েছে।

ঘটনার সত্যতা প্রমাণ হলে দুই দেশের মধ্যে তিক্ততা চরম পর্যায়ে যাবে বলে বিশ্লেষকরা মনে করেন। সৌদি আরবের ব্যাপারে পশ্চিমাদের যে অন্ধ সমর্থন ছিল, তাতেও চির ধরতে পারে বলে বিশ্লেষকরা বলছেন।

শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘটনাটি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

ব্রিটিশ পররাষ্ট্র মন্ত্রী জেরেমি হান্ট বলেছেন, ব্রিটেন বিষয়টাতে সৌদি আরবের কাছে জরুরি জবাব চায়।

‘জামাল খাসোগজিকে খুন করে খ--বিখ- করা হয়েছে’: ওয়াশিংটন পোস্ট

এদিকে, তুরস্ক সরকার মার্কিন কর্মকর্তাদের কাছে দাবি করেছে যে, তাদের হাতে অডিও এবং ভিডিও প্রমাণ রয়েছে যে, সৌদি সাংবাদিক জামাল খাসোগজিকে ইস্তাম্বুলে সৌদি কনস্যুলেটের ভেতর খুন করা হয়েছে। মার্কিন সরকারি কর্মকর্তারা প্রভাবশালী মার্কিন সংবাদপত্র ওয়াশিংটন পোস্টকে বলেছেন, এসব রেকর্ডিং-এ দেখা যাচ্ছে সৌদি নিরাপত্তা কর্মকর্তারা কনস্যুলেটের ভেতরে জামাল খাসোগজিকে আটক করেছে, তারপর তাকে হত্যা করেছে এবং তার দেহকে খ--বিখ- করেছে।

বিশেষভাবে অডিও রেকর্ডিং থেকে এই হত্যাকা-ের সঙ্গে সৌদি নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের যোগসাজশের গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে বলে তারা বলছেন।

একজন মার্কিন কর্মকর্তা, যিনি এই অডিও এবং ভিডিও সম্পর্কে জানেন, তিনি ওয়াশিংটন পোস্টকে বলেছেন, ‘জামাল খাসোগজি কনস্যুলেটের ভেতরে ঢোকার পর সেখানে কী ঘটেছিল তার একটা ধারণা ওই অডিও রেকর্ড থেকে জানা যাচ্ছে।’

তুর্কি কর্তৃপক্ষ অন্য যে মার্কিন কর্মকর্তাকে এই প্রমাণ দেখিয়েছে, তিনি বলছেন এসব রেকর্ডিং থেকে জামাল খাসোগজিকে মারধরের প্রমাণ মিলেছে। জামাল খাসোগজি এক সময় সৌদি রাজপরিবারের খুব ঘনিষ্ঠজন ছিলেন।

 

"