মনোনয়ন প্রত্যাশীদের লড়াই

আ.লীগে প্রার্থী বেশি নীরব বিএনপি

প্রকাশ : ১৩ অক্টোবর ২০১৮, ০০:০০

কাজী আবুল মনসুর, চট্টগ্রাম ব্যুরো

বহু মনোনয়ন প্রত্যাশীর লড়াইয়ের ময়দান হয়ে আছে চট্টগ্রাম-৪ (সীতাকু-) আসন। এর মধ্যে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশীর সংখ্যা সবচেয়ে। খোদ বর্তমান সংসদ সদস্যর (এমপি) বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে দলীয় কোন্দল সৃষ্টি আর সাংগঠনিক কার্যক্রমে অংশ না নেওয়ার। এই সুযোগে অনেক নেতা মনোনয়ন প্রত্যাশী হয়ে উঠেছেন। অংশ নিচ্ছেন প্রচারণায়। এদিকে, ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের সঙ্গে বৈঠক বিতর্ক আর দেড় হাজার কোটি টাকার ঋণখেলাপিসহ নানা অভিযোগ অভিযুক্ত বিএনপির শক্তিশালী প্রার্থী ও দলের যুগ্ম মহাসচিব আসলাম চৌধুরী বর্তমানে কারাগারে বন্দি। ফলে নতুন প্রার্থীর দিকে ঝুঁকতে হচ্ছে দলটিকে।

এমপি দিদারুল আলম এবার আওয়ামী লীগের মনোনয়ন বঞ্চিত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছেন। তার বিরুদ্ধে পৌরসভা নির্বাচনে দলীয় প্রার্থীর প্রচার প্রচারণায় অংশ না নেওয়া এবং সীতাকু- আওয়ামী লীগে কোন্দল সৃষ্টি করার অভিযোগ আছে। এই আসনে সাবেক সংসদ সদস্য আবুল কাশেম মাস্টারের বড় ছেলে ও উপজেলা চেয়ারম্যান এস এম আবদুল্লাহ

আল মামুন মনোনয়ন পেতে জোর তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছেন। এ ছাড়া সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান ও সীতাকু- থানা আওয়ামী লীগের একটানা ২৪ বছরের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল্লাহ আল বাকেরও আছেন আলোচনায়। এ ছাড়া আ.লীগের মনোনয়ন চান শিল্পপতি মোহাম্মদ ইমরানও।

এদের বাইরে সীতাকু- উপজেলা আ.লীগের সাবেক সভাপতি ও কৃষকলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য নুরুল মোস্তফা কামাল চৌধুরী, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় ধর্ম বিষয়ক সম্পাদকীয় উপ কমিটির সদস্য মুক্তিযোদ্ধা লায়ন হায়দার আলী চৌধুরী, চট্টগ্রাম তাতী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক পারভেজ উদ্দিন সান্টু, উপজেলা আ.লীগ সদস্য ও সাবেক সহসভাপতি আবুল কালাম চৌধুরী ওরফে আলেকজান্ডার চৌধুরী, ঢাকাস্থ সীতাকু- সমিতির সাধারণ সম্পাদক বখতিয়ার উদ্দিন চৌধুরী ও নগর আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক বদিউল আলমও ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থী হতে চান।

অন্যদিকে, রাজনৈতিক কৌশলগত কারণে এ আসনে বিএনপি কিছুটা নীরবে কাজ করছে। বিএনপিতে ঘুরে ফিরে আসছে বিএনপির সাবেক মন্ত্রী এল কে সিদ্দিকীর ভাই সাবেক সচিব এ ওয়াই বি আই সিদ্দিকীর নাম। তবে তিনি এলাকায় খুব একটা আসেন না।

সীতাকু- উপজেলা এবং চট্টগ্রাম নগরের ৯ ও ১০ নম্বর ওয়ার্ড নিয়ে চট্টগ্রাম-৪ সংসদীয় আসন। এ আসনে বর্তমান এমপি আওয়ামী লীগের দিদারুল আলম ৫ জানুয়ারি ২০১৪ সালের দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ১ লাখ ৫৩ হাজার ৮১৫ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছিলেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জাসদের মফিজুর রহমান পেয়েছিলেন ৪ হাজার ৪৬২ ভোট। ২০০৮ এর ৯ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের আবুল কাশেম মাস্টার নির্বাচিত হয়েছিলেন বিএনপির আসলাম চৌধুরীকে পরাজিত করে।

সীতাকু- উপজেলা চেয়ারম্যান এস এম আবদুল্লাহ আল মামুন প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, দলের জন্য কাজ করে যাচ্ছি। দলীয় প্রতিটি কর্মসূচির পাশাপাশি উপজেলা চেয়ারম্যান হিসেবে সরকারের ভিশন বাস্তবায়নে সক্রিয় আছি। আমার চেয়ারম্যান হিসেবে সাড়ে তিন বছর মেয়াদে জেলা শ্রেষ্ঠ উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছি পরপর তিন বার। নেত্রী যদি চান সংসদ নির্বাচন করব। আমার মরহুম পিতা যেভাবে সেবার মনোভাব নিয়ে জনগণের পাশে ছিলেন ঠিক বৃহৎ পরিসরে আমিও জনগণের পাশে থাকব।

সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান আব্দুল্লাহ আল বাকের প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, আমি টানা ২৪ বছর দলের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি। দল গোছাতে, বিএনপি-জামায়াতের সন্ত্রাস মোকাবিলা করতে মাঠে ছিলাম। সামনের দিনগুলোতেও আরো বলিষ্ঠ ভূমিকা থাকবে। সংসদ নির্বাচনে মনোনয়ন চাইব। দল যদি মূল্যায়ন করে নির্বাচন করার সুযোগ দেয় নির্বাচন করব।

স্থানীয় যুবলীগ নেতা সেলিম বলেন, কাশেম মাস্টার আর বাকের ভাই সীতাকু- আওয়ামী লীগ সামলে রেখেছেন। কাশেম মাস্টার মারা যাওয়ার পর বাকের ভাই আমাদের একক অভিভাবক। দল যদি ত্যাগী নেতাদের মূল্যায়ন না করে সেটা রাজনীতির জন্য ক্ষতি।

আওয়ামী লীগের কর্মী নুরে আলম বলেন, উপজেলা চেয়ারম্যান হিসেবে মামুন শতভাগ সফল। আগামী নির্বাচনে মাঠের নেতাদের মূল্যায়ন করা না হলে নৌকার বিজয় অনিশ্চিত।

বর্তমান সংসদ সদস্য দিদারুল আলম বলেন, ২০১৩ সালের নভেম্বরে যখন সীতাকু-ে অরাজকতা সৃষ্টি হয়েছিল তখন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাকে আওয়ামী লীগ থেকে নৌকা প্রতীকে মনোনয়ন দেন। তিনি তারপর থেকেই কাজ করে গেছেন। চেষ্টা করছেন মানুষের সেবা করার। আমি এমপি হওয়ার আগে সীতাকু- আওযামী লীগ ঘরে ঢুকে গিয়েছিল। সেখান থেকে আমি আওয়ামী লীগকে বের করে নিয়ে আসতে পেরেছি।

এই এমপি বলেন, আমি রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান। তবে আমি ব্যবসায়ী। ২০১৩ সালের আগে রাজনীতি না করলেও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে আমার যোগাযোগ ছিল। ব্যবসা করলেও সামাজিক বিভিন্ন কর্মকা-ে জড়িত ছিলাম আমি। ১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনার অনুমোদনক্রমে বঙ্গমাতা ফজিলাতুন্নেছা ফাউন্ডেশন কাট্টলীতে প্রতিষ্ঠা করেছি। এ সংগঠনের ব্যানারে বঙ্গবন্ধু বিদ্যাপীঠ ও বঙ্গবন্ধু স্কুল তৈরি করেছি। আর সেই সুবাদে বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা ও বিভিন্ন সূত্রে খবরাখবর নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আমাকে মনোনয়ন দিয়েছিলেন। তিনি আরো বলেন, আমার সামাজিক দায়বদ্ধতা রয়েছে। সীতাকু-ে ৯০টি ওয়ার্ড ও ১০টি ইউনিয়ন রয়েছে। ৯০ টি ওয়ার্ডের প্রতিটি কর্মকা-ে জড়িত আছি। সীতাকু-বাসীকে যা যা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম তা পূরণ করতে পেরেছি। সীতাকু-ে একটা কলেজকে সরকারি কলেজে উন্নীতকরণ করতে চেয়েছিলাম। তা করতে পেরেছি। অনুদানের বাইরে বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকা-ে করেছি নিজের টাকা খরচ করে।

সাবেক এমপি আবুল কাশেম মাস্টারের কথা উল্লেখ করে বর্তমান এই সংসদ সদস্য বলেন, আগের সাংসদ চলত জামায়াত-শিবির, বিএনপির লোক দিয়ে। ২০১৩ সালে বিএনপি-জামায়াতের সেই অবরোধের নামে পেট্রল বোমা দিয়ে মানুষ মারার পর কোনো জামায়াত-শিবির, বিএনপি কর্মীকে ধরে নিয়ে গেলে আগের সাংসদ তদবির করত। কিন্তু সেসব হওয়ার এখন আর কোনো অবকাশ নেই।

এদিকে, জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব দিদারুল কবিরও চট্টগ্রাম-৪ আসনে জাতীয় পার্টি থেকে এমপি পদে মনোনয়ন লাভের প্রত্যাশার কথা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, সীতাকু- আওয়ামী লীগ তিনভাগে বিভক্ত। তাদের গ্রুপিংয়ের কারণে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আসনটি আওয়ামী লীগের হাতছাড়া হতে পারে। জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ মনে করেন, এবারে চট্টগ্রাম-৪ আসন জাতীয় পার্টিকে ছেড়ে দিলে জোট এখানে জয়ী হবে।

এদিকে, চট্টগ্রাম-৪ আসনে বিএনপির শক্তিশালী প্রার্থী দলের যুগ্ম-মহাসচিব আসলাম চৌধুরী। তবে ইসরাইলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের সঙ্গে বৈঠকের অভিযোগে দায়েরকৃত রাষ্ট্রদ্রোহ মামলাসহ অসংখ্য মামলার আসামি হয়ে আসলাম চৌধুরী বর্তমানে কারাগারে বন্দি আছেন। তা ছাড়া তিনি প্রায় ১৫০০ কোটি টাকার ঋণ খেলাপিও। এমন পরিস্থিতিতে আগামী নির্বাচনের আগে আসলাম চৌধুরীর মুক্তি না-ও মিলতে পারে। সে ক্ষেত্রে নতুন মুখ হিসেবে সাবেক মন্ত্রী মরহুম এলকে সিদ্দিকীর ভাই সাবেক সচিব ও আইজিপি এ ওয়াই বি আই সিদ্দিকীকে (বোরহান সিদ্দিকী) দেখা যেতে পারে বিএনপির ব্যানারে ভোটের মাঠে। তবে কেউ কেউ বিএনপির প্রবীণ নেতা আবু তাহের বিএসসির নামও বলছে। শেষ পর্যন্ত বিএনপির মনোনয়ন কার ভাগ্যে যায় এটাই এখন দেখার বিষয়।

 

"