২১ অগাস্ট গ্রেনেড হামলা

দণ্ডিত তারেক রহমানকে ফেরত আনার পথ কেন কঠিন?

প্রকাশ : ১২ অক্টোবর ২০১৮, ০০:০০

বিবিসি

বাংলাদেশের গুলিস্তানে আওয়ামী লীগের সমাবেশে ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার রায়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের যাবজ্জীবন সাজা তাকে দেশে ফিরিয়ে আনতে সরকারের জন্য বিশেষ কোনো সুযোগ কি তৈরি করছে? এই প্রশ্নে আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন বিষয়টা বাস্তবে কঠিন হবে সরকারের জন্য। তারা বলছেন, তারেক রহমান ব্রিটেনে রাজনৈতিক আশ্রয়ে রয়েছেন। তাই ব্রিটিশ সরকার এমন কোনো পদক্ষেপ নেবে না যাতে তিনি ঝুঁকির মুখে পড়েন।

২১ অগাস্ট হামলা সংক্রান্ত মামলায় রায়ের পর গত বুধবার বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেছেন, এই মামলার যেসব আসামি বিদেশে রয়েছে তাদের ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে উদ্যোগ নেয়া হবে। ওদিকে প্রধানমন্ত্রীর তথ্যপ্রযুক্তি উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়ও এক ফেসবুক পোস্টে বলেছেন, বাংলাদেশ সরকার উদ্যোগী হলে বন্দি সমর্পণ চুক্তি (এক্সট্রাডিশন ট্রিটি) না থাকলেও জাতিসংঘ সনদের শর্ত মেনে ব্রিটেন সাজাপ্রাপ্তদের ফেরত দিতে পারে। আইনমন্ত্রী আনিসুল হক মনে করছেন, তারেক রহমানকে ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে কোনো প্রতিবন্ধকতা নেই। বাংলাদেশ ও ব্রিটেনের মধ্যে বন্দি সমর্পণ চুক্তি না থাকলেও জাতিসংঘের মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স (এমল্যাট) সনদের আওতায় তারেক রহমানকে বিচারের জন্য হস্তান্তর করা যেতে পারে বলে তিনি বিবিসি বাংলাকে বলেন। দুইটি দেশের মধ্যে আইনগত এবং বিচারিক সহযোগিতার ভিত্তি এই সনদ বলে বাংলাদেশে আইনমন্ত্রী উল্লেখ করেন। তিনি জানান, এছাড়া ২১ আগস্ট মামলার রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করতে হলে তারেক রহমানকে আগামী ৬০ দিনের মধ্যে আদালতে সশরীরে হাজিরা দিতে হবে। তাই ফিরে আসা ছাড়া তার সামনে আর কোনো পথ নেই। কিন্তু এই ব্যাখ্যা মানতে রাজি নন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ। তার যুক্তি তারেক রহমানকে দুই মাসের সময়সীমার মধ্যেই আপিল করতে হবে এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। তারেক রহমান যদি যুক্তিসঙ্গত কারণ দেখাতে পারেন তাহলে ‘কন্ডোনেশন অফ ডিলে’র আওতায় আদালত বিলম্ব মার্জনা করে দুই মাস পরও তাকে আপিল করার অনুমতি দিতে পারেন বলে জানিয়েছেন বিএনপি এই নেতা।

তার মতে, এক্ষেত্রে সময়সীমার কোনো বাধ্যবাধকতা থাকেন না। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত প্রধান তারেক রহমান গত প্রায় এক দশক ধরে সপরিবারে ব্রিটেনে বসবাস করছেন। সম্প্রতি তিনি জানিয়েছেন, ব্রিটেনে তিনি রাজনৈতিক আশ্রয় পেয়েছেন। তাকে দেশে ফিরিয়ে আনার কথাকে রাজনৈতিক বাগাড়ম্বর বলে বর্ণনা করে মওদুদ আহমদ বলেন, এই ইস্যুতে আওয়ামী লীগ মোটেই আন্তরিক নয়। ‘তারা যত দিন সম্ভব একে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করতে চায়। তারা গত ১০ বছর ধরেই তো বলছে তাকে ফেরত আনবে। কিন্তু পেরেছে কি?’ বলেন তিনি, ‘আর না পারলে, তারা কি বলতে পারছে কেন তারা পারছে না?’

যাবজ্জীবন রায়ে জীবনের ঝুঁকি না থাকায় তারেক রহমানকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে নেয়া সরকারের জন্য সহজ হবে কিনা, এই প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, একটি সার্বভৌম দেশ হিসেবে ব্রিটেন তার আইনগত বাধ্যবাধকতার বাইরে যেতে পারে না।

২১ আগস্ট হামলা মামলার রায় সরকারের জন্য বিশেষ কোনো আইনগত সুবিধে তৈরি করতে পারবে না বলেই মনে করেন ইংল্যান্ডের সুপ্রিম কোর্টের একজন আইনজীবী সৈয়দ আহমেদ। তিনি বিবিসি বাংলাকে বলেন, তারেক রহমান সফলভাবে প্রমাণ করতে পেরেছেন যে বাংলাদেশে ফেরত গেলে তার ওপর জুলুম হবে। ব্রিটিশ সরকারকে তিনি বোঝাতে সক্ষম হয়েছেন বলেই তাকে আশ্রয় এবং স্থায়ীভাবে বসবাসের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। এই আইনজীবী জানান, এক্সট্রাডিশন ট্রিটি বা এমল্যাটÑ যাই হোক না কেন ২০০৩ সালের এক্সট্রাডিশন আইন এবং ২০০২ সালের কমনওয়েলথ দেশগুলোর এক্সট্রাডিশন সংক্রান্ত আইনগুলোর আওতার মধ্যে থেকে ব্রিটিশ সরকারকে তারেক রহমানকে ফেরত নেওয়ার আবেদন বিবেচনা করতে হবে। পুরো আইনগত প্রক্রিয়াটি ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, যদি বাংলাদেশ সরকার ব্রিটিশ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ফেরত চেয়ে কোনো আবেদন পাঠায় তাহলে ব্রিটিশ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে এসব আইনের আলোকে করণীয় সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তিনি সেটা ঠেলে দিতে পারেন আদালতে। আদালত এক্ষেত্রে প্রথমে তারেক রহমানের বিরুদ্ধে গ্রেফতারের পরোয়ানা জারি করতে পারে।

সৈয়দ আহমেদ জানান, আদালতের বিবেচনা হবে এক্ষেত্রে কোনো আইনি বাধা আছে কিনা। এই বাধাগুলোর একটি হলো যে সাজার কথা বলে তাকে ফেরত নেওয়া হবে, তার বাইরে যেন তার বিরুদ্ধে নতুন কোন মামলা দায়ের কিংবা তার কোনো সাজা না হয়। আদালতের রায় বিরুদ্ধে গেলে তারেক রহমান একে চ্যালেঞ্জ করতে পারবেন, হাইকোর্টে এবং সুপ্রিম কোর্ট পেরিয়ে মানবাধিকার সংক্রান্ত ইয়োরোপীয় আদালতেও যেতে পারবেন তিনি। এটি একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া।’

 

"