ঘূর্ণিঝড় ‘তিতলির’ ভয় কেটে গেছে

প্রকাশ : ১২ অক্টোবর ২০১৮, ০০:০০

প্রতিদিনের সংবাদ ডেস্ক

ভারতের উড়িষ্যা ও অন্ধ্র উপকূলে আঘাত হানার পর দুর্বল হয়ে পড়েছে বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড় ‘তিতলি’। ফলে বাংলাদেশের আর ভয়ের কোনো কারণ নেই। তবে ব্যাপক প্রস্তুতির কথা জানিয়েছেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া। গতকাল বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি জানান, উপকূলীয় ১৯ জেলার প্রশাসনকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। মন্ত্রণালয়ে একটি নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র খোলা হয়েছে, সব সময় জেলার সঙ্গে কর্মকর্তারা যোগাযোগ রাখছেন। যেকোনো ধরনের দুর্যোগ মোকাবিলার আমাদের শতভাগ প্রস্তুতি রয়েছে। আর ওই ১৯ জেলার সব সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর সাপ্তাহিক ছুটি বাতিল করা হয়েছে। এর আগে ভারতের অন্ধ্র প্রদেশ ও উড়িষ্যার মাঝামাঝি এলাকায় প্রচ- শক্তিতে আছড়ে পড়ে ‘তিতলি’। এতে ৮ জন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।

গতকাল বৃহস্পতিবার ভোর সাড়ে ৫টার দিকে ঘূর্ণিঝড় তিতলি আঘাত আনে। এদিকে, কক্সবাজারের টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপে তিতলির প্রভাবে উত্তাল সাগরের ঢেউয়ের আঘাতে শতাধিক বসতঘর বিধ্বস্ত হয়েছে। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় আকাশ মেঘাচ্ছন্ন ছিল, কোথাও বৃষ্টিপাতও হয়েছে।

মন্ত্রী জানান, বরিশাল, পটুয়াখালী, বরগুনা, ঝালকাঠি, পিরোজপুর, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা, খুলনা, কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, ফেনী, ভোলা, চাঁদপুর, মাদারীপুর, গোপালগঞ্জ, ফরিদপুর এবং শরিয়তপুর জেলার সরকারি কর্মচারীদের সাপ্তাহিক ছুটি বাতিল করা হয়েছে।

বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) জনসংযোগ কর্মকর্তা মোবারক হোসেন মজুমদার জানান, আবহাওয়া অধিদফতর সমুদ্রবন্দরগুলোতে ৪ নম্বর স্থানীয় হুশিয়ারি সংকেত নামিয়ে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত দেখাতে বলেছে। আর নদীবন্দরে দেখাতে বলেছে ২ নম্বর নৌ হুশিয়ারি সংকেত। তাই উপকূলীয় এলাকা ছাড়া দেশের অভ্যন্তরে নৌ চলাচল আবার শুরু করার অনুমতি দেওয়া হয়েছে।

আবহাওয়াবিদ নিঝুম আহমেদ বলেন, তিতলি বাংলাদেশে আঘাত হানার সম্ভাবনা নেই। তবে এটি নিম্নচাপ আকারে আসতে পারে। এর প্রভাবে ভারী বৃষ্টিপাত হতে পারে।

কক্সবাজার : টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপে ঘূর্ণিঝড় তিতলির প্রভাবে উত্তাল সাগরের ঢেউয়ের আঘাতে শতাধিক বসতঘর বিধ্বস্ত হয়েছে। গতকাল সকাল থেকে ভারী বৃষ্টিপাত ও উত্তাল সাগরের ঢেউয়ের আঘাতে এসব বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানায়, সকালে জোয়ারের সময় নিয়মের চেয়ে দ্বিগুণ উঁচুতে সাগরের ঢেউ আচড়ে পড়ে। এতে তাদের বাড়িঘর বিধ্বস্ত হয়। শাহপরীর দ্বীপের মাঝের পাড়া, দক্ষিণপাড়া ও জাইল্যাপাড়া এলাকার প্রায় শতাধিক বসতঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এত খোলা আকাশের নিচে রয়েছে ৪ শতাধিক মানুষ।

বিষয়টি নিশ্চিত করে টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রবিউল হাসান বলেন, খবর পেয়ে আমি শাহপরীর দ্বীপের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছি। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের মাঝে ২০ কেজি করে চাল বিতরণসহ নানা সামগ্রী নিয়ে শাহপরীর দ্বীপে যাচ্ছি। শতাধিক ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাদের প্রাথমিক আশ্রয়ের ব্যবস্থা করা হচ্ছে।

বরিশাল : ঘূর্ণিঝড় তিতলির প্রভাবে বরিশালজুড়ে বৈরী আবহাওয়া বিরাজ করে। গত বুধবার বিকেল থেকে গতকালও সারা দেশের সঙ্গে বরিশাল নদীবন্দর থেকে সব ধরনের নৌযান চলাচল বন্ধ ছিল। আকাশ মেঘলা থাকার পাশাপাশি গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টিপাত হয়েছে।

দুপুর সাড়ে ১২টায় বরিশাল আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, ঝড়ো হাওয়া না থাকলেও গত ২৪ ঘণ্টায় বরিশালে ৫৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। সাগর ছিল উত্তাল। দেশের অভ্যন্তরীণ নদী বন্দরগুলোতে ২ নম্বর সতর্কতা সংকেত বহাল রয়েছে।

চট্টগ্রাম : তিতলির প্রভাবে নগরজুড়ে ভারি বৃষ্টিপাত হতে পারে। পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিসের সহকারী আবহাওয়াবিদ আবদুল হান্নান জানান, তিতলি ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য অন্ধ্র প্রদেশ ও উড়িষ্যায় আঘাত হেনেছে। পাশাপাশি ৪ নম্বর স্থানীয় হুশিয়ারি সংকেত থাকায় চট্টগ্রাম, বরিশাল ও খুলনা সমুদ্রবন্দরে বাতাসের সম্ভাব্য গতিবেগ ঘণ্টায় ৫১ থেকে ৬১ কিলোমিটার হতে পারে।

নগরে তিতলি মোকাবিলায় সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন জেলা প্রশাসক মো. ইলিয়াস হোসেন। তিনি বলেন, ‘দুর্যোগকালীন শুকনো খাবার ও নগদ অর্থ দেয়া খুব জরুরি। কিন্তু আমাদের নগদ টাকার সংকট আছে। বিষয়টি মন্ত্রীকে জানিয়েছি। আশা করি, টাকা পেয়ে যাব।’

ইলিয়াস হোসেন বলেন, ‘চট্টগ্রাম জেলায় ৪৭৫টি আশ্রয় কেন্দ্র খোলা রাখার নির্দেশনা দেওয়া আছে। যেকোনো প্রয়োজনে ১০৯০৪৩ নম্বরে কল এবং ৩৩৩ নম্বরে ম্যাসেজ দেওয়া যাবে।’

রাজশাহী : তিতলির প্রভাবে বুধবার রাত ১টা ২ মিনিটে বৃষ্টি শুরু হয়েছে। বর্ষণ হয়েছে গতকালও। টানা বর্ষণে মহানগরীর নিচু এলাকা এরই মধ্যে জলমগ্ন হয়ে পড়েছে। এতে সকাল থেকে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী ও কর্মজীবী মানুষকে বাড়ি থেকে বেরিয়েই দুর্ভোগে পড়তে হয়। একটানা বৃষ্টিপাতে মহানগরীর প্রধান সড়কগুলোতে ড্রেনের পানি উপচে পড়েছে।

রাজশাহী আবহাওয়া অফিসের পর্যবেক্ষক লতিফা হেলেনের দেওয়া তথ্য মতে, গতকাল মহানগরীতে ১২ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।

মাদারীপুর : ঘূর্ণিঝড় তিতলির প্রভাবে দূরপাল্লাসহ অন্য নৌরুটে লঞ্চ চলাচল বন্ধ থাকলেও কাঁঠালবাড়ী-শিমুলিয়া রুটে লঞ্চ চলাচল স্বাভাবিক ছিল বলে জানিয়েছে বিআইডব্লিউটিএ’র কাঁঠালবাড়ী ঘাট সূত্র। সেখানে শুধু থেমে থেমে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি হচ্ছিল। এছাড়া ঝড়ের তেমন কোনো প্রভাব ছিল না।

কাঁঠালবাড়ী-শিমুলিয়া নৌরুটের পদ্মা নদী সকাল থেকেই বেশ শান্ত ছিল। মাঝপদ্মায় তেমন ঢেউ না থাকায় লঞ্চ চলাচল স্বাভাবিক ছিল। গতকাল সকাল পৌনে ৭টার দিকে কাঁঠালবাড়ী ঘাট থেকে শিমুলিয়ার উদ্দেশে লঞ্চ ছেড়ে গেছে।

বিআইডব্লিইটিএ’র কাঁঠালবাড়ী লঞ্চঘাটের ট্রাফিক ইন্সপেক্টর আক্তার হোসেন বলেন, এই নৌরুটের পদ্মা নদী স্বাভাবিক রয়েছে। মাঝপদ্মায় তেমন ঢেউ নেই। এ কারণে আমরা লঞ্চ চলাচল বন্ধ রাখিনি। ঘাটে যাত্রীদের বেশ চাপও ছিল। পরিস্থিতি খারাপ হলে লঞ্চ চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হবে।

 

"